কালের আয়নায়-এই আগস্টে (২২ শ্রাবণ) বিদায় নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথও by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাঙালি আজ রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত কিন্তু সাংস্কৃতিক জাতিত্বে অবিভাজ্য। ইংরেজি ভাষাভাষীদের মতো রয়েছে তাদেরও অভিন্ন কালচারাল নেশনহুড। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাই দুই বাংলা, সারা উপমহাদেশ একই সঙ্গে জন্মবার্ষিকী পালন করে, মৃত্যুদিবস নয়। তার মৃত্যুদিবস নেই।


বাইশে শ্রাবণ তিনি নয়নের বাইরে চলে গেছেন। কিন্তু হৃদয়ের গভীর গহনে স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন


ইংরেজি আগস্ট মাসটি দুই বাংলার বাঙালির জীবনেই একটি বড় বেশি ঘটনাবহুল মাস। দুটি বড় ঘটনা ১৯৪১ সালের আগস্টে (২২ শ্রাবণ) রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। আরও অনেক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে এই মাসে। বিয়ালি্লশ সালের আগস্ট-আন্দোলন (কুইট ইন্ডিয়া) অবিভক্ত ভারতের দুইশ' বছরের পরাধীনতা অবসানের সূচনা করেছিল। আবার ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নামে পরিচিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঙালি-মানসে এক গভীর কলঙ্কের ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছে। পরের বছর (১৯৪৭) এই আগস্ট মাসের ১৪-১৫ তারিখেই ভারত উপমহাদেশে স্বাধীনতার বর্ণিল সূর্যোদয় ঘটেছিল।
তাই আগস্ট মাস_ বাংলা শ্রাবণ-ভাদ্র মাসটিকে শোকের মাস, বিষাদের মাস, না আনন্দ ও আত্মউদ্বোধনের মাস বলে চিহ্নিত করব তা ভেবে পাচ্ছি না। হয়তো গভীর আনন্দ এবং গভীর বিষাদ এই দুয়েরই মাস এই আগস্ট বা শ্রাবণ।
২২ শ্রাবণ_ রবীন্দ্র-প্রয়াণের দিনটি সামনে রেখে আজ আমি লিখতে বসেছি। রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন এ কথাটি লিখতে আমার কলমে বাধে। যে মানুষটিকে নিত্য আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রত্যক্ষ করি এবং যিনি আমাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে সদাজাগ্রত, কেমন করে বলি তিনি প্রয়াত হয়েছেন? বাতাস যখন প্রবলবেগে বয় তখন আমরা তাকে বলি ঝড়। কিন্তু বাতাস যখন প্রবলবেগে বয় না, গাছের শাখা একটুও আন্দোলিত হয় না, তখন কি আমরা বলি, বাতাস নেই? বাতাস তো আমাদের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে, সর্ব অঙ্গে নিয়ত প্রবাহিত। এই বাতাস ছাড়া তো আমরা বাঁচতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কি বাঙালি বাঁচে?
রবীন্দ্রনাথ যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ছিলেন আমাদের 'নয়নসমুখে'। মহাপ্রয়াণের পর তিনি বেঁচে আছেন আমাদের 'নয়নের মাঝখানে', হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে। তাহলে প্রতিবছর ২২ শ্রাবণ আমরা শোক করব কার প্রয়াণে, কী করে ভাবব এটি বিষাদের দিন? ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই রবীন্দ্রনাথ তার দেহে অস্ত্রোপচার দ্বারা রোগমুক্তির জন্য শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা যাত্রা করেন। এটিই তার শান্তিনিকেতন থেকে শেষ যাত্রা। শান্তিনিকেতনে 'উদয়ন' গৃহটিতে এ সময় তিনি বাস করতেন। যেদিন তিনি কলকাতায় যাত্রা করবেন, সেদিন আশ্রমের ছেলেমেয়েরা 'উদয়নের' সামনে এসে কবির ঘরের জানালার নিচে দাঁড়িয়ে কবির রচিত গান গেয়েছে_ 'আজি এ প্রভাতে সূর্য্য ওঠা সফল হলো কার?' রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানতেন, তার জীবন আর দশজন মানুষের মতো সুখ-দুঃখময়, কিন্তু সূর্যসফলতার জীবন। এ সূর্যের কোনো অস্তাচল নেই।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য বিচার বা সাহিত্য বিচার আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। তা লেখার মূল্যায়নের জন্য অনেক রবীন্দ্রগবেষক, পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী আছেন। আমি একজন সাধারণ গৌড়জন। আমার সাধারণ জীবনের প্রাত্যহিকতাতেও রবীন্দ্রনাথকে যেমন করে পাই, সে কথাটাই আজ লিখতে চাই। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই সর্বকালের। কিন্তু প্রতিটি কালকে যদি ভাগ করে দেখি, তাহলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ যেন প্রতিটি কালেরই কবি হিসেবে চিহ্নিত। পুরনো কাল যদি বলে, কবি আমাদের তাহলে যেমন আপত্তি করা যাবে না, তেমনি আধুনিককাল যদি বলে তিনি একালের, তাহলেও প্রতিবাদ করা যাবে না। তৎকাল প্রবণতা যেমন আছে রবীন্দ্রনাথের কাব্য-গানজুড়ে, তেমনি আছে সর্বকালপ্রবণতা। একই কবি যিনি বাঙালির আপনজন ভারতের নয়নমণি তিনি সারাবিশ্বের প্রিয় ও পরিচিতজন হয়ে এত দীর্ঘকাল কেমন করে বেঁচে আছেন, সেটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
লন্ডনে একবার রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তীর সভায় এক পণ্ডিত বক্তা বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সর্বকালের কবি। এক বাঙালি শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রত্যেকের কালের কবি। আমরা কয়েক প্রজন্মের বাঙালি রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান গেয়ে প্রেম করি। শোকে-আনন্দে তার গান গাই। তার ভক্তির গানে জীবনের দার্শনিকতা খুঁজে পাই। গত কয়েক যুগে আমাদের জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে, এটা বদল হয়নি।
এই ভদ্রলোককে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু বলার জন্য সভামঞ্চে ডাকা হয়েছিল। একেবারেই সাধারণ মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী। বহু বছর ধরে লন্ডনে আছেন। ব্যবসা করেন। তিনি বক্তৃতা দিলেন না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তিনি শৈশবে তার ঠাকুরমাকে শুনেছেন, নিজের ঘরে বসে গুনগুন করে রবীন্দ্রনাথের পুজোর গান গাইতে। নিজের মাকে রান্না ঘরে বসে গাইতে শুনেছেন, রবীন্দ্রনাথের সুখ-দুঃখের গান। বাসররাতে নিজের স্ত্রীর কণ্ঠে শুনেছেন প্রেমের গান। তার নিজের মধ্যেও রবীন্দ্র-গানের গুনগুনানি আছে। বাঙালি মাত্রেই গান জানে বা গান গায় তা নয়। কিন্তু নিত্যকার জীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের দু'এক লাইন গায় না এমন বাঙালি নেই।
