গওহর রিজভীর লেখা হতাশ করেছে by আসিফ নজরুল

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী টিপাইমুখ নিয়ে ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় একটি নিবন্ধ লিখেছেন। জনগণকে অবহিতকরণে তাঁর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। কিন্তু তিনি যা অবহিত করেছেন এবং যার ভিত্তিতে সেটি করেছেন, তা উদ্বেগজনক। তাঁর লেখা পড়ে মনে হয়নি যে তিনি টিপাইমুখের মতো অতিবৃহৎ একটি ড্যামের ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্টভাবে জানার এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বাসহীনতার ঐতিহাসিক কারণগুলো অনুধাবনের চেষ্টা


করেছেন। মনে হয়নি তিনি একাধিক দেশে প্রবহমান অভিন্ন নদী-সম্পর্কিত যে আন্তর্জাতিক আইন আছে, সে সম্পর্কে সচেতন আছেন।
আমার বিবেচনায় তাঁর মূল বক্তব্য তিনটি। গওহর রিজভী লিখেছেন: ক. টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্পে বাংলাদেশে বন্যা হ্রাস পাবে। খ. যদি ড্যামের নিম্ন অববাহিকা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারত পানি প্রত্যাহার করে ফেলে, তাহলেই কেবল তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গ. ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি না করার যে আশ্বাস পাওয়া গেছে, তার অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।
আমাকে সবচেয়ে আশাহত করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস তাঁর সরকারের একটি আন্তরিক অঙ্গীকার। আমার প্রথম প্রশ্ন: বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো রকম সামগ্রিক পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়াই মনমোহন সিং এই আশ্বাস কীভাবে দিতে পারেন? আর তিনি বা কংগ্রেস কি এই আশ্বাস রক্ষার জন্য চিরদিন ক্ষমতায় থাকবেন? আন্তনদী সংযোগ মহাপ্রকল্পের মাধ্যমে বরাকসহ উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় বহু নদীর পানি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তরকে বিজেপি তার পানিসম্পদ উন্নয়নের মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ভারতে বিজেপি আগামীতে ক্ষমতায় এলে তারা কি জনগণের কাছে বলা তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, নাকি বাংলাদেশকে দেওয়া মনমোহনের মৌখিক আশ্বাস ্বাস্তবায়ন করবে? আর মনমোহন সরকারের আশ্বাসের ওপরই আমাদের আস্থা কেন থাকা উচিত, যেখানে ঘোষণা দিয়েও তিস্তা চুক্তি তারা সম্পাদন করেনি, বারবার অঙ্গীকার করেও সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষ হত্যা বন্ধ করেনি, এমনকি আগে জানানোর আশ্বাস দিয়েও টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি?
ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্বাক্ষরিত ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদে কোনো অভিন্ন নদীতে একতরফাভাবে প্রকল্প গ্রহণ না করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কারণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক আইন। সেটিই যেহেতু ভারত এখন মানছে না, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিতে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত মৌখিক আশ্বাসের ওপর কীভাবে এত আস্থা রাখা যায়, তা বুঝতে সত্যিই অক্ষম আমি। গওহর রিজভীর লেখা বা সরকারের কারও বক্তব্য শুনে আমার একবারও মনে হয়নি যে তাঁরা ভারতকে গঙ্গা চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদের কথা বলেছেন। বলেছেন যে এটি অনুসারে বরাক নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের আগে একতরফাভাবে কোনো প্রকল্প ভারত গ্রহণ করতে পারে না। আমার এমনকি এটিও মনে হয়নি যে তিনি বা সরকারের কেউ এটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছেন যে বাংলাদেশ-ভারত দুটি দেশই যেসব আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তির (যেমন: ওয়েটল্যান্ড কনভেনশন, ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ কনভেনশন, বায়োডাইভার্সিটি কনভেনশন) পক্ষ রাষ্ট্র, সেগুলো অনুসারে ভারত টিপাইমুখ প্রকল্প একতরফাভাবে গ্রহণ করতে পারে না।
জনাব রিজভী টিপাইমুখ প্রকল্পে বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ বেশি পানি পেতে পারে লিখেছেন। আমি তাঁকে অনুরোধ করব ৭ ডিসেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত এই প্রকল্পের ওপর যে দীর্ঘ গবেষণামূলক লেখা ড. আকবর আলি খান প্রথম আলোয় লিখেছিলেন, তা পড়ে দেখার জন্য। আকবর আলি খান পানি মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও বস্তুনিষ্ঠভাবে গবেষণা করার ক্ষমতা সম্পর্কেও আশা করি জনাব রিজভী অবহিত আছেন। জনাব খান টিপাইমুখ-সংক্রান্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সমীক্ষা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, বাঁধের জল নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অন্য কোনো অবকাঠামো নেই বলে ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের গুরুত্ব গৌণ’। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার রজার্সের নেতৃত্বে ইউএসএইডের ইস্টার্ন রিভার স্টাডি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আকবর আলি খান দেখিয়েছেন যে দুটি কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বে টিপাইমুখের মতো ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে বন্যা হ্রাস করা যাবে না। প্রথমত, বাংলাদেশে এক মিটার এলাকায় বন্যা হ্রাসের জন্য ভারতের জলাধারে ৬৬ বিলিয়ন কিউসেক পানি জমাতে হবে, যা অবাস্তব ও অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, জলাধারে পানি জমিয়ে রাখলেও ভারতীয় নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোতে তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বেশি পানি এসে মিশবে এবং তা গড়িয়ে এসে বর্ষাকালে বাংলাদেশে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। আকবর আলি খান ব্যাখ্যা করেছেন যে খরা হলে এবং নদীতে পলি পড়লে টিপাইমুখের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশের জন্য ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব হবে না। বড় ড্যাম-সম্পর্কিত বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণাকর্ম পড়ে দেখলে বরং এই ধারণা জন্মায় যে টিপাইমুখ ড্যামের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, এর তাপমাত্রা এবং এর উপাদান (যেমন জলাধার থেকে ছাড়া পানিতে পলি ও ফাইটো প্লান্টন, জু প্লান্টন, নিউট্র্যান্ট ইত্যাদি কমে যায়) পরিবর্তন হওয়ার কারণে সিলেটে হাওরের মৎস্যসম্পদ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষি ভান্ডার এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বরাক নদীর চরিত্র পরিবর্তনের কারণে এমনকি বাংলাদেশে নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতাও দেখা দিতে পারে।
জনাব রিজভী অবশ্য দুই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করছেন। এক. ভূমিকম্পের কারণে টিপাইমুখ জলাধার ভেঙে পড়লে এবং দুই. টিপাইমুখের নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলে ব্যারাজ ও সংযোগ খাল নির্মাণ করে বরাক নদীর পানি প্রত্যাহার করা হলে। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এড়িয়ে এটি ভারত নির্মাণ করবে। তাঁর নিশ্চয়ই জানার কথা, টিপাইমুখ প্রকল্প এমন একটি এলাকায় নির্মিত হচ্ছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুটি ভূমিকম্প (রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৫-এর ওপরে) এবং বড় আকারের ১৬টি (৭-এর ওপরে) ভূমিকম্প ইতিমধ্যে ঘটেছে। অনেক উন্নততর প্রযুক্তি নিয়ে ভূমিকম্পে ফুকুসিমায় ক্ষতি জাপান এড়াতে পারেনি, সেখানে প্রকৃতিগতভাবে আরও বিপজ্জনক একটি প্রকল্পে ভূমিকম্প এড়ানোর নিশ্চিত প্রযুক্তি ভারত আবিষ্কার করে ফেলেছে, এটি তিনি কীভাবে ধারণা করেন?
গওহর রিজভী মনে করেন, ভূমিকম্পসহ অন্যান্য ক্ষতির ঝুঁকি ভারতে বেশি, ভারত তাই জেনেশুনে তার এলাকায় ক্ষতি হতে দেবে না। বড় ব্যারাজ বা ড্যামের রাজনীতি সম্পর্কে যাঁদের ধারণা আছে, তাঁরা জানেন যে এসব নির্মিত হয় সিমেন্ট, রড ব্যবসায়ী আর শিল্পপতি-বণিক শ্রেণীর স্বার্থে; নিজ দেশেরই বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ সেখানে খুব কমই বিবেচিত হয়। তা না হলে চীনে বানকিয়াও, ভারতে নর্মদা-কাবেরী-তেহরি, পাকিস্তানে তারবেলা এমনকি বাংলাদেশে কাপ্তাই বাঁধ কখনো নির্মিত হতো না।
গওহর রিজভীর যুক্তি, পানি প্রত্যাহারের প্রকল্প টিপাইমুখ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা নেই। খুবই সত্যি কথা এবং এটিই তো স্বাভাবিক। আমরা তো সব সময়ই বলছি যে ভারত কর্তৃক বরাকের পানি প্রত্যাহার করা হলে তা করা হবে ভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে, ফুলেরতল বা অন্য কোথাও ব্যারাজ নির্মাণ করে। ১৯৭৭ ও ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশকে দেওয়া ভারতের প্রস্তাবে ফুলেরতল ব্যারাজের কথা বলা ছিল। ২০০৫ সালে যৌথ নদী কমিশনের ৩৬তম বৈঠকে ফুলেরতলে না হলে অন্য কোথাও ভারত ভবিষ্যতে ব্যারাজ নির্মাণ করবে কি না, সে-সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে ভারত বলে যে এ সম্পর্কে পরবর্তী বৈঠকে জানানো হবে। আমার জানামতে, নদী কমিশনের পরের কোনো বৈঠকে ভারত তা আর জানায়নি।
জনাব রিজভীকে আমি অনুরোধ করব, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা নদী চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে বরাক নদীর পানি ব্যবহার-সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত টিপাইমুখ (এবং এ ধরনের আরও চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য অভিন্ন নদীতে নেওয়া অন্য সব প্রকল্প) প্রকল্প বন্ধ রাখতে বলুন। চুক্তির আগে দুই দেশ মিলে যৌথ পরিবেশ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমীক্ষা সম্পাদনের উদ্যোগ নিন। ভারত রাজি না হলে নিজ সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমীক্ষার দায়িত্ব নিন। ভারত চুক্তির আলোচনায় রাজি হলে বাংলাদেশে সব ধরনের সম্ভাব্য সমস্যার জন্য ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট বিধানের প্রস্তাব দিন। ভারত একতরফাভাবে যৌথ নদীতে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া অব্যাহত রাখলে এবং বাংলাদেশের প্রতিবাদে কান না দিলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবেশ ফোরাম ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করুন। বাংলাদেশের মানুষ অবশ্যই তাহলে আপনাদের সঙ্গে থাকবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.