মানসিক রোগী মানেই 'পাগল' নয় by ডা. মুনতাসীর মারুফ

কই শব্দের বহু ব্যবহারের সঙ্গে আমরা পরিচিত। স্থান-কাল-পাত্রভেদে একটি নির্দিষ্ট শব্দের অর্থ যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়, তার প্রচুর উদাহরণ আমরা জানি। তেমনি একটি সুপরিচিত শব্দ 'পাগল'। বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের পরিমার্জিত সংস্করণ অনুসারে, 'পাগল' শব্দটির কয়েক ধরনের অর্থ হয়। 'পাগল ছেলে, যা বায়না ধরবে, তা নেবেই'_এই বাক্যে 'পাগল' বলতে বোঝানো হচ্ছে ছেলেটি 'অবোধ'। 'রবীন্দ্রসংগীত শুনতে একেবারে পাগল'_এখানে


'পাগল'-এর অর্থ বিমুগ্ধ, বিমোহিত। 'কি দিয়া সুন্দরী মোরে করিল পাগর (পাগর=কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কর্তৃক ব্যবহৃত পাগলের বিকল্প শব্দ)'_এখানে পাগর বা পাগল-এর মানে মত্ত বা মাতাল। উপরোক্ত উদাহরণগুলোতে ব্যবহৃত 'পাগল' শব্দের কোনো অর্থই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোনোভাবে 'অসুস্থ' বলে চিহ্নিত করে না। বরং ব্যক্তির কোনো বৈশিষ্ট্যকে উপস্থাপন করে; যা কখনো রসিকতা, কখনো স্নেহ, কখনো ভালোবাসায় বিশেষায়িত। পাগলের আরেক ধরনের অর্থ অভিধানে রয়েছে যা হচ্ছে_বাতুল, উন্মাদ, বিকৃতমস্তিষ্ক ও খ্যাপা। এই অর্থটি এক ধরনের অসুস্থতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বহুল ব্যবহৃতও। সাধারণ্যে বা বেশির ভাগের মধ্যে অসুস্থ বোঝাতে 'পাগল' শব্দের ব্যবহারে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে তা হচ্ছে_ওই 'পাগল' ব্যক্তিটি উলঙ্গ অবস্থায় অথবা ময়লা, জীর্ণ, শতচ্ছিন্ন কাপড় গায়ে, রুক্ষ জট পাকানো চুলে, পুরুষ হলে মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল নিয়ে, রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়; ডাস্টবিন ঘেঁটে খাবার কুড়োয়; অশ্রাব্য গালাগাল বা অশ্লীল বাক্যের তুবড়ি ছোটায়; যখন-তখন যে কারো দিকে তেড়ে যায়_আক্রমণ করে বসে, ভাংচুর করে ইত্যাদি। দুঃখজনক ব্যাপারটি হচ্ছে, 'মানসিকভাবে অসুস্থ' বা 'মানসিক রোগী' বলতেও অনেকের চোখে রোগী বা অসুস্থ ব্যক্তি_কেবল এ ধরনের চিত্রই ফুটে ওঠে, আদতে যা পুরোপুরিই অজ্ঞতাপ্রসূত।
তাহলে মানসিক রোগ কী? মানসিক অসুস্থতা বলতে কী বোঝায়? সহজ কথায়_মানসিক অসুস্থতা হচ্ছে মনের রোগ। শরীরের যেমন রোগ হয়, রোগ হয় মনেরও। শরীরের যেমন অনেক অংশ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ; মনও তেমনি অনেক বিষয়ের সমষ্টি। শরীরকে যেমন ভাগ করা যায় মাথা, হাত, পা, চোখ, পেট, বুক, শরীরের ভেতরের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, যকৃত, পাকস্থলী_এমনি নানা অংশে; তেমনি মনও অনুভূতি, আবেগ, বোধ, চিন্তা, স্মৃতি_এমনই নানা উপাদানে গঠিত। শরীরের একেক অংশের রোগ, এর উপসর্গ-লক্ষণ যেমন একেক রকম, তেমনি মনেরও নানা উপাদানের অসুস্থতাজনিত বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন। রোগীর জন্য নিউরোসিস-জাতীয় রোগের উপসর্গও কম কষ্টদায়ক নয়। নিউরোসিস-জাতীয় রোগে আবেগের প্রকাশ বা মাত্রা স্বাভাবিকতা অতিক্রম করে যায়। যেমন_মন খারাপ, উদ্বেগ, ভয়_এগুলো মানুষের স্বাভাবিক আবেগীয় প্রকাশ। দুঃখ বা ব্যর্থতায় যে কারো মন খারাপ হতে পারে, যেকোনো দুঃসংবাদ বা বিপদাশঙ্কায় উদ্বেগও স্বাভাবিক, কুকুর, উচ্চতা বা অন্ধকারে কিছুটা ভয়ও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এসব আবেগ স্বাভাবিক মাত্রা ও সময়কে অতিক্রম করে যখন ব্যক্তির জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষা বা পেশাগত জীবনকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাধাগ্রস্ত করে; তখনই কেবল তা রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়। আবার অনেক সময় মানসিক চাপের প্রকাশ ঘটে শারীরিক কোনো উপসর্গে_এসব ক্ষেত্রে উপসর্গ শারীরিক হলেও এর পেছনে শারীরিক কোনো রোগের প্রমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পাওয়া যায় না। নিউরোসিস রোগীর ক্ষেত্রে রোগী সাধারণত বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারায় না এবং তার ব্যক্তিত্বেরও উল্লেখযোগ্য কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটে না। বিষণ্নতা (ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার), উদ্বেগাধিক্য (অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার), অহেতুক ভীতি (ফোবিক ডিসঅর্ডার), শুচিবায়ু (অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার) প্রভৃতি নিউরোসিসের উদাহরণ। অন্যদিকে 'সাইকোসিস'-এর রোগীদের আচার-আচরণ, ব্যবহার বা কথাবার্তা, ব্যক্তিত্ব এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। বাস্তবের সঙ্গে তাদের সংযোগ থাকে না। অনেকের মধ্যে অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন কিন্তু দৃঢ় সন্দেহ দেখা দেয়। অনেকে গায়েবি আওয়াজ শোনেন বা গায়েবি কিছু দেখেন। তাঁরা সাধারণত নিজেরা বুঝতে পারেন না যে তাঁরা রোগাক্রান্ত। আশপাশের লোকজন সহজেই তাঁদের ভেতর এই পরিবর্তনটি ধরতে পারেন। সিজোফ্রেনিয়া, ম্যানিয়া বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার_এগুলো সাইকোসিসের উদাহরণ। এ ছাড়া মাদকাসক্তি, মানসিক প্রতিবন্ধী, ব্যক্তিত্ব বৈকল্যসহ আরো অনেক ধরনের মানসিক রোগ রয়েছে। দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরের জনসংখ্যার ১৬.১ শতাংশ মানুষ মৃদু থেকে গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছে। আরো উল্লেখ করার মতো ব্যাপারটি হচ্ছে, এর মধ্যে ১.১ শতাংশ সাইকোসিসে আক্রান্ত। যে সাইকোসিসের একটি ক্ষুদ্র অংশের উপসর্গের সঙ্গে মিল রয়েছে তথাকথিত 'পাগল'দের। বাকি ১৫ শতাংশ রোগীর মধ্যে মাদকাসক্তি ও অন্যান্য কিছু রোগ বাদে প্রায় সবই নিউরোসিস, যাঁরা তাঁদের যে সমস্যা বা কষ্ট হচ্ছে, তা নিজেরাই বুঝতে পারেন। কিন্তু এই বুঝতে পারা সত্ত্বেও তাঁরা চিকিৎসা নিতে যান না। শারীরিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য পরিবার বা সমাজে যতটা আন্তরিকতা দেখা যায়, 'পাগল'দের জন্য তা মোটেও দেখা যায় না। বরং মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারকে করুণার চোখে, হেয় করে দেখার প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। এ জন্য 'পাগল' অ্যাখ্যায় সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত অনেক ব্যক্তিই চিকিৎসকের কাছে যান না, পরিবারও তাঁকে চিকিৎসা না করিয়ে ব্যাপারটি গোপন রাখতেই উৎসাহিত হন, যদিও মানসিক রোগের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা রয়েছে।
এ ছাড়াও মানসিক রোগীদের একাংশ বিশেষত সাