সার্ধশততম রবীন্দ্রজয়ন্তী

রবীন্দ্রনাথ শুধু শিল্পে-সাহিত্যে নন, প্রত্যেক বাঙালির চিন্তায়, চেতনায়, মননে_এক কথায় সমগ্র সত্তাজুড়ে প্রবলভাবে বিরাজমান। তাই তাঁর জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখ এলেই প্রতিটি বাঙালির মন উচ্ছ্বসিত হয়, ভালোবাসায় সিক্ত হয়, শ্রদ্ধায় অবনত হয়।


এবার তাঁর দেড় শততম জন্মদিনে শুধু বাংলা বা বাংলাদেশ নয়, গোটা ভারতবর্ষই যেন মেতে উঠেছে এক অপার আনন্দে। এই মহান কবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান করাসহ বেসরকারিভাবেও ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করা হচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলোও রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে যাচ্ছে। এভাবেই প্রাণের কবি পেঁৗছে যান প্রাণের আরো গভীরে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁর বিচরণ হয়ে যায় অবারিত।
এবারই প্রথম রবীন্দ্র ছায়াবলয়ের মধ্যে থাকা দুটি দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে যৌথ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি ঢাকায় পেঁৗছেছেন। তিনি ৫৯ সদস্যের একটি ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ৪৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নয়াদিলি্লর অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছে। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের দেড়শততম জন্মবার্ষিকী অভিন্ন ঐতিহ্যের অনুসারী দুটি দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নৈকট্য বৃদ্ধির একটি সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা আশা করি, উভয় দেশই এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে।
ইংরেজ শাসনামলের শেষদিকে ধূর্ত ইংরেজ শাসকরা ধর্মের ভিত্তিতে জাতিকে সংজ্ঞায়িত করে আমাদের অভিন্ন ঐতিহ্যকে বিভক্ত করতে চেয়েছিল। সৃষ্টি করেছিল দ্বিজাতিতত্ত্ব। তার পরিণতিস্বরূপ সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবলে গোটা ভারতবর্ষের মাটি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। সেই ভুল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে আমাদের পাকিস্তানের অংশ করা হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহ্যের স্থান মানুষের হৃদয়ে, একে কোনো ষড়যন্ত্র দিয়ে বিভক্ত করা যায় না। যেমন পারেনি ইংরেজ ও পাকিস্তানি শাসকরা। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু যেখানে বাধা আসে, সেখানেই থাকে বাধা ডিঙানোর চেষ্টা। আর তাই রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ছায়ানটসহ বিভিন্ন সংগঠন। পহেলা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণে রবীন্দ্রসংগীতভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলোর জয়জয়কার শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় দেড়শততম রবীন্দ্রজয়ন্তীতে জাতি আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম এই রূপকারকে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের এক ফরমানে বাঙালি জাতির অভিন্ন সত্তা কিছুটা হলেও খণ্ডিত হয়েছে। তাই আমরা পঁচিশে বৈশাখ যেদিন করছি, তার একদিন পর পঁচিশে বৈশাখ পালন করবে পশ্চিমবাংলা ও ভারতের জনগণ। একইভাবে নববর্ষ ও অন্য অভিন্ন দিবসগুলো পৃথক সত্তা লাভ করেছে। বাংলাদেশেও প্রতিবছর নববর্ষ দুই দিনে পালন করা হয়। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করলে জাতি আবার তার অভিন্ন ঐতিহ্যের অখণ্ডতা ফিরে পাবে।

No comments

Powered by Blogger.