ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-অগ্রসর প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতে হবে

অগ্রসর ও অধিকতর কার্যক্ষম হলেও নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতে অনেকেই দ্বিধান্বিত থাকেন। আর নতুন কোনো উদ্যোগের সঙ্গে যদি রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা থাকে তবে তো কথাই নেই। যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবকাশ না করে আগেভাগেই কোনো না কোনো পক্ষ অনাস্থা জানিয়ে রাখে।
রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ ও সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে নতুন উদ্যোগের পেছনে ষড়যন্ত্রের গন্ধটাই সর্বাগ্রে নাকে এসে লাগে। তাই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যে নির্বাচন কমিশনের তরফে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম চালুর প্রস্তাব পত্রপাঠ নাকচ করে দিল তাতে অনেকেই বিস্মিত হবেন না। যদিও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণের যুগে পৃথিবীর উন্নত, অনুন্নত বহু দেশে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন যন্ত্র অনেক বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এটি বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অতি অল্প সময়ে ভোট গণনা করে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং পদ্ধতি রীতিমতো বিস্ময়কর কাজ করেছে। জানা গেছে, পাকিস্তানেও ইভিএম পদ্ধতি শুরু হতে যাচ্ছে। যে ব্যবস্থাটি বিশ্বের বহু দেশে আস্থা পাচ্ছে সে ব্যবস্থাটি আমাদের দেশে চালু করতে গিয়ে কেন হোঁচট খেতে হচ্ছে, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠবে। এ প্রশ্নে উত্তর মেলা জরুরি আবার একই সঙ্গে নতুন উদ্যোগগুলো নিয়ে সমাজে খোলামেলা আলাপ-আলোচনাও হওয়া দরকার। নির্বাচন কমিশন গত শনিবার গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইভিএম নিয়ে আলোচনা করেছে। আমরা মনে করি, আলোচনার এমন উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এমন আলোচনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও হতে হবে। বিশেষত প্রধান বিরোধী দলকে আলোচনায় আসতে হবে। সন্দেহ, সংশয়ে দোদুল্যমান না থেকে খোলামনে নতুন প্রযুক্তিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ নিয়ে কথা বলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করে বিএনপিকে আলোচনার টেবিলে বসাতে হবে। শুধু ইভিএমের ক্ষেত্রেই নয়_ অন্য সকল নির্বাচনী বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজের সকল পক্ষই আজ স্বীকার করেন, একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন দলগুলোর বিবাদ-বিশৃঙ্খলার মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু এ জন্য কমিশনকে স্বাধীন হতে হবে। সরকারকে যেমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, তেমনি কমিশনকেও স্বাধীন উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি দল, বিরোধী দল সকলকে নিয়ে কাজ করতে হবে। কমিশনকে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইভিএম ব্যবস্থা সহজ, নির্ভুল ও দ্রুতগতির ভোটিং ব্যবস্থা, গণনার ক্ষেত্রেও এটি বিদ্যুৎগতির। ভোটের ফল বিপর্যয়, ম্যানিপুলেশন, গণনায় দেরি ঠেকাতে এর বিকল্প নেই। তবে এটি সত্য যে, সারাদেশে ইভিএম পদ্ধতি একযোগে চালু করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এর জন্য নির্বাচন কমিশনের কর্মীদের যেমন যথাযথ প্রশিক্ষণ দরকার, তেমনি দরকার ভোটারদের প্রশিক্ষণও। সমাজের নানা স্তরের মানুষের পরামর্শ নিয়ে ইভিএম পদ্ধতির সমস্যা ও ত্রুটিগুলোও আমলে আনতে হবে। সারাদেশে একযোগে চালু করা না গেলেও সামনের নির্বাচনগুলোতে শহরাঞ্চলগুলোতে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চট্টগ্রামে ইভিএম সীমিত আকারে ব্যবহার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে এটি বিস্তৃত হতে পারে। তবে এ পদ্ধতি চালুর আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই আস্থায় আনতে হবে। সবার অংশগ্রহণে, পরামর্শে একটি নতুন ও উন্নত প্রযুক্তি চালু হলে সেটি হবে সবচেয়ে খুশির খবর।
 

No comments

Powered by Blogger.