আবাসন ব্যবসা-প্রতারিত ফ্ল্যাট-ক্রেতারা কোথায় যাবে? by তোফায়েল আহমেদ

রিয়েল এস্টেট এ দেশে দ্রুত বিকাশমান একটি ব্যবসা ও শিল্প। এ ব্যবসা ও শিল্পের সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বিকাশ দেশে সংকটাপন্ন আবাসিক সমস্যার সমাধান, আধুনিক নগর বিনির্মাণ, নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।


কিন্তু কিছু রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে এ খাতের যে অসুবিধাগুলো আজকাল বহুল আলোচিত তা হচ্ছে পরিবেশ বিপন্নতা; জমি, জলা, খাসজমি জবরদখল, অপদখল অথবা যথাযথ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা ঠকানোর বিষয়টি। এ ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী যারা ড্যাপ নীতিমালা ও পরিবেশ আইন ভঙ্গ করেছে বা জমি যথাযথভাবে ক্রয় না করে বা যথাযথ অনুমোদনের পূর্বে প্লট বিক্রি করছে, মূলত তাদেরকেই টার্গেট করে রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ওই সব প্রকল্পের সাইনবোর্ড অপসারণ ও অর্থদণ্ডের কিছু ঘটনা সর্বসাধারণের নজরে এসেছে। বিলম্বে হলেও রাজউকের এসব পদক্ষেপ সর্বত্র অভিনন্দিত হচ্ছে। আশা করি এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এস্টেট উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ক্রেতার সংশ্লিষ্টতা এবং বৃহত্তর বিনিয়োগ মূলত ফ্ল্যাট ব্যবসায়। এ ব্যবসায় মোট যে পুঁজির হিসাব রিহ্যাব দেয়, তার জোগানদার কিন্তু এ দেশের কয়েক লাখ মধ্যবিত্ত। যারা শহরে একটি নিজস্ব ঠিকানার জন্য সারা জীবনের ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের পুরোটা রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু কিছু অসাধু ও প্রতারক প্রতিষ্ঠান নিরীহ মধ্যবিত্তের এ স্বপ্নসৌধ ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে। তাদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে। একজন ব্যক্তি-ক্রেতা একটি পেশাদার অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে নিতান্ত অসহায়। এ শিল্প ও ব্যবসায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো সংঘবদ্ধ শক্তি হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে। প্রতিটি কোম্পানি করপোরেট হাউস হিসেবে পেশাদার প্রতিষ্ঠান। একজন নিরীহ ফ্ল্যাট-ক্রেতা এ ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন একজন ভোক্তামাত্র; মূলত কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির কথা বিশ্বাস করে, বিজ্ঞাপন, প্রসপেকটাস ইত্যাদির ভিত্তিতে ফ্ল্যাট ক্রয়ের বায়না করে এবং কিস্তি পরিশোধ করে যায়।
দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসহায় ক্রেতারা ডেভেলপার কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে। এর প্রতিকারে সরকার প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ নিয়েছে—রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০। কিন্তু এ বিষয়ে একদিকে জনসচেতনতার অভাব, অপরদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনকে প্রভাবিত করার মতো অর্থ, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি, পেশাদারি, যা ডেভেলপারদের রয়েছে, তার সঙ্গে ফ্ল্যাট-ক্রেতারা পেরে উঠছেন না। এত সমস্যা সত্ত্বেও এই আইনে মামলা দায়েরের দৃষ্টান্ত বিরল। অথচ হাজার হাজার ফ্ল্যাট-ক্রেতা ডেভেলপারের হাতে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে প্রতারণার ধরন বিশ্লেষণ প্রয়োজন। প্রথমে সূক্ষ্ম প্রতারণার কিছু ধারণা দেখা যেতে পারে। ভবনের ভৌত কাঠামো, নকশা ও উপকরণের গুণগত মান এবং পরিমাপ ও পরিমাণে তারতম্য করা হয়। বিশেষত নির্মিতব্য বা নির্মাণাধীন ভবনের মাটির নিচের ভিত্তি, কাজের গুণগত মান পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। যারা ক্রয় করে তারা পরস্পরকে চেনে না এবং অনেকে ভিত্তির কাজ শেষ হওয়ার পরই ফ্ল্যাট বুকিং দেয়, তাই ক্রেতার পক্ষে এসব দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রায় ক্ষেত্রে ডেভেলপাররা নকশা কারিগরি মানসম্মতভাবে করে না এবং নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মানও রক্ষা করে না। বিষয়টি ক্রেতার নিশ্চিত হওয়ার বাস্তব সুযোগ সীমিত। কোনো সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ (রাজউক ও গৃহায়ণ অধিদপ্তর) এ বিষয়ে নজরদারি করে বলেও জানা নেই। পূর্তকাজ বা সিভিল ওয়ার্কের সঙ্গে সঙ্গে এখানে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সুয়ারেজ, পানি সরবরাহসহ আরও অনেক কারিগরি বিষয় থাকে। থাকে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার (সাবস্টেশন), লিফট, জেনারেটর, পানি উত্তোলন ব্যবস্থা, ইন্টারকমসহ অনেক স্থাপনা। এসব ক্রেতার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে স্বচ্ছতার সঙ্গে উল্লেখ থাকে না। ফলে স্থাপনা স্থাপিত হলেও এখানে গুণগত মান রক্ষিত হয় না। প্রতারণার একটি ফাঁদ সূক্ষ্মভাবে পাতাই থাকে এবং ক্রেতাকে চুক্তির সময় না বুঝে বাধ্য হয়েই পেশাদার প্রতারকের ফাঁদে পা দিতে হয়। তারপর সূক্ষ্ম প্রতারণার আরও বহু জায়গা থাকে বৈদ্যুতিক, স্যানিটারি ফিটিংস, রং, ডিসটেম্পার ইত্যাদি ক্ষেত্রে। ডেভেলপাররা গুণগত মান নিম্নপর্যায়ে রেখে মোট চুক্তিমূল্যের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় করে থাকে এভাবেই।
স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় প্রতারণার ঘটনা ঘটে সময়মতো বা ছয় মাস বর্ধিত সময়ের মধ্যেও সম্পূর্ণভাবে নির্মাণ, স্থাপনা, ফিটিংস ইত্যাদি সমাপ্ত করে ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করার মাধ্যমে। প্রথমত বিলম্ব হয়, কিন্তু বিলম্বের জন্য চুক্তি অনুযায়ী ভাড়ার টাকা পরিশোধ করেন না মালিকেরা। তারপর অনেক ক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে জমির মালিকের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিবন্ধনে বিলম্ব। কাজ অসম্পূর্ণ রেখে নিবন্ধন শেষ করতে পারলে ২৫-৩০ শতাংশ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ডেভেলপারের গায়েব হয়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্রেতারা বাধ্য হয়েই ওপরে বর্ণিত এ প্রতারণাগুলোকে মুখ বুজে মেনে নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে সব অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে ফ্ল্যাট বুঝে নিয়েছে অথবা শেষ পর্যন্ত ‘ভিক্ষা চাই না বাবা কুত্তা সামলাও’ অবস্থার শিকার হয়ে ফ্ল্যাট নিবন্ধন করে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। কিছু ডেভেলপার ভবনের শুধু একটি কাঠামো দাঁড় করিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতরের সব কাজ ফ্ল্যাট-ক্রেতার ওপর চাপিয়ে মেয়াদ শেষে চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য সিভিল ওয়ার্ক, স্থাপনাসমূহ যথা ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, সোলার প্যানেল, লিফট, ইন্টারকম স্থাপন না করে দুই-তিন বছর কোনো যোগাযোগ করে না। ক্রেতারা ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়ে। মামলা করে তিন-চার বছর পর্যন্ত ঝুলে থাকে। না বাড়ি নির্মাণ সমাপ্ত হচ্ছে, না তারা তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাচ্ছে। অনেক জমির মালিকও এভাবে ডেভেলপারের হাতে প্রতারিত। অথচ ওই একই কোম্পানি অন্য নামে অন্য ব্যবসা করছে এমনকি হাউজিং ব্যবসাও করে যাচ্ছে। প্রতারিত ক্রেতা ও জমির মালিকদের মধ্যে প্রবাসীদের অবস্থা আরও করুণ।
এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য, প্রথমত, অর্থনীতির একটি বিকাশমান সেক্টর বা খাত হিসেবে এখানে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ খাতে যারা সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে তারা, রিহ্যাব ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। কারণ, এ খাতে সরকারের যে আয়, তার জোগানদাতা কিন্তু ডেভেলপাররা নয়, প্রকৃত অর্থে ফ্ল্যাট ও প্লট-ক্রেতারা। প্রতিটি ফ্ল্যাট-ক্রেতা ফ্ল্যাট নিবন্ধনের সময় প্রতি বর্গমিটার হিসেবে সরকারকে রাজস্ব দিয়ে থাকে। তাই সরকারকে এ দায়িত্ব অবশ্যই নিতে হবে।
অনেক বিরুদ্ধতার মধ্যেও রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন পাস নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু দীর্ঘদিনের হাজার হাজার বিরোধ এখানে পুঞ্জীভূত থাকায় এ আইনে মামলা করাই যথেষ্ট নয়। গণপূর্ত ও আবাসন, স্বরাষ্ট্র ও জেলা প্রশাসন এবং আদালতের সহায়তায় যৌথভাবে কিছু নির্বাহী পদক্ষেপ জরুরিভাবে সরকার নিতে পারে। নিচে সে লক্ষ্যে কিছু সুপারিশ বিবেচনার জন্য দেওয়া হলো:
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ সেল গঠন করে দেশের সব ফ্ল্যাট-ক্রেতার কাছ থেকে অভিযোগগুলো গ্রহণ করে অভিযোগের গুরুত্ব অনুসারে ডেভেলপার ও ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারে। ওই বিশেষ সেলে রাজউক, রিহ্যাব ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকতে পারেন।
নির্মাণাধীন ও নির্মাণ সমাপ্ত ফ্ল্যাট বা ভবনসমূহের নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী গুণগত মান রক্ষিত হয়েছে বা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য রাজউক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসা, প্ল্যানারস অ্যাসোসিয়েশন, আর্কিটেক্ট প্রতিনিধি নিয়ে ভিজিলেন্স টিম করে রাজউক অনুমোদিত প্রতিটি ভবন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে পারে।
ফ্ল্যাট নির্মাণকালের মধ্যে মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে ফ্ল্যাটসমূহ দ্রুত নিবন্ধনের বন্দোবস্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাজউকের কর্মচারীদের ঘুষ-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। রাজউকের আইন অনুযায়ী বিক্রয় অনুমতিপত্র জারি হওয়ার পর বোর্ডের নতুন সিদ্ধান্ত বণ্টননামার ফাঁদে পড়ে অনেকের নিবন্ধন বিলম্বিত হচ্ছে। অথচ আইনের বিধানের সঙ্গে রাজউকের বোর্ডের নতুন সিদ্ধান্ত সংগতিপূর্ণ নয়।
ফ্ল্যাট-ক্রেতা, জমির মালিক ও ডেভেলপার যেকোনো দুই পক্ষের মধ্যে উদ্ভূত বিরোধ আপস-নিষ্পত্তির জন্য একাধিক সালিস বোর্ড গঠন করে দিতে পারে। আইনে যেভাবে ধারা ৩৬-এ বিধান করা হয়েছে, তাতে বহু সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।
রাজউকের এমন কিছু নীতি ও সার্কুলার রয়েছে, যা এস্টেট উন্নয়ন আইন, ২০১০-এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সেগুলো বাতিল হওয়া উচিত। যেমন—ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট-ক্রেতা ও ডেভেলপারের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়। কিন্তু রাজউক এ ক্ষেত্রে বণ্টননামার শর্ত আরোপ করায় অনেক ক্রেতা ভূমি মালিকের অসহযোগিতার কারণে ফ্ল্যাট নিবন্ধন করতে পারছে না।
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন আইন, ২০১০-এর ৩৬ ধারায় আপস-মীমাংসার প্রচেষ্টা এবং ২০০১-এর সালিস আইনের অধীনে মামলা নিষ্পত্তির শর্ত আরোপ করায় ফ্ল্যাট-ক্রেতারা সরাসরি মামলা নিয়ে আদালতে যেতে পারছে না। এ বিষয়ে নতুনভাবে ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
সর্বোপরি, একটি বিকাশমান খাত হিসেবে এ শিল্প ও ব্যবস্থাকে আইনগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বিশেষত সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। ফ্ল্যাট-ক্রেতা নিরীহ ব্যক্তিদের শুধু রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের অনুগ্রহের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আইন করা হয়েছে, কিন্তু এ আইনে প্রতিকার পেতে যে অসুবিধাগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধন করা উচিত। তা ছাড়া আইন কার্যকর হওয়ার আগে থেকে প্রকৃত ফ্ল্যাট-ক্রেতাদের সঙ্গে ডেভেলপারের অসুবিধা ও বিরোধসমূহ মীমাংসার একটি সরকারি উদ্যোগে বিশেষ সেল, কমিটি বা ট্রাইব্যুনাল করে নিষ্পত্তি করা যায় কি না, তা ভেবে দেখতে অনুরোধ করি।
ড. তোফায়েল আহমেদ: শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী।

No comments

Powered by Blogger.