বৃত্তের ভেতর বৃত্ত-সংসদে যোগদান এবং বিরোধীদলীয় নেতার 'অঘটনের' শঙ্কা by দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

দীর্ঘদিন পর জাতীয় সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সদস্যরা একটানা ৭৪ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থেকে চলতি অধিবেশনে আসন রক্ষার জন্য সংসদে যোগ দিয়েছেন কি না_এই বিতর্কে না গিয়েও জাতীয় সংসদে তাঁদের যোগদানকে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন।


গত বছরের ২ জুনের পর থেকে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ বর্জন করে আসছিলেন। ১৪ মার্চ সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ সংবাদ সম্মেলনে ১৫ মার্চ থেকে বিএনপি এবং জোটের অন্য মিত্রদের সংসদে যোগদানের কথা জানান। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দলের সংসদে ফেরার এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এ-ও মনে করি, সরকারি এবং বিরোধীদলীয় জোটের নেতারা বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে অবশ্যই গঠনমূলক রাজনীতির প্রতি অধিকতর মনোযোগী হবেন।
বিশ্ব রাজনীতি এখন এক সংকটময়কাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে এর কম-বেশি বিরূপ প্রভাব সংগত কারণেই পড়ছে। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যমান সমস্যা-সংকটও কম নয়। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদ অধিকতর কার্যকর থাকা সার্বিক প্রেক্ষাপটেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নেতারা জাতীয় সংসদকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার কথা অহরহই বলে থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এর উজ্জ্বল প্রমাণ ইতিমধ্যে আমরা খুব একটা পাইনি। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল যদি জাতীয় সংসদে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাবে জনচিত্র ও সার্বিক পরিস্থিতি কতটা উজ্জ্বল হতে পারে_এমন দৃষ্টান্ত আমরা কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালেই দেখতে পাই। শুধু সরকারি দলই সরকার পরিচালনা করে না, সেখানে বিরোধী দলেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদি সংসদ অকার্যকর থাকে, তাহলে এই ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। সংসদীয় গণতন্ত্র বলে, বিরোধী দল সরকারেরই একটি অংশ। বিরোধী দলের একটি ছায়া-সরকার থাকে। সংসদই হয় সব আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক-বিবাদ এবং সমস্যা-সংকট সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সামনে এমন দৃষ্টান্তও আছে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কিংবা উন্নত গণতন্ত্রে রাস্তায় আন্দোলনের প্রয়োজন হয় না। জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর ইত্যাদি বিষয় সেখানে পরিত্যাজ্য। এই ধ্বংসাত্মক ঘটনাবলি একটি রাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি, উন্নয়ন, অগ্রগতি সব কিছুরই প্রতিবন্ধক এবং সুস্থ পরিবেশের বড় শত্রু।
জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিরোধী জোট সংসদে যোগ দেওয়ার পর প্রথম দিনেই বিরোধী নেতা বক্তব্য রেখেছেন এবং তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেছেন, দেশ খসড়া সংবিধান দিয়ে চলছে। দেশে এখন কোনো সংবিধান নেই। শুধু অভিযোগ নয়, বিরোধীদলীয় নেতা দেশে যেকোনো সময় 'ভয়াবহ কিছু ঘটে যেতে পারে'_এমন আশঙ্কাও করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে যেকোনো সময় ভয়াবহ এমন কী কিছু ঘটে যেতে পারে, এটা অবশ্যই স্পষ্ট করা উচিত। দেশের প্রধান বিরোধী দল বা জোটের নেতা যখন এমন কিছু বলেন, তখন তা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। তাঁর এমন বক্তব্য অনেক শঙ্কা-উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভয়াবহ কী ঘটে যেতে পারে, তা নিশ্চয়ই তিনি জানেন। তা না হলে এমন বক্তব্য তিনি রাখেন কী করে? দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে তাঁকে তা সরকারকে স্পষ্ট করে জানানো উচিত এবং দেশ-জাতির স্বার্থেই এমন ভয়াবহ কিছু যাতে না ঘটে তাঁরও সে রকম অবস্থান নেওয়া উচিত। সাধারণ মানুষ তাঁর এমন বক্তব্যের পর সংগতই নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে 'অঘটন' তো এ যাবৎ কম ঘটেনি। আর কত ঘটলে আমাদের রাজনীতিকরা তৃপ্ত হবেন?
সংসদে যোগ দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সেদিন পয়েন্ট অব ওর্ডারে দাঁড়িয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সাত মিনিট বক্তব্য দিয়েছেন। সংসদ নেতার অনুপস্থিতিতে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এই বক্তব্যের জবাবও দিয়েছেন। ওই দিন সংসদে যুক্তিতর্কের যে উপস্থাপনা দেখা গেছে, তা গণতন্ত্রের অলংকার বটে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অশোভন মন্তব্য এবং কটূক্তিও শোনা গেছে। আমাদের স্মরণে আছে, এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ কী ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি অতীতে করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পশ্চাৎপদ রাজনীতির এই বৃত্ত ভেঙে দেওয়া অতি জরুরি। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এত দিন সংসদ অধিবেশনে যোগ না দিলেও সংসদীয় কমিটির সভায় যোগ দিয়েছেন। সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা বিদেশ সফরও করেছেন। দেশের মানুষ আশা করে, এখন থেকে তাঁরা সংসদে উপস্থিত থেকে সংসদকে কার্যকর রেখে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ কণ্টকমুক্ত করবেন। দেশের মানুষ আশা করে, বিরোধী জোটের সংসদে ফেরা কেবল সদস্যপদ রক্ষার জন্য হবে না। একই সঙ্গে দেশের যেসব মানুষ গণতন্ত্রকে, জাতীয় সংসদকে কার্যকর দেখতে চান, গঠনমূলক রাজনীতির পরিচর্যা দেখতে চান, রাজীতিকদের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আর জনকল্যাণের অপর নাম যদি হয় রাজনীতি, তাহলে রাজনীতিকদের সংকীর্ণতার পথ বর্জন করা খুবই দরকার। রাজনীতির যাঁরা ধারক-বাহক তাঁরা যে দেশ-জাতির কাছে দায়বদ্ধ, সেটি ভুলে না গেলেই মঙ্গল।
১৫ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগদানের দিন ও এর পরের দিন কয়েকজন সংসদ সদস্য তাঁদের বক্তৃতায় এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা আক্রমণাত্মক তো বটেই; অসংসদীয় ও কুরুচিপূর্ণও বটে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ভারতের মতো দেশগুলোতে সংসদে হৈচৈ হয়; কিন্তু সেসব দেশের সংসদ সদস্য, সিনেটর, কংগ্রেসম্যানরা সংসদীয় রীতিনীতি, ডিসেনসির সীমানা ছাড়ান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের বেলায় এমনটি পরিলক্ষিত হলে এ নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। তীব্র সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হন তাঁরা। কিন্তু আমাদের এখানে চিত্রটা ভিন্ন। ওই সব রাজনীতিক তর্ক-বিতর্ক করেন কিন্তু তা যাতে জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ন্ন না করে সেটা লক্ষ রাখেন। এই যে বেগম খালেদা জিয়া 'অঘটন ঘটার' কথা বলে জনগণকে আতঙ্কিত করলেন, এর শেষ পরিণতি কী, আমরা তা জানি না। তাঁরা একটানা ৭৪ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থেকেও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর অর্থে নিজেদের বেতন-ভাতা নিতে কিংবা অন্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। এমন ঘটনা অতীতেও বহুবার ঘটেছে। বেগম খালেদা জিয়া এক ব্যক্তির শাসনে দেশ চলার বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তা কিন্তু অযথার্থ নয়। আমাদের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে একক নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। তিনিও ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো তখনো বলবৎ ছিল। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে আবার দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলেও মাঝে ১৬ বছর তা ছিল না। এসব বিষয় তো তাঁদের জানাই আছে। কাজেই এমন মন্তব্য দায়িত্বশীলতা কিংবা দূরদর্শিতার পরিচয় কতটা বহন করে সে প্রশ্নও আসে।
মহাজোট সদস্যরা শতকরা ৮৮ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছেন। বিরোধী দলের দাবি, তাঁরা দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন। আর এ জন্যই বিরোধী দল মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবি করছে। মাত্র ২৬ মাসের মাথায় বিপুল ভোটে বিজয়ীদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি গণতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনোটির জন্যই সুখকর নয়। দেশের মানুষ এ-ও আশা করে, বিরোধী জোট সংসদে উপস্থিত থেকে সরকারের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হবে। একটি কথা অস্বীকারের উপায় নেই, ইতিমধ্যে এ সরকারের অর্জন কম নয়। কিন্তু পাশাপাশি এ-ও সত্য, এত অর্জনের বিসর্জন এই সরকারের কারো কারোর জন্যই ঘটছে। এত কিছুর পরও দেশের মানুষ আশা করে, সরকার শেষ পর্যন্ত সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে এবং বিরোধী দল বা জোটও তাদের দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ হবে। নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে জনগণই আবার ঠিক করবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কাদের দেওয়া উচিত। সে পর্যন্ত সবারই ধৈর্য ধারণ এবং অপেক্ষা করা শ্রেয়। এর মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথ প্রশস্ত করা সম্ভব। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু জনগণই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, সেহেতু জনগণকে যাঁরাই অবজ্ঞা করবেন_তাঁদের জন্য ফল বুমেরাং হতে বাধ্য। এমন দৃষ্টান্তও আমাদের সামনেই রয়েছে। আমাদের রাজনীতির বিবর্ণ চেহারা একদিনে হয়নি। এর জন্য কে কতটা দায়ী, তাও সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন।
লেখক : সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.