হোমার, দান্তে, ভার্জিল, শেক্সপিয়র_ এসব মহাকবির সঙ্গে এখানেই রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য। পূর্বোক্ত মহাকবিদের অবস্থান পাণ্ডিত্য ও গবেষণায় সীমাবদ্ধ উচ্চতায়। রবীন্দ্রনাথ তাদের মতো উচ্চতায় আছেন, আবার একেবারে নিচে নেমে সেকাল এবং একালের সাধারণ মানুষেরও প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায় মিশে আছেন। মানুষ তার গান গেয়ে প্রেম করে, ভালোবাসে, সুখে হাসে, দুঃখে কাঁদে, শোকে সান্ত্বনা পায়, সুজনকে শ্রদ্ধা করে, দুর্জনের প্রতিরোধ করে, সংকট ও সংকোচের বিহ্বলতাকে দুর্জয় প্রাণশক্তিতে কাটিয়ে ওঠে। বানার্ড শ' তাই রবীন্দ্রনাথকে দেখে বলেছিলেন, 'ঞধমড়ৎব, ও বহাু ুড়ঁ' (ঠাকুর, আমি তোমাকে ঈর্ষা করি)। অনেকে বলেন, রবীন্দ্রনাথের সুন্দর দাড়ি ছিল, শ'য়ের দাড়ি সুন্দর ছিল না; এ জন্য কথাটা শ' বলেছিলেন। আমার ধারণা, এটা শ'য়ের ঠাট্টার কথা নয়, মনের কথাও।
রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিশেষ করে কাব্য ও গানের বিশ্বজনীনতা তখনই উপলব্ধি করি, যখন দেখি এ যুগের স্পেনীয় ভাষার কবি পাবলো নেরুদার কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের পঙ্ক্তির সংযোজন, রোঁমা রোঁলার সাহিত্যে রবীন্দ্র দর্শনের উপস্থিতি। কিংবা সুদূর আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তৃতায় শুনি কবির 'ক্ষমা করো ধৈর্য ধরো, হোক সুন্দরতর...' কবিতাটির কয়েক পঙ্ক্তির ইংরেজি ও আফ্রিকান ভাষার তরজমা। অক্সফোর্ডে শেক্সপিয়রের মূর্তির পাশাপাশি রবীন্দ্র মূর্তি তো স্থাপিত হয়েছে বহুকাল আগে। এবার রবীন্দ্র-সার্ধ জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডনেও তার একটি স্ট্যাচু স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো কুস্টিয়ার শিলাইদহে একটি আন্তর্জাতিক মানের রবীন্দ্র-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা ইতিমধ্যেই দিয়েছেন।
আগেই লিখেছি, রবীন্দ্রনাথের স্বকাল এবং সকল কালের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সমসাময়িকতা এবং তা কাটিয়ে উঠে চিরকালের হয়ে যাওয়া অভূতপূর্ব এবং অতুলনীয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধের আন্দোলনের জন্য তিনি যে গান লিখেছিলেন, ছেষট্টি বছর পর ১৯৭১ সালে দেখা গেল সে গান হয়ে গেছে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে পরামর্শ চাইতে, সাহস অর্জনে মহাত্মা গান্ধী রবীন্দ্রদর্শনে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত এসেছেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের এক জীবনীকারের লেখায় পড়েছি, চলি্লশের দশকের গোড়ায় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সুভাষ চন্দ্র যখন গোপনে ভারত ত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নেন, তখন গুনগুন করে রবীন্দ্রনাথের গানের যে অংশটুকু গাইতেন তা হচ্ছে, 'গনি গনি দিনক্ষণ/চঞ্চল করি মন/বলো কি যাই কি না বাইরে/সংশয় পারাবার অন্তরে হবো পার/উদ্বেগে তাকায়োনা বাইরে।'
আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা তো আমি নিজের চোখেই দেখেছি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সঙ্গে শেখ মুজিবের ত্রুক্রসিয়াল বৈঠকের সময় প্রতিটি বৈঠক শেষে তিনি যে গানটি গুনগুন করে গাইতে গাইতে ঘরে ফিরতেন তা হচ্ছে_ 'নাই নাই ভয়/হবে হবে জয়/খুলে যাবে এই দ্বার।' সে সঙ্গে একটি ফিল্মি গানও গাইতেন, 'জয় হবে, জয় হবে, হবে জয়/ মানবেরতরে মাটির এ পৃথিবী, দানবের তরে নয়।' এটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের গান নয়। এর ছত্রিশ বছর পর ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যখন এক-এগারোর আধা-ফৌজি শাসন চলছে; শেখ হাসিনা বিদেশে চিকিৎসার জন্য এসে আটকে পড়েছেন, তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না; তখন হাসিনাকে তার লন্ডনের ফ্ল্যাটে বসে গান গাইতে শুনেছি, 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।'
