প্রিয় নেতার বিদায় by অজয় দাশগুপ্ত

ত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং ইল ৬৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। বিশ্ব যুব উৎসব উপলক্ষে ১৯৮৯ সালের জুন-জুলাইয়ে গিয়েছিলাম উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ং ইয়ংয়ে। তখন জেনেছি, তিনি অভিহিত হন প্রিয় নেতা বা ডিয়ার লিডার হিসেবে। আর তার পিতা দেশটির প্রেসিডেন্ট ও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান কিম ইল সুংয়ের পরিচয় গ্রেট লিডার বা মহান নেতা। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোরীয় জনগণের


বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বব্যাপী এবং বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জনগণের মধ্যে নিজের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তারপর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় তিনি একচ্ছত্র নেতা। তিনি যখন প্রবীণ বয়সে, তার পুত্র কিম জং ইল মনোনীত হলেন পরবর্তী নেতা হিসেবে। উত্তর কোরিয়ায় প্রায় দু'সপ্তাহ অবস্থানকালে আমরা দেখেছি, সর্বত্র মহান নেতা ও প্রিয় নেতার বন্দনা। ব্রোঞ্জ ও শ্বেতপাথরে তৈরি বড় বড় মূর্তি যেন আকাশ ছুঁয়ে যেতে চায়। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বাণী খোদাই করে রয়েছে বড় বড় পাথরে। সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্রে তারা, টেলিভিশনেও তারা। শিশুদের কয়েকটি স্কুলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শুরুতেই কোরাস গান অবোধ শিশুদের_ অর্থ জানতে চাইলে বলা হয় : প্রতিদিন ভোর হলেই আমরা মহান নেতা ও প্রিয় নেতার ছবি দেখি ও বাণী শুনি, আহা কী আনন্দ! কী আনন্দ! একটি যৌথ খামার পরিদর্শনে নেওয়া হয় আমাদের। বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানাতে এ খামারটি গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কিম ইল সুং সাতবার গিয়েছেন 'সরেজমিন নির্দেশনা' দিতে, যা কৃষকদের আরও ভালোভাবে কাজের জন্য অনুপ্রেরণা বলে দাবি করা হয়। সফরকালে তিনি যে চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করেছেন, যে মাইক সামনে রেখে কথা বলেছেন, যে গ্গ্নাসে পানি খেয়েছেন_ সবকিছু খামারের জাদুঘরে ভেলভেটে রেখে পুরু কাচের বাক্সে সুন্দর করে সাজানো। যুব উৎসবের উদ্বোধনের কিছু আগে আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে গেল। আমাদের সঙ্গে যেসব দোভাষী ছিলেন, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস_ গ্রেট লিডার এমন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি করায়ত্ত করেছেন, যা মেঘ উড়িয়ে নেবে। কিন্তু হায়, অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য সমবেত লক্ষাধিক যুবক-তরুণ-তরুণী ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলাম।
তবে দৃশ্যপটের অপর দিক_ মনোমুগ্ধকর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। পরের কয়েকটি দিনের সব অনুষ্ঠানও স্বপ্নের মতো। নাচ, গান, শারীরিক কসরত_ সবকিছুতেই যেন জাদুর স্পর্শ।
রাজধানী পিয়ং ইয়ং সাজানো শহর। তবে দারিদ্র্য যে প্রকট সেটা বুঝতে সমস্যা হয় না। সমাপনী অনুষ্ঠান যেদিন হয়, কয়েক হাজার শিল্পী মনমাতানো অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। সেদিন মহান নেতা মঞ্চে উপস্থিত, পাশে প্রিয় নেতা কিম ইল জং। আমাদের এক তরুণ দোভাষী বারবার বলছিলেন_ মনটা তার বড়ই প্রফুল্ল, দুই নেতাকে এক সঙ্গে দেখতে পাচ্ছেন। রাতে আতশবাজির খেলা দেখতে দেখতে ফিরে চলেছি ঢাকা আসার জন্য মস্কো যাওয়ার বিমানে চাপতে। পথের দু'ধারে তখন জনস্রোত ছোটে। আমরা এক সময়ে বুঝতে পারলাম, যারা আমাদের জন্য স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছে, তারাই হেঁটে চলেছে ঘরে! অন্তত ১৫-২০ কিলোমিটার দূরেও তাদের সেই গভীর রাতে হাঁটতে দেখেছি। রাষ্ট্র তাদের অনুষ্ঠান করতে বলেছে এবং তারা করেছে। কিন্তু তাদের ঘরে ফেরার দায়িত্ব নেয়নি।
পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে চলা ( নাকি ইতিমধ্যে এ অস্ত্র করায়ত্ত?) উত্তর কোরিয়ার নতুন নেতার নাম কিম জং উন_ প্রিয় নেতার পুত্র এবং মহান নেতার প্রপৌত্র। বয়স তার মাত্রই ২৭ বছর, কিন্তু ইতিমধ্যেই 'গ্রেট সাক্সেসর' হিসেবে সমাদৃত এবং সেনাবাহিনীর জেনারেল হিসেবে অভিষিক্ত। এ যুগে এমন ঝলমলে তারুণ নেতা আর নেই। কিম জং ইল তার পিতার ছায়াসঙ্গী ছিলেন অনেক বছর। তাদের জয়ধ্বনি শোনা গেছে একসঙ্গে, দু'জনের প্রশস্তি ছিল সমানতালে। কিন্তু জেনারেল উন তেমন সুযোগ পাননি। তবে রেজিমেন্টেড শাসনে পরিচিত হতে সময় লাগে না। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র, বেতার ও টেলিভিশন এবং সেনা গোয়েন্দা ও অন্যান্য এজেন্সি সে কাজ ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে পারবে। এশিয়ার একটি দেশ রাজতন্ত্রের ধারাতে চলতে শুরু করল। প্রশ্ন রইল, তা কি
চিরস্থায়ী হবে?
ajoydg@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.