মানবাধিকার-পুলিশকে কি সহিংস হতেই হয়? by হামিদা হোসেন

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি যেসব প্রশ্ন তুলেছেন, পুলিশ কি এর জবাব দেবে? সিমিন হোসেন রিমির ছেলে রাকিবকে গুলশান এভিনিউতে প্রহার করা হয়েছে। তাঁকে গুলশান থানায় তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল।


সিমিন হোসেন রিমির প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী পুলিশি নির্যাতন ও পুলিশ হেফাজতে সহিংস আচরণ থেকে প্রত্যেক নাগরিকের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রক্ষার ব্যাপারে পুলিশের দায়দায়িত্ব ও অধিকারের সীমার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সিমিন হোসেন রিমির উত্থাপিত প্রশ্নগুলো। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন: কোনো নাগরিক রাস্তায় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাক বা না চালাক, কোনো নাগরিক ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করুক বা না করুক—পুলিশের কি অধিকার আছে তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার? তেমন ক্ষমতা কি পুলিশকে দেওয়া হয়েছে?
কোনো মানুষ থানায় গেলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার বা তিনি যে মামলা দায়ের করতে চান, তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর ক্ষমতা কি পুলিশকে দেওয়া হয়েছে?
সহিংস আচরণ বা হুমকি কি কোনো ব্যক্তির পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত?
পুলিশের বাড়াবাড়ি ও বিধিবিধান মেনে না চলা নিয়ে যে প্রশ্ন রিমি তুলেছেন, এর উত্তর পাওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন এ কারণে নয় যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে; বা এ কারণে নয় যে পুলিশের নির্মম নির্যাতনের শিকার তরুণটি বর্তমান সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাগনে। এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন এ কারণে যে পুলিশের এমন নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা সারা দেশেই ঘটে চলেছে। যাঁরা এসবের শিকার হচ্ছেন, তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের সহিংস আচরণের প্রতিবাদ করতে পারেন না; প্রতিকার চাইতে পারেন না এই ভয়ে যে এ কারণে তাঁদের আরও গুরুতর পরিস্থিতির শিকার হতে হবে।
আমরা হাইকোর্টের প্রতি কৃতজ্ঞ যে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে রাকিবের ওপর নির্যাতনের ঘটনাটি বিবেচনায় নিয়েছেন এবং চারজন পুলিশ কর্মকর্তাকে তলব করেছেন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, এ ঘটনার একটি তদন্ত করতে হবে; পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত নয়, অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তদন্ত নয়—মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন-স্বতন্ত্র তদন্ত। মানবাধিকার কমিশনের সেই তদন্তের প্রতিবেদন পেশ করতে হবে ৩০ দিনের মধ্যে। হাইকোর্ট আরও আদেশ দিয়েছেন, এ সময়ের মধ্যে রাকিব ও তাঁর বন্ু্ল হিমেলকে যাঁরা মেরেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই দুই উপপরিদর্শককে (এসআই) সাময়িকভাবে বরখাস্ত, সহকারী কমিশনারকে গুলশান জোনের বাইরে এবং ওসিকে গুলশান থানার বাইরে বদলি করা হোক। বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শাস্তিদানের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটা নিশ্চিত করার জন্য যে ঘটনার তদন্তকাজে কোনো হস্তক্ষেপ ঘটবে না।
আশা করি, মানবাধিকার কমিশন তদন্তকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে তৎপর হবে এবং সরকার বা পুলিশ বিভাগ হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাগুলোর দিকে দৃষ্টি দেবে। ইচ্ছামতো অবৈধ সহিংস আচরণ করার ক্ষেত্রে পুলিশের উপপরিদর্শককেরা কোনো প্রকার শাস্তি বা জবাবদিহির ঝুঁকি বোধ করেন না; তাঁরা আইনকানুন ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে—তাঁদের এই বোধ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন আদালত, যেমনটি খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে। রাকিব ও তাঁর বন্ধু হিমেলকে যদি দ্রুত গাড়ি চালানোর জন্য থামানো হয়ে থাকে, তাহলে আইনের বিধান হলো তাঁদের থানায় নিয়ে যাওয়া, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করে একটি এফআইআর নথিভুক্ত করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এমন ক্ষেত্রে নির্ধারিত শাস্তি আরোপ করা, যেমন: ক্ষমা প্রার্থনা, জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিল করা।
থানাগুলোয় পুলিশ সদস্যদের আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে পুলিশ রেগুলেশনসে। কিন্তু সেগুলো মেনে চলা হয় না বললেই চলে। থানায় যাঁকেই নিয়ে যাওয়া হয়, তাঁকেই দোষী মনে করা হয় এবং মনে করা হয় যে শারীরিক শাস্তিই তাঁর প্রাপ্য। রাকিবের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এনে মামলা করার কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগেই তাঁকে প্রায় সেলের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়। রাকিবের সামর্থ্য ও সাহস ছিল তাঁর বাবাকে ফোন করার, তিনি তা করেন এবং তাঁর বাবা সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থানায় গিয়ে উপস্থিত হন। কিন্তু রাকিবের বাবার সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করা হয়। পুলিশ কমিশনার তাঁর সঙ্গে চিৎকার করেন। পুলিশ সদস্যরা যখন রাকিবের পরিচয় জানতে পারেন, তখন পুলিশের এক সদস্য নাকি বলেন, ‘তাজউদ্দীনের নাতি? দেখাচ্ছি মজা!’ এটা কি পুলিশ সদস্যের দলীয় আচরণ, নাকি শ্রেণীগত অবস্থানের কর্তৃত্বের প্রকাশ?
পুলিশ আইনের কোথাও কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অনুমোদন নেই। কিন্তু পথচারী, ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকানি, বিশেষত রিকশাচালকদের ওপর পুলিশ সদস্যদের লাঠি ব্যবহারের নিষ্প্রয়োজনীয় উৎসাহ কতই না দেখা যায়। কারণ, এসব মানুষের কোনো সহায় নেই, আইনপ্রয়োগকারীদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগের প্রতিকার করার কেউ নেই। তাই তাঁরা এসব নীরবে সহ্য করে যান। কয়েক মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদের হাইকোর্টের কাছে পুলিশের একজন সদস্যের নির্মম প্রহারের শিকার হন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অজুহাত খাড়া করে যে কাদের একজন অপরাধী। তখনো আদালত কাদেরের নির্যাতনকারী পুলিশ সদস্যদের বানোয়াট কাহিনি লক্ষ করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আদেশ দেন।
বেশ কয়েক বছর আগে পুলিশের রিমান্ডে এক ছাত্রের মৃত্যুর পর ‘রুবেল বনাম বাংলাদেশ সরকার’ মামলায় হাইকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারার অধীনে পুলিশি নির্যাতন নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস পেয়েছিলেন। তখন হাইকোর্ট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে সাতটি শর্ত সুনির্দিষ্ট করে দেন। কাউকে গ্রেপ্তার করার সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানাতে হবে গ্রেপ্তারের কারণ কী এবং তাঁর আইনগত সহযোগিতা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা বিস্ময়কর যে সে সময়ের সরকার হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে রয়েছে, আর এ ফাঁকে পুলিশ সদস্যরা শাস্তি বা জবাবদিহির ঝুঁকি ব্যতিরেকে ৫৪ ধারার অপব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছেন। রাকিবের মামলাটিও রুবেলের মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে পুলিশ সদস্যদের স্বেচ্ছাচারী আচরণের জবাবদিহির দাবি রয়েছে।
শুধু বড় বড় মামলায় পুলিশের গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠা যথেষ্ট নয়। আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান। কিন্তু বাংলাদেশে এটা কে বিশ্বাস করে? সরকারের উচিত আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা এবং জরুরি ভিত্তিতে পুলিশের সংস্কার সাধনের উদ্যোগ নেওয়া, যেন পুলিশকে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বশীল করে তোলা যায়। উচ্চতর আদালতের সময় এসেছে, রাকিব ও রুবেলের মামলা পেরিয়ে নির্দোষ নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে পুলিশের বাড়াবাড়ি সম্পূর্ণরূপে বন্ধের ডাক দেওয়ার। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা যদি প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে পরিবর্তন আনতে চাই, তাহলে পুলিশের বাড়াবাড়ির শিকার ব্যক্তিদের সহযোগিতায়ও আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ যখন আইনের সীমা অতিক্রম করবে বা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করবে, তখন প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারকে আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
হামিদা হোসেন: মানবাধিকারকর্মী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন।

No comments

Powered by Blogger.