বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৪৪১ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। শাখাওয়াত হোসেন, বীর প্রতীক দক্ষ মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালের জুন মাসের একদিন। মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি দল পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অন্ধকার রাতে সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা অবস্থানের দিকে যেতে থাকে।
শাখাওয়াত হোসেন বাহার একটি দলের নেতৃত্বে। তাঁর দলের কাছে অস্ত্র বলতে দুটি এলএমজি। বাকি সব স্টেনগান ও রাইফেল।
একজন পথপ্রদর্শক তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু অন্ধকারে পথপ্রদর্শকের ভুল নির্দেশনায় তাঁরা শত্রুর প্রতিরক্ষা অবস্থানের একদম কাছে চলে যান। উপস্থিতি টের পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের আক্রমণ করে।
এদিকে কথা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘাঁটির ওপর আক্রমণ শুরু করার আগে সেখানে ভারত থেকে দূরপাল্লার কামানের গোলা বর্ষণের। ঠিক তখনই শুরু হয় ভারত থেকে কামানের গোলাবর্ষণ। সেগুলো পাকিস্তানি ঘাঁটির ওপর না পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরই পড়ে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ এবং নিজেদের গোলায় শহীদ ও আহত হন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। এতে অক্ষত মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েন। জীবন বাঁচাতে কেউ কেউ দলনেতার নির্দেশ ছাড়াই বিভিন্ন দিকে পশ্চাদপসরণ শুরু করেন। চরম সংকটময় এক অবস্থা।
শাখাওয়াত হোসেন দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাঁর দলের মুক্তিযোদ্ধাদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন। একই সঙ্গে বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করে গোলন্দাজ দলকে পরিস্থিতি জানান। পরে তারা নিশানা ঠিক করে পাকিস্তানি ঘাঁটির ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করে।
এরপর শাখাওয়াত হোসেন উদ্যোগ নেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আক্রমণের। কিন্তু দেখা গেল তাঁর দলের বেশির ভাগ সহযোদ্ধা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মনোবলও ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থায় তিনি পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
সেদিন শেষ পর্যন্ত তাঁদের আক্রমণের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তবে সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে তিনি দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অস্ত্র দিয়ে গুলি করে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের ব্যতিব্যস্ত রাখেন। এ সুযোগে তাঁর সহযোদ্ধারা নিরাপদ স্থানে চলে যান। তাঁর একক প্রচেষ্টায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যান।
এ ঘটনা হালুয়াঘাটের। ময়মনসিংহ জেলার উত্তরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট। সেখানে আছে সীমান্ত ফাঁড়ি। সেখানে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাঁটি। এখানে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়।
শাখাওয়াত হোসেন ১৯৭১ সালে একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলেন। মক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ দখলের জন্য অগ্রসর হতে থাকলে তিনি ইপিআরদের সংগঠিত করে মধুপুর সেতুর অপর পাশে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিমান আক্রমণ করে তাদের প্রতিরোধ ভেঙে দেয়।
এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি তিনি ভারতে যান। তুরায় এক্সপ্লোসিভ ও লিডারশিপ প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ১১ নম্বর সেক্টরের ঢালু ও মহেন্দ্রগঞ্জ সাবসেক্টরে যুদ্ধ করেন। তিনি পরে আরও কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন। কামালপুরে কয়েক দিন পরপরই তাঁরা গেরিলা হামলা চালাতেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য শাখাওয়াত হোসেনকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্ব ভূষণ নম্বর ৪১১। গেজেটে নাম বাহার। এটি তাঁর ডাক নাম। মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা সাত ভাই ও তিন বোন সবাই অংশ নেন। চার ভাই খেতাবপ্রাপ্ত।
শাখাওয়াত হোসেন ১৯৭৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে হামলার ঘটনায় নিহত হন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। পৈতৃক বাড়ি নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের কাজলা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মহিউদ্দিন তালুকদার। মা আশরাফুননেছা।
সূত্র: প্রথম আলোর পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি মো. গোলাম মোস্তফা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ১১।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.