সবচেয়ে ভালোবাসো মাতৃভাষাকে by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) ক্লাসঘরের কথা দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি ১ মানুষের ছোট শক্তি ব্যক্তিগত, বড় শক্তি সাংগঠনিক। দল-যূথবদ্ধতা এসব মানবজাতির উচ্চতর শক্তি। সান্তিয়াগো ওখানে ভুল করেছে। জীবনের এত অভিজ্ঞতার পরও সে শুধু নিজের শক্তির ওপর অন্ধের মতো নির্ভর করে এই বিপদসংকুল বিশাল যাত্রায় পা রেখেছে।


সে মনে মনে বলেছেও তা, বলেছে এত দূর সমুদ্রে একা আসা উচিত হয়নি। কিন্তু সে থামার পাত্র নয়। সে বিশ্বাস করে, এ আসাই তার শেষ আসা নয়, সে আবার আসবে, কিন্তু সেবার আর একা নয়, যূথবদ্ধভাবে। এই অন্তহীন সমুদ্র থেকে জীবনের শ্রেষ্ঠ গৌরব সে আহরণ করবেই করবে। সে বুঝেছে, কেবল বার্ধক্যের বহুদর্শিতা নিয়ে এই অসম্ভব যুদ্ধ জয় তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই পরের যাত্রায় সে আসবে তারুণ্যের শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে- যে পরের প্রজন্ম বন্দরে বসে ফোর্ড কম্পানির গাড়ির লোহার শিকে ধার দিচ্ছে সামনের যাত্রায় নিজেকে সশস্ত্র করার জন্য। তার আশা, আরো উন্নত অস্ত্র নিয়ে সে পরের বার আক্রমণ করবে ও সফল হবে। কারণ সে জানে, মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু সে পরাজিত হয় না। শক্তিমান মানুষ এভাবেই স্বপ্ন দেখে। হয়তো পরের অভিযানে কোনো নতুন ব্যর্থতায় সে আবারও ছেঁড়াখোঁড়া হবে। কিন্তু সম্পূর্ণতার স্বপ্ন তাকে ডাঁশের মতো কামড়ে ধরে থাকে। আর থাকে বলেই সে এগোয়। সম্পূর্ণকে না পেলেও তাকে পাওয়ার চেষ্টা চালায়। এভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে বলেই মানুষ জেতে। মানুষে মানুষে সাফল্যের পার্থক্য তাই শক্তি বা প্রতিভার কারণে ততটা হয় না, যতটা হয় স্বপ্নের পার্থক্যের জন্য। ১৯৭১ সালে আমরা যদি ভাবতাম, আমাদের প্লেন নেই, কামান নেই, গোলা-বারুদ নেই, কী করে আমরা জিতব, তাহলে আমরা কি যুদ্ধে জিততাম? আমরা জিতেছি কারণ অন্ধের মতো, মূঢ়ের মতো, প্রেমিকের মতো, উন্মাদের মতো আমরা স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলাম- আমরা জিতব।


বইটি পড়ার সময় একটা ব্যাপার দেখে অবাক হই। এ বই কোথাও এতটুকু নিষ্প্রাণ বা নীরক্ত নয়। বুড়ো লোকটার সঙ্গে সমুদ্রের যেন সারাক্ষণ একটা প্রাণবন্ত সংলাপ চলছে। তাতে আমাদের অন্তর্জীবন প্রতিমুহূর্তে সক্রিয় আর উদ্যত হয়ে আছে। ভেবে দেখ এক দিন না, দুই দিন না, বিরতিহীন দীর্ঘ ৮৪টা দিন সে একা একটা ছোট ডিঙিতে করে সমুদ্রের বুকে ভাসছে। কী দীর্ঘ একঘেয়ে বিরক্তিকর আর নিষ্ঠুর এই সময়। কিন্তু এক মুহূর্তও কোথাও একে একঘেয়ে লাগছে না। সমুদ্রকে কখনো সমুদ্র মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে সংঘাত-রক্তাক্ত আমাদের উথাল-পাতাল জীবন। বইটি সারাক্ষণ আমাদের তাই উত্তেজিত ও উদ্যত করে রাখছে। কিসের জন্য? ওই কথাবার্তার জন্য। সমুদ্রের সঙ্গে, মাছের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে, স্বপ্নের সঙ্গে, নিয়তির সঙ্গে তার জীবন্ত কথোপকথনের ফলেই ঘটছে ঘটনাটা। আমরাও তাতে অংশ নিচ্ছি। সমুদ্রটাকে মনে হচ্ছে একটা পুরোপুরি জীবন্ত জগৎ। এর ছোট ছোট মাছগুলো থেকে এর উপচে-ওঠা পানি, আকাশ, অন্তহীনতা, হাঙরের দঙ্গল, সংগ্রাম, সংঘাত, হাহাকার- সব যেন জীবন্ত। মানবজীবনের মতোই এ চঞ্চল, অস্থির, কুটিল। বইটির এ এক বিস্ময়কর শক্তি। হেমিংওয়ে বইটিতে তাই হয়তো লিখেছেন : সমুদ্রে কেউ একা নয়।


তোমাদের আমি 'ক্রীতদাসের হাসি' বইটা পড়ানোর সময় বলেছিলাম, রূপক গল্প বলে এক ধরনের গল্প আছে। রূপক হলো সেই গল্প, যার বাইরের দিকে থাকে একটা গল্প আর ভেতরে থাকে আরেকটা। এ বইয়ের বাইরের দিকে আছে সমুদ্র, বৃদ্ধ জেলে, তার মৎস্য শিকারের অভিযাত্রা আর সব পেয়েও একসময় নিঃস্ব হওয়ার নিষ্ঠুর কাহিনী। কিন্তু ভেতরের গল্পটা কী? ভেতরেরটা হচ্ছে মানবজাতির চিরকালের সংগ্রামের কাহিনী। কে এই জেলে? এই জেলে হচ্ছি আমরা, মানুষরা। আর এই বিশাল সমুদ্র হচ্ছে আমাদের জীবন। এই নিঃসীম জীবনেই সান্তিয়াগোর মতো আমরা একদিন ভেলা ভাসাই, বাঁচি, গৌরবের জন্যে যুদ্ধ করি এবং একসময় সব খুইয়ে বিদায় নিই। আমরা সহজেই বুঝতে পারি, শুধু পেট ভরানোর তাগিদে মাছের এই দুঃসাধ্য সন্ধানে সে বেরোয়নি, সে গেছে মানব-অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্বকে স্পর্শ করার জন্য, সে জয়ের গৌরব অর্জনের জন্য। এ জন্য ছোট ছোট অনেক মাছ তার সামনে পড়েছে, কিন্তু তাদের দিকে সে ফিরেও তাকায়নি। তার লক্ষ্য ছিল নিজের জেলে-জীবনের শীর্ষ স্পর্শ করা। তাই যেদিন সে ঈপ্সিত মাছটির দেখা পেল, সেদিন শত্রুর প্রতি মানুষের যে ঘৃণা বা আক্রোশ থাকে, মাছটির প্রতি সে আক্রোশ তার আসেনি। বরং হয়েছে উল্টো। সেই বিশাল সুন্দর রহস্যময় অনির্বচনীয় মাছটাকে দেখে সে অভিভূত হয়েছে। তার মনে হয়েছে, এমন একটা অলৌকিক মাছের স্বপ্নই তো সারা জীবন সে দেখেছে, যে তার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, যাকে জয় করার মধ্যে তার অস্তিত্বের সর্বোচ্চ মহিমা। এরপর শুরু হয়েছে মাছ ও তার ভেতরকার মরণপণ সংগ্রাম। বিশাল সমুদ্র তোলপাড় হয়ে উঠেছে সে যুদ্ধের নির্দয় ক্ষুব্ধ আন্দোলনে। সান্তিয়াগো বুঝতে পারছিল শক্তিতে, বুদ্ধিতে, ক্ষিপ্রতায়, চাতুর্যে মাছটা কোনোভাবেই তার চেয়ে খাটো নয়। তবু মানবজাতির যুগ যুগের অভিজ্ঞতার ইতিহাস তার পেছনে দাঁড়িয়ে, তাই এমন অবিশ্বাস্য মাছটাকেও তার কাছে হেরে যেতে হলো। মাছটার এ পরাজয় তাই কোনো ব্যক্তিগত সান্তিয়াগোর কাছে নয়, মানবজাতির সম্মিলিত অগ্রযাত্রার সামনে। মাছ শিকার-পর্ব শেষ হওয়ার ভেতর দিয়ে সান্তিয়াগোর জেলে-অস্তিত্ব সর্বোচ্চ সার্থকতা পেল। এবার পৃথিবীর সামনে এই গৌরব তুলে ধরার পালা। নৌকার সঙ্গে মাছটাকে বেঁধে সান্তিয়াগো যাত্রা শুরু করল কূলের দিকে, যেখানে মুখর ও জনাকীর্ণ অভিনন্দনে তটভূমি তার জন্য অধৈর্য হয়ে রয়েছে। ঠিক এমন সময় যা ছিল তার কল্পনারও বাইরে, তারই মুখোমুখি হলো তার নিয়তি। আতঙ্কের সঙ্গে হঠাৎ নৌকার পেছনে সে আবিষ্কার করল একটা ক্ষুধার্ত হাঙরের মুখ, মাছের শরীরের তাজা রক্তের গন্ধ পেয়ে যে তার পিছু নিয়েছে। সে বুঝল হাঙরটা হিংস্র ধারালো দাঁতে তার এত দিনের প্রাণান্ত শ্রমের ফসলটিকে, জীবনের শ্রেষ্ঠতম এই অর্জনটিকে ছিনিয়ে নিতে এসেছে। (চলবে)

No comments

Powered by Blogger.