মানবাধিকার-কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ ও লিমনের গল্প by অদিতি ফাল্গুনী

ফ্রানৎস কাফকার দ্য ট্রায়াল বা বিচার উপন্যাসের নায়ক জোসেফ কে. এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তাঁর ফ্ল্যাটে পুলিশ। ত্রিশোর্ধ্ব ও অবিবাহিত যুবক জোসেফ কে. কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না, কেন পুলিশের লোকেরা তাঁর মতো এক নিরীহ, নির্বিরোধ ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়িতে এসেছে।


দ্রুতই জোসেফের প্রতি তাঁর বাড়িওয়ালি ভদ্রমহিলা, অফিসের সহকর্মী বা চেনা-জানা সবার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যেতে থাকে। বিচার নামের এক হাস্যকর গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে অবশেষে একদিন হঠাৎই পেছন থেকে পুলিশ গুলি করে তাঁকে। পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যেতে যেতে নিজের অপরাধ না জানা জোসেফ বলেন, ‘কুকুরের মতো!’ অর্থাৎ কুকুরের মতো মৃত্যু হলো তাঁর।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এ বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশের তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মানুষ ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া বা অঙ্গহানির ঘটনাও কম ঘটেনি। গত বছর র‌্যাবের ভুলের শিকার হয়ে চিরতরে এক পা হারানো পঙ্গু কিশোর লিমনের নিষ্পাপ মুখচ্ছবি সমগ্র দেশবাসীকে কাঁদিয়েছে। সারা দেশের সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, সাধারণ মানুষ লিমনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তবু আসলেই কতটুকু করতে পেরেছি আমরা লিমনের জন্য, বিনা বিচারে নিহত বা ‘হারিয়ে যাওয়া’ মানুষ ও তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য?
সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো বিশ্বের তরুণ সমাজকে শেখাচ্ছে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে খুব দ্রুতগতিতে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হতে। মূলত এই প্রণোদনা থেকেই আরব বিশ্বে দেখা দিয়েছে ‘আরব বসন্ত’। পতন হয়েছে কয়েকটি রাষ্ট্রের স্বৈরশাসকদের। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবাদী তারুণ্য তার লড়াইয়ের নতুন রাস্তা খুঁজে নিচ্ছে ব্লগ, ফেসবুক বা সোস্যাল নেটওয়ার্কিং মিডিয়ায়। গত বছর কিশোর লিমনের এমনি অঙ্গহানির খবরে আমরা বিভিন্ন পেশার কিছু বন্ধু-বান্ধবী মিলে ফেসবুকে গঠন করেছিলাম ‘লিমনের জন্য জীবনের জন্য’ নামে একটি গ্রুপ। শাহবাগের জাদুঘরের সামনে একটি বড় মানববন্ধন আয়োজনে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম, যেখানে দেশের বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর বা ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী থেকে এ প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কৃষ্ণকলিসহ অনেকেই শামিল হয়েছিলেন। মূলত লিমনকে সামনে রেখেই নাগরিকদের বিচারবহির্ভূত হত্যা, অঙ্গহানি ও নিরুদ্দেশের প্রতিকার খোঁজার ও লড়াইয়ের বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল আমাদের। লিমনের পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন, তার ওপর থেকে র‌্যাবের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ এ পর্যন্ত বিনা বিচারে নিহত, আহত ও নিখোঁজ মানুষদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও মামলায় ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়ার জন্য অনলাইনে এবং সামনাসামনি স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজও আমরা শুরু করেছিলাম। আমাদের গ্রুপ থেকে দুবার আমি ও আমার দুই বন্ধু বর্মণ মিরপুরের পঙ্গু হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম লিমনকে। শেষ ওকে আমি একাই দেখতে যাই বোধ করি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। কোনো এক হরতালের দুপুরে। লিমন তখন ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে। ওর বাবা-মা তখন আর ওর পাশে নেই। রাবারের পা পরে ফিজিওথেরাপি আর কম্পিউটার ক্লাস শেষ করে বেডে ফিরেছিল সে।
এরপর ঝালকাঠি চলে যেতে হয় লিমনকে। মাঝে মাঝেই ও ফোন করে আমাকে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ওর বড় ভাই একদিন ঢাকা এসে দেখা করে আমার সঙ্গে। শ্রমিক বাবার দৈহিক মেহনত আর নিজেদের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির জোরে তারা তিন ভাই-বোনই লেখাপড়া শিখেছে। নিজে সে চাকরি পেয়েছিল একটি এনজিওর ‘ক্ষুদ্র ঋণ’ কার্যক্রমে। কিন্তু লিমনের বিরুদ্ধে র‌্যাব মামলা দায়ের করায় সেই চাকরি তাকে ছেড়ে দিতে হয়। আমার কাছে সে চাকরির জন্য সাহায্য চায়। আমারই বা কতটুকু ক্ষমতা? তবু চেনা-জানা কিছু ক্ষমতাবান মানুষকে ই-মেইল, ফেসবুক বা ফোনের মাধ্যমে লিমনের বিএ পাস ভাইয়ের জন্য ছোটখাটো কোনো চাকরির ব্যবস্থা চাই। উত্তর মেলে না। উত্তর পাই না বলে লিমনের ফোন ধরতে আমারও সংকোচ বোধ হতে থাকে। এতটুকু কিশোরের কী কষ্ট! কলেজ থেকে বাসা অনেক দূর বলে তার কৃত্রিম পায়ে হেঁটে যেতে খুব কষ্ট হতো। কিন্তু র‌্যাবের ভয়ে কোনো বাড়িওয়ালাই কলেজের পাশে তাকে বাড়ি ভাড়া নিতে দেয় না। লিমন আমাকে তার পরীক্ষার দিনগুলোতেও ফোন করে। আমি ওকে আশ্বাস দিই যে ওকে নিয়ে আর একটি লেখা অন্তত আমি পত্রিকায় লিখব। লেখা হয়ে ওঠে না। আজ সকালেও সে ফোন করেছিল। জানাল কিছুদিন হয় কলেজের পাশে একটি বাড়ি সে ভাড়া পেয়েছে। থাকা-খাওয়া মিলিয়ে মাস খরচের তিন হাজার টাকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার দুই সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী দেন। নিজের বাসায় তাকে নদীতে গিয়ে স্নান করতে হয়, যা সত্যিই তার জন্য কষ্টকর। এই বাসায় বাড়ির সঙ্গেই স্নানঘর রয়েছে। তার বিএ পাস বোনের বিয়ে হলেও ভাই এখনো চাকরি পায়নি। বাবা ঢাকায় একটি দোকানে কাজ করছেন যথারীতি।
একা লিমনই তো শুধু নয়। অন্য মানুষের সঙ্গে ভুল করে যাদের হত্যা করে র‌্যাব নিজেই স্বীকার করেছে অথচ সেই নির্মম ‘ভুলে’র কোনো দায়িত্ব নেয়নি, ২০০৯ সালে নিহত সেই দুই ভাই লুৎফর ও খায়রুল খালাসি, রাসেল আহমেদ ভুট্টো, ২০১০-এ ‘ভুলক্রমে’ নিহত মহিউদ্দিন আরিফ, কায়সার আহমেদ বাপ্পী বা গত বছর এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের যে কর্মীকে মানবাধিকার বিষয়ক তথ্যাদি নথিবদ্ধ করার অপরাধে র‌্যাব অপহরণ করে, হাত-পা বেঁধে নগ্ন করেছিল এবং বেত্রাঘাত করেছিল—এই তাবৎ হত্যা ও অমানবিকতার শেষ কোথায়? কাফকার উপন্যাসের নায়কের মতোই বিনা বিচারে নির্দোষ মানুষের ‘কুকুরের মতো’ নিহত ও পঙ্গু হওয়াই কি আমাদের অনিবার্য নিয়তি? আমরা তরুণ প্রজন্ম কি পারি না যে যেখানে আছি, আমাদের সীমিত সাধ্য নিয়েই রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে? রাজপথ থেকে সোস্যাল নেটওয়ার্কিং...লড়াইয়ের সব হাতিয়ারকে শাণিত করে লিমনদের জন্য কিছু করতে?
 অদিতি ফাল্গুনী: লেখক ও উন্নয়নকর্মী।

No comments

Powered by Blogger.