সাময়িক প্রসঙ্গ-হুমকির মুখে ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব by হাসান শাহরিয়ার

বিন লাদেনের মৃত্যুর পর কি আল কায়দা বা এর সহযোগী সংগঠনগুলো চুপ হয়ে বসে থাকবে? এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। কারণ কয়েক বছর ধরেই প্রকৃত অর্থে বিন লাদেন আল কায়দার নেতৃত্বে ছিলেন না। তিনি এই সংগঠনের 'গুরু'। আয়মান আল জাওয়াহারি সংগঠনের কলকাঠি ঘুরাচ্ছেন।


এছাড়া অনেক তরুণ নেতারও উদ্ভব হয়েছে। তবে বেশ কয়েকজন নেতার মৃত্যুর পর এই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে


আল কায়দার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনের কথা অনেকেই ভুলতে বসেছিল। কেউ বলত তিনি বোধকরি মারা গেছেন, কেউ বলত তিনি লুকিয়ে আছেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কোনো এক পাহাড়ের গুহায়। আবার কেউ কেউ বলত, তিনি 'গায়েব' হয়ে গেছেন, যেমনটি হয়েছিলেন মির্জা আলি খান ফকির। গত শতাব্দীর তিরিশ ও চলি্লশের দশকে এই কুখ্যাত ফকিরকে ব্রিটিশ বাহিনী পুরো ভারতবর্ষ খুঁজে বেড়িয়েছে, কিন্তু ধরতে পারেনি। তার সম্পর্কে বলা হয়, তিনি বর্তমান পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় ঢুকে পড়েন। আর কখনও তাকে দেখা যায়নি। পশতুনদের আশ্রয়ে চলে যাওয়ার পর বিন লাদেনের ক্ষেত্রেও তাই ভেবেছিল অনেকে। কিন্তু গুহা ছেড়ে শহরে গিয়ে অন্য সাধারণ মানুষের মতো বসবাস করতে শুরু করাটাই বোধহয় তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মির্জা আলি খান ফকিরের মতো তিনি আর 'অদৃশ্য' হতে পারলেন না।
বিন লাদেনের অবস্থান সম্পর্কে পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে মিথ্যাচার করে আসছে। বলেছে, ওসামা বিন লাদেন সে দেশে লুকিয়ে নেই। কিন্তু এখন প্রমাণিত হলো যে, রাজধানী ইসলামাবাদ এবং মিলিটারি একাডেমী কাকুলের কাছেই এবোটাবাদে বিন লাদেন আত্মগোপন করে আসছিলেন। পাকিস্তান সরকার তার আস্তানা বা গতিবিধি সম্পর্কে কিছুই জানত না, এ যুক্তি ধোপে টেকে না। অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কবল থেকে আফগানিস্তানকে মুক্ত করার লক্ষ্যে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান ছিল আমেরিকার মিত্র। তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অংশ তালেবানের পৃষ্ঠপোষকতা করে। যুদ্ধের সময় এবং পরে বহু তালেবান পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের পর আমেরিকা তালেবানকে সমর্থন দিতে অনীহা প্রকাশ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কখনও প্রকাশ্যে এবং কখনও গোপনে তালেবান ও আল কায়দাকে মদদ দিতে থাকে। পাকিস্তানে আল কায়দার শক্ত অবস্থানের পেছনে রয়েছে আইএসআইর বিরাট ভূমিকা। ওয়ান-ইলেভেনের পর আমেরিকা যখন বিন লাদেনকে হন্যে হয়ে খুঁজছে এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে, তখন তিনি আফগানিস্তানের পাহাড়ের গুহা থেকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকায় এসে আশ্রয় নেন। এবার তিনি সরাসরি আইএসআইর খপ্পরে পড়ে যান।
পাকিস্তানি এই উপজাতীয়রা তালেবান ও আল কায়দাকে সমর্থন করে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের দাবি ছিল বিন লাদেন পাকিস্তানে লুকিয়ে আছেন। কিন্তু পাকিস্তান তা অস্বীকার করে। তালেবান ও আল কায়দার প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কে চিড় ধরে। গত জানুয়ারি মাসে লাহোরে সিআইএ কন্ট্রাক্টর রেমন্ড ডেভিস দু'জন পাকিস্তানিকে হত্যা করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু হয়। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ, বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ গিলানি কিংবা সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানি ও আইএসআই প্রধান লে. জেনারেল আহমেদ সুজা পাশা এবোটাবাদে বিন লাদেনের অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বললে ধরে নেওয়া হবে পাকিস্তানে শাসনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। তাহলে কি তালেবান ও আল কায়দা সমর্থিত আইএসআইর একটি গ্রুপ সে দেশের হর্তাকর্তা? এর জবাব প্রেসিডেন্ট জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী গিলানিকে অবশ্যই দিতে হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে আরেকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সামরিক অভিযান, নিরস্ত্র বিন লাদেনের হত্যা এবং তার লাশ সমুদ্রে নিক্ষেপ যুক্তিযুক্ত কি-না। এ ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। 'পাকিস্তানে আর কোনো অভিযান চালালে পরিণতি ভয়াবহ হবে' বলে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ার করে দিয়েছে। অপরদিকে ওয়াশিংটন বলেছে, প্রয়োজন হলে পাকিস্তানে বারবার অভিযান চালানো হবে। নিরস্ত্র বিন লাদেনের হত্যাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন আখ্যায়িত করে প্রতিবাদ ও নিন্দায় ফেটে পড়েছে সারাবিশ্ব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল একে যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করেছেন। ঠিক তেমনি বিন লাদেনের লাশ সমুদ্রে নিক্ষেপ করায় বিক্ষুব্ধ হয়েছে মুসলিম বিশ্ব। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, লাদেনের লাশ মাটিতে দাফন করলে তার অনুসারীরা ওই স্থানটিকে মাজারে পরিণত করবে।