ভারত-ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের বাম তথা কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ ধুয়ো তুলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ আমজনতার কবি নন। তিনি বুর্জোয়াদের কবি। এ নিয়ে অনেক তাত্তি্বক বিতর্ক তখন চলেছে। আমি তাতে যাব না। কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা লিখব : ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল মাসের দিকে পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা থেকে জীবন বাঁচাতে ঢাকা ছেড়ে ফরিদপুর হয়ে বরিশালে যাচ্ছিলাম। আমি লঞ্চযাত্রী। সহযাত্রীদের অধিকাংশই দাড়ি-টুপিওয়ালা বুড়ো মুসলমান কৃষক। আমরা সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাচ্ছি। বরিশাল তখনও মুক্ত এলাকা (২৫ এপ্রিল বরিশাল হানাদাররা দখল করে)।
সেই লঞ্চে বসে সবাই আকাশ বাণীর অনুষ্ঠান শুনছিলেন। নদীবক্ষে হানাদারদের গোয়েন্দা-নজর ছিল না। বেতারে বারবারই বাজানো হচ্ছিল, রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি' গানটি। চেয়ে দেখি, বৃদ্ধ মুসলমান যাত্রীদের চোখ দিয়ে দরদর করে পানি গড়াচ্ছে। তারাও গানটি গাইবার চেষ্টা করছেন। নিরক্ষর চাষি যুবক, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে কাঁধে স্টেনগান ঝুলিয়েছে, তাকেও দেখেছি এই গানটি শুনে, নিজে গেয়ে দুর্জয় মনোবলের প্রকাশ দেখাতে। আমি তখন কলকাতার এক বামপন্থি বুদ্ধিজীবী বন্ধুকে বলেছিলাম, আপনাদের গণসঙ্গীত অবশ্যই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য জোগাচ্ছে; কিন্তু সবচেয়ে বেশি শক্তি, সাহস ও প্রেরণা জোগাচ্ছে আপনারা যাকে বুর্জোয়া কবি বলে বাতিল করেছিলেন সেই রবীন্দ্রনাথ।
শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নয়, সভ্যতার সংকটে, মানবতার দুর্দিনে কোথায় নেই উচ্চকণ্ঠ রবীন্দ্রনাথ? কেবল কি জালিয়ানওয়ালাবাগের বর্বর হত্যাকাণ্ডেই তিন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রশ্ন করেছেন, 'তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছো ভালো', তা নয়। এ প্রশ্নের জবাবে নিজেই তিনি প্রার্থনা করেছেন, 'ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা।' বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান (ইংরেজি, জার্মানি, এমনকি স্প্যানিস ভাষায় অনূদিত) এখন সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ইউরোপে জন্ম নেওয়া একালের নতুন প্রজন্মের বাঙালি তরুণীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান শুনেছি আর ভেবেছি, রবীন্দ্রনাথ সর্বকালের চির আধুনিক কবি ও গীতিকার। একালেরও।
স্বৈরাচারী শাসকদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ভীতির কারণ ছিলেন তা সবার জানা। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা বারবার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে রবীন্দ্রনাথকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছেন। আবার ঠেকায় পড়লে তাদের কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নেওয়ারও চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ যখন ঢাকার বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করেন, তখন তার শপথ গ্রহণ শেষের ভাষণের প্রথম কথাই ছিল 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির।' কিন্তু এই উচ্চারিত বাক্যের অথবা শপথের মর্যাদা তিনি রক্ষা করতে পারেননি।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অতুলনীয়, অদ্বিতীয়। বিশ্বে আর কোনো রবীন্দ্রনাথ জন্মাননি, ভবিষ্যতে জন্মাবেন কি-না জানি না। আমাদের গর্ব, তিনি বিশ্বের; কিন্তু তারও আগে বাংলার এবং বাঙালির। বাঙালি আজ রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত কিন্তু সাংস্কৃতিক জাতিত্বে অবিভাজ্য। ইংরেজি ভাষাভাষীদের মতো রয়েছে তাদেরও অভিন্ন কালচারাল নেশনহুড। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাই দুই বাংলা, সারা উপমহাদেশ একই সঙ্গে জন্মবার্ষিকী পালন করে, মৃত্যুদিবস নয়। তার মৃত্যুদিবস নেই। বাইশে শ্রাবণ তিনি নয়নের বাইরে চলে গেছেন। কিন্তু হৃদয়ের গভীর গহনে স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন।
লন্ডন, ৪ আগস্ট ২০১১, বৃহস্পতিবার

No comments

Powered by Blogger.