স্বাগত পরিবেশ অলিম্পিয়াড-২০১২ by বিধান চন্দ্র পাল

আজ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত পরিবেশ অলিম্পিয়াডে ঢাকা মহানগরীর ৫০টির বেশি বিভাগ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়) তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেবে। দিনব্যাপী এ আয়োজন বসুন্ধরায় অবস্থিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবে।


'পরিবেশ অলিম্পিয়াড'-এর স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাবেক সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই বাপার পক্ষ থেকে দেশব্যাপী এ ধরনের আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কী এই পরিবেশ অলিম্পিয়াড, কেন এই আয়োজন_ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় আনতে হবে। পরিবেশ বিষয়টি যেমন এখন সার্বিক ও সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিষয় রয়েছে_ সে আঙ্গিকে অলিম্পিয়াডকেও তাই কল্পনা ও মূল্যায়ন করতে হবে। এটা শুধু একদিনের আয়োজন বা আনুষ্ঠানিকতা নয় _ এর সঙ্গে পরিবেশ সমুন্নত রাখার স্বপ্ন, পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা এবং পরিবেশ রক্ষার শপথ সংশ্লেষিত। এ অলিম্পিয়াড বিশেষভাবে তরুণ সমাজকে নিয়ে এবং তরুণ সমাজের জন্য হলেও এ অলিম্পিয়াড আসলে সবার। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরিবেশ সমুন্নত রাখার সচেতনতা, মূল্যবোধ, ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা ও সংকল্পবদ্ধতা তরুণ সমাজের মধ্যে প্রসারিত তথা সবার মনের গভীরে প্রোথিত হবে।
আমরা যেন নদী, খাল, বিল, জলাশয়গুলোকে রক্ষা করি; পানির পরিমাণ ও প্রবাহ বাড়াতে সচেষ্ট হয়ে উঠি; দূষণমুক্ত জলাশয়কে সম্ভব করে তুলি; যেখানে আঞ্চলিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেখানে যেন টিপাইমুখের মতো স্তুতিময় অবস্থান তরুণ সমাজ না নিই। আমরা যেন বনাঞ্চল রক্ষা করি, বনায়ন বৃদ্ধি করি, বনদস্যুদের প্রতিহত করি। ভূমিদস্যুরা আজ তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে আমাদের পরিবেশগত যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে তা প্রতিহত করে নদীর জমি, জলাশয়ের জমি, পল্গাবন ভূমি, বনাঞ্চলের জমি, কৃষিজমি রক্ষা করেই পরিকল্পিত নগরায়নকে সম্ভব করে তুলি।
জলাশয়ের মতো মাঠের ওপর ভূমিদস্যুদের আগ্রাসনও আমাদের ঠেকাতে হবে, আমরা তরুণ সমাজ যেন সেদিকে সাহসী অবস্থান নিই। মুক্ত ভূমি আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে। চাষাবাদে পরিবেশবান্ধব কৃষিকে তাই প্রাধান্য দিতে হবে, প্রযুক্তিবান্ধব ও জীববান্ধব প্রযুক্তিকে নয়। শুধু সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হলেই হবে না, এর মধ্য দিয়ে আমাদের উপকূল বনায়ন ও পরিবেশবান্ধব জীবপ্রকৃতিরও সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের দেশের অভ্যন্তরে আজ যে লবণাক্ততা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লক্ষণীয়, জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে এনে সেখানে পানিপ্রবাহের প্রকৃতি বদলে দিতে হবে। নদীতীর ও মোহনায় ভাঙনের জন্য মানুষের সৃষ্টি করা কর্মগুলো যেমন ঠেকাতে হবে, তেমনি ভূমিক্ষয় রোধে, নদীক্ষয়ের সম্পর্কে কার্যকরভাবে অগ্রসর হতে হবে। জমি, জল, বন ও জীববৈচিত্র্য_ এগুলো নিয়েই মানুষের জীবন সমৃদ্ধ হয়, তাই এগুলো রক্ষায় সচেষ্ট, উদ্যোগী ও উদ্যমী থাকতে হবে। প্রকৃতি-পরিবেশবিনাশী যে কর্ম তা থেকে বিরত থাকতে আমাদের নীতিনির্ধারকরা যেন বাধ্য হন, তরুণ সমাজকে সচেতনভাবে সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে নানাভাবে। আমরা এখন বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি না, কারণ হাঁটার জায়গা নেই, বাতাসে আছে নানা ক্ষতিকর জীবাণু। প্রকৃতির দেওয়া বিশুদ্ধ খাবার আজ নানা কারণে স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কৃত্রিম জীবন নগর ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যন্ত এখন পেঁৗছে গেছে_ যে কারণে সুস্থ জীবন আজ বিপন্ন। এ অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন চাই এবং আনতে হবে!
উন্নয়নের নামে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করেছি। সঙ্গত কারণেই শিল্পোন্নত দেশগুলো এ জন্য দায়ী। আবার উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগামীরা দাবি করছে, উন্নয়নের স্বার্থ তাদেরও কার্বন নির্গমনের মাত্রা বেঁধে দেওয়া অনুচিত হবে। আমরা যারা উন্নয়নের নিচু সীমায় আছি তারা বলছি, উষ্ণায়ন কমিয়ে আনতে হবে। আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পরিবেশের এসব নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ তরুণ সমাজকে ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হবে। নীতিনির্ধারণসহ এসব সম্পর্কিত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাও আমাদের যৌক্তিক দাবি হবে।
সচেতনতামূলক পরীক্ষা ও উপস্থিত বক্তৃতা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, অগ্রসর প্রবীণ পরিবেশবাদী ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞতা বিনিময়_ দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ ধরনের নানা বিষয় উঠে আসবে। এ অলিম্পিয়াডের মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা তরুণ সমাজের মাধ্যমে একটি বার্তাই সবার মনে পেঁৗছে দেওয়া হবে যে, 'পরিবেশ রক্ষাই সবার সুরক্ষা'। ব্যক্তি থেকে সামগ্রিক_ সব পর্যায়ে এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

বিধান চন্দ্র পাল :নির্বাহী সদস্য
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং প্রধান সমন্বয়কারী, অলিম্পিয়াড আয়োজক কমিটি, বাপা
bidhancp@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.