বিন লাদেনের মৃত্যুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাষণে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আমেরিকার স্বার্থরক্ষার জন্য তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। জর্জ বুশ বলেছিলেন, 'ইরাক যুদ্ধে যারা আমাদের সমর্থন করবে না তারা আমাদের বন্ধু নয়।' গত কয়েক বছরে আমেরিকা বিশ্বে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অনেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অভাব অনুভব করছেন। তখন বিশ্ব দুটি ব্লকে বিভক্ত ছিল এবং ছোট দেশগুলো অনেক নিরাপদ ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। শক্তিধর আমেরিকা এখন সারাবিশ্বের মোড়ল। প্রায় সব দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারেই সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে আমেরিকা। বাংলাদেশের মতো একটি ছোট রাষ্ট্রও এর শিকার হয়েছে। র‌্যাব ক্রসফায়ারে কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীকে হত্যা করলে তা হয় মানবাধিকার লঙ্ঘন। আর যুক্তরাষ্ট্র নিরস্ত্র লাদেনকে গুলি করে মারলে তা হয় যুক্তিযুক্ত।
আমেরিকার এবোটাবাদ অভিযান থেকে কেউ কেউ উৎসাহিত হতে পারেন। যেমন, ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ভি কে সিং বলেছেন, তার দেশের দক্ষ সেনারাও এবোটাবাদ স্টাইলে অভিযান চালাতে সক্ষম। 'যদি কখনও তেমন পরিস্থিতি আসে তাহলে সামরিক বাহিনীর তিন শাখাই এ ধরনের অপারেশন চালাতে পারে'_ লক্ষেষ্টৗর এক সৈনিক স্কুলের অনুষ্ঠানে এই উক্তি করে তিনি বলেছেন, 'সেই ক্ষমতা তাদের আছে।' (ইত্তেফাক ৬ মে, ২০১১)। তিনি ঠিকই বলেছেন। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী নেপালে প্রবেশ করে একজন অপরাধীকে ধরে নিয়ে আসে। আমি তখন নেপালে ছিলাম। বেশ হৈচৈ হয়েছিল। ভারতীয় সেনাপ্রধানের এই মন্তব্যে প্রতিবেশী ছোট দেশগুলো চিন্তিত হয়ে পড়তে পারে। কারণ জঙ্গিবাদের দোহাই দিয়ে যদি আমেরিকা পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালাতে পারে, তাহলে ভারত কেন বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা বা মালদ্বীপে একই ধরনের তৎপরতা চালাতে পারবে না? আমেরিকার পাকিস্তান অভিযান যদি জায়েজ হয়, তাহলে ভারতও এ ধরনের অপারেশন চালালে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।
এ অবস্থায় ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই আমেরিকার তল্পিবাহক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। এখন ভরসা চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর।
বিন লাদেনের হত্যার পর বারাক ওবামার বক্তৃতা শুনে মনে হলো, তার পূর্বসূরি বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডবি্লউ বুশ যা পারেননি তিনি সেই অসাধ্য কাজ সাধন করে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পথ খোলাসা করে ফেলেছেন। নির্বাচনের সময় ভোটারদের এ কথা মনে থাকবে কি-না কে জানে? তখন হয়তো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে। যা হোক, ওয়ান-ইলেভেনের এক দশক পূর্তির আগে ওসামা বিন লাদেনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারার কৃতিত্ব তো প্রেসিডেন্ট ওবামা নেবেনই।
এখন প্রশ্ন হলো : বিন লাদেনের মৃত্যুর পর কি আল কায়দা বা এর সহযোগী সংগঠনগুলো চুপ হয়ে বসে থাকবে? এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। কারণ কয়েক বছর ধরেই প্রকৃত অর্থে বিন লাদেন আল কায়দার নেতৃত্বে ছিলেন না। তিনি এই সংগঠনের 'গুরু'। আয়মান আল জাওয়াহারি সংগঠনের কলকাঠি ঘুরাচ্ছেন। এছাড়া অনেক তরুণ নেতারও উদ্ভব হয়েছে। তবে বেশ কয়েকজন নেতার মৃত্যুর পর এই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে যেমন বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি ও সংস্থা আল কায়দার অর্থ জোগাত, এখন তেমনটি হচ্ছে না। এর ফলে এর কর্মকাণ্ডে ভাটা দেখা দিয়েছে।
বিন লাদেন ছিলেন একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। এক সৌদি ধনকুবেরের সন্তান হয়েও তিনি সৌদি সরকারের সমালোচনা করেছেন, হারিয়েছেন সৌদি নাগরিকত্ব। আফগান যুদ্ধের পর তিনি হয়ে ওঠেন এক বীর ও জনপ্রিয় নেতা। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান। ইসলামী রীতিনীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই ছিল পশ্চিমাদের সঙ্গে তার বিরোধের প্রধান কারণ। কিন্তু তার পন্থা ছিল ভিন্ন। তিনি হয়তো বুঝতে পারেননি যে, সন্ত্রাসবাদ কখনও জয়ী হয় না। পশ্চিমারা তাকে সন্ত্রাসী বললেও মুসলিম বিশ্বের অনেকের কাছেই তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি তাদের নয়নের মণি। এই পৃথিবীর জনগণ অনেকদিন মনে রাখবে তার কথা।

হাসান শাহরিয়ার : সাংবাদিক
 

No comments

Powered by Blogger.