পোলিও সচেতনতার প্রয়োজন এখনো ফুরায়নি by ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

বিশ শতকের সত্তরের দশকে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়তাম, তখন ভূগোল বিভাগে ছিল আমার এক প্রিয় বন্ধু। তার নাম খন্দকার মাহবুব ইলাহী রঞ্জু। রঞ্জুর বাড়ি উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে। ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে হলেও তার সঙ্গে আমার সখ্যের একটি বিশেষ কারণ ছিল।


ছাত্রজীবনে রঞ্জু ছিল খুবই সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা। সে কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, ক্রমান্বয়ে গল্প বলা ও বিতর্কে ছিল রীতিমতো তুখোড়। তার সঙ্গে বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় আমি অনেক লড়েছি। কখনো হেরেছি, আবার কখনো জিতেছিও। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বিটিভির উদ্যোগে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় একবার রঞ্জুর সঙ্গে একই দলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নিয়েছি। আজও মনে পড়ে, ওই রকম একটিতে আমরা জিতেছিলামও। কিন্তু কার বিরুদ্ধে তা আজ আর মনে করতে পারছি না। রঞ্জুর একটা শারীরিক দুর্বলতা ছিল। ছোটবেলা পোলিওতে তার একটি হাত (নিশ্চিত নই তবে আমার যত দূর মনে পড়ে ডান হাত) অবশ হয়ে গিয়েছিল। সেটা আর কোনো দিন সারেনি। এক হাতেই ছিল তার দুই হাতের শক্তি। আর মন-মগজের তেজ ছিল আর দশজন থেকে নিঃসন্ধেহে বেশি।
আমাদের সময়ে আরেকটি মেয়ে পড়ত জাহাঙ্গীরনগরে, যার একটি পায়ে ছিল সমস্যা। কারণ জানি না। হয়তো পোলিও বা অন্য কিছু। মেয়েটির নাম বুলবুল। শুনেছি, পাস করার পর চাকরিজীবনে রঞ্জু ও বুলবুল স্বামী-স্ত্রী। জাহাঙ্গীরনগর ছাড়ার পর আর ওদের দেখা পাইনি, যোগাযোগেরও সুযোগ হয়নি। জানি না ওরা দুজন কোথায় আছে, কেমন আছে। আশা করি, ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে সংসার করছে। যেহেতু লেখার নিচে আমার ই-মেইল ঠিকানা আছে, কে জানে, এই সুবাদে ওদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়েও যেতে পারে।
আমার স্ত্রীর দিক থেকে দূরসম্পর্কের আরেক আত্মীয়, যার মেয়েকে আমি আশির দশকে দেখেছি কানাডায়। মেয়েটি ছিল খুব চটপটে, ফুটফুটে ও টগবগে। নাম মৌলি। তখন মৌলির বয়স মাত্র পাঁচ কি ছয় বছর। তারও একটি হাত নষ্ট হয়ে গিয়েছিল পোলিওতে। এ পর্যন্ত পোলিও সম্পর্কে এটুকুই ছিল আমার অভিজ্ঞতা।
মাত্র সেদিন আমার প্রবাসজীবনে আমেরিকার টেনেসি অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ন্যাসভিলে হলো পোলিও নিয়ে আরেক অভিজ্ঞতা। দিনটি ছিল ২০১২ সালের ২৯ মে। মেমোরিয়াল ডে লংউইকএন্ডের শেষে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। আমি স্ত্রীকে নিয়ে গেছি আমাদের স্থানীয় ব্যাংকে কিছু কাজে। স্ত্রী তার লকবঙ্ েগিয়ে গয়নাগাঁটি খুঁজছে, গোছাচ্ছে আর আমি ব্যাংকের লবিতে ওয়েটিং এরিয়ায় বসে কফি খাচ্ছি এবং লোকজনের আনাগোনা দেখছি। তিন দিন ছুটির পর ব্যাংক খুলেছে, স্বাভাবিকভাবেই কাস্টমারের ভিড়। লোকজন আসছে, বিভিন্ন কাজে ব্যাংকের বিভিন্ন সেকশনে যাচ্ছে, কাজ সেরে দ্রুত সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। অকারণে কেউ ব্যাংকে বসে থাকে না। বিশেষ করে দুপুরবেলা এ দেশের টাকার ঘরে ডাকাত পড়ার আশঙ্কা অন্য সময়ের তুলনায় একটু বেশি বৈকি। স্ত্রীর লকবঙ্ এবং আরো একটি কাজের জন্য আমাকে ব্যাংকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় ৪৫ মিনিট। প্রথম ১৫ মিনিট এবং শেষ ১৫ মিনিটে অস্বাভাবিক কিছু আমার নজরে পড়েনি। কিন্তু মাঝের ১৫ মিনিটে আমি যা দেখলাম, তাতে রঞ্জু, বুলবুল আর মৌলির কথা নতুন করে মনে পড়ল।
ওই ১৫ মিনিটে যে পাঁচ-ছয়জন কাস্টমার ব্যাংকে ঢুকলেন, তাঁদের মধ্যে আমি দুজনকে যেমন দেখলাম, তাতে মনে হলো, উভয়েই পোলিও রোগী। অবশ পা টেনে টেনে কষ্ট করে হাঁটছেন। প্রথমজন মাঝবয়সী শ্বেতাঙ্গ নারী। পরের জন বেশ বয়স্ক পুরুষ, তিনিও সাদা। মনে মনে ভাবলাম, আজ পোলিওর দাপট কমেছে বটে, কিন্তু শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে অজস্র মানুষকে রেখে গেছে এভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী পোলিওমুক্তি আন্দোলন শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। ১৯৯৪ সালে আমেরিকাকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৮ সালে পৃথিবীতে পোলিও রোগীর সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখ। সেটা ২০০১ সালে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৪৮৩-তে। বর্তমানে দুনিয়াজোড়া বছরে মাত্র এক হাজারের মতো পোলিও কেস ধরা পড়ে। ২০০০ সালে চীন, অস্ট্রেলিয়াসহ ৩৬টি পশ্চিমা দেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমের বেশির ভাগ দেশে এখন পোলিও নেই বললেই চলে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও নাইজেরিয়ায় এখনো আছে। বাংলাদেশের পোলিও প্রসঙ্গে ফিরে আসব নিবন্ধের শেষ দিকে।
খ্রিস্টের জন্মের ১৪০০ বছর আগে প্রাচীন মিসরের মৃৎশিল্পে পোলিও রোগীর ছবি দেখতে পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায়, এই রোগের সঙ্গে মানুষের পরিচয় অনেক পুরনো। পোলিওর প্রথম ক্লিনিক্যাল বিবরণ দিয়েছেন ১৭৮৯ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক মাইকেল আন্ডারউড। পরে জ্যাকব হাইনের ১৮৪০ এবং কার্ল মেডিনের ১৮৯০ সালের গবেষণার ফলে এ রোগকে বলা হতো হাইন-মেডিন রোগ। এরপর এর নাম বদলে রাখা হয় ইনফেন্টাইল প্যারালাইসিস। বিশ শতকের আগে শিশুদের ছয় মাস বয়সের আগে কদাচিৎ এ রোগ দেখা যেত। কারণ তখনকার খারাপ জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার জন্য বাচ্চারা এ রোগের ভাইরাসের সংস্পর্শে বেশি আসত। এ জন্য তাদের শরীরে স্বাভাবিকভাবে পোলিওর শক্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়ে যেত। ফলে ভাইরাস তাদের সহজে কাবু করতে পারত না। কিন্তু বিশ শতকে বিশ্বজুড়ে যখন পাবলিক হেলথ ও স্যানিটেশনের উন্নতি হলো, তখন শিশুদের মধ্যে এ রোগের ইমিউনিটি কমে গেল এবং রোগের আক্রমণ বেড়ে যেতে লাগল। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বিভিন্ন সময়ে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে এ রোগ মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। ১৯৫২ সালে আমেরিকায় দেখা দিয়েছিল পোলিওর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব। এতে আক্রান্ত হয়েছিল ৫৮ হাজার লোক, মারা গিয়েছিল তিন হাজারের বেশি এবং অঙ্গহানি হয়েছিল ২১ হাজারের ওপর। তাঁদের অনেকে এখনো বেঁচে আছেন। সেদিন হয়তো এঁদেরই দুজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ন্যাসভিলের ব্যাংকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনযায়ী, ওই সব মহামারির জের হিসেবে বর্তমানে সারা পৃথিবীতে এক থেকে দুই কোটি বিকলাঙ্গ পোলিও রোগী বেঁচে আছে। পোলিওতে যত রোগী মারা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের হয় অঙ্গহানি। ১৯৫০ সালের আগ পর্যন্ত এ রোগ সম্পর্কে সারা দুনিয়ায় প্রচার ও জানাজানি খুব কম ছিল। ফলে বলতে গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কোনো সচেতনতাই ছিল না।
পোলিও একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে ভাইরাল ইনফেকশনজাতীয় রোগ। এটা রোগীর মুখের লালা, পানি বা খাবারের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ বছর অথবা তার চেয়ে ছোট শিশুদের পোলিও ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ রোগের উপসর্গ হলো জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, বমি, স্টিফনেক, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ব্যথা-বেদনা ইত্যাদি। প্রতি ২০০ জন পোলিও রোগীর মধ্যে একজনের অঙ্গহানি হতে পারে। যাদের অঙ্গহানি হয়, তাদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারাও যেতে পারে।
১৯৫০ সালের গোড়ার দিকে প্রথম ভাইরোলজিস্ট হিলারি কোপরোওস্কি পোলিওর টিকা আবিষ্কার করেন।
১৯৫২ সালে এর উন্নত সংস্করণ বের করেন আমেরিকার পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোনাস সলক, যার সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯৫৫ সালের ১২ এপ্রিল। তারও কিছুদিন পর অ্যালবার্ট সেবিন আবিষ্কার করেন মুখে খাওয়ার পোলিও টিকা। বর্তমানে সব জায়গায় এটাই বেশি ব্যবহৃত হয়। পোলিওর কোনো কিউর নেই। তবে প্রতিষেধক টিকা খেয়ে এ রোগ ঠেকানো যায়। পোলিও টিকা মোটামুটি ঝুঁকিমুক্তই বলা যায়। কারণ প্রতি ২৪ লাখে একজনের মধ্যে পার্শ্বক্রিয়ায় প্যারালাইসিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। টিকা খাওয়ালেই যে আর কোনো দিন পোলিও হবে না তার শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। তাই জেনে রাখা দরকার পোলিও হলে কী করতে হয়। পোলিওতে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে অনেক সময় দুর্বল মাংসপেশিকে আক্রমণ থেকে বাঁচানো যায়। এর সঙ্গে রোগীকে করতে হয় জুতসই ব্যায়াম আর খেতে হয় পুষ্টিকর খাবার। কোনো কোনো রোগীর বেলা ফিজিক্যাল থেরাপি, মাসল থেরাপি, অর্থোপেডিক সার্জারি ইত্যাদিরও প্রয়োজন হতে পারে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পোলিওমুক্তি আন্দোলন চলছে অনেক দিন ধরে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে পোলিও কেস ধরা পড়ে মাত্র ২৯টি। ২০০০ সাল বাংলাদেশ, বিশেষ করে রঞ্জু, বুলবুল ও মৌলির জন্য একটি বিশেষ বছর। কারণ এ বছর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পোলিওমুক্তি লাভ করে। কিন্তু বাংলাদেশের এ অর্জন নিরঙ্কুশ হয়নি, কারণ প্রতিবেশী দেশ দুটিতে পোলিও সমস্যা রয়ে গিয়েছিল। তাই ২০০৬ সালে বাংলাদেশে আবার পোলিও ফিরে আসে। সে বছর ধরা পড়ে ১৮টি কেস। তার পরের পরিসংখ্যান আমি পাইনি। তবে ২০১২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় পোলিও এখনো রয়ে গেছে। বাংলাদেশ যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায়, তাই এ ব্যাপারে বাঙালির আত্মতৃপ্তির কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে পোলিও খেদানোর জন্য সব সময় দুই পায়ে খাড়া থাকতে হবে। রঞ্জু, বুলবুল আর মৌলির কথা যত দিন মনে থাকবে, তত দিন পোলিওর ব্যাপারে আমাদের অবহেলা ও গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই।
লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি
এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ
Awahid2569@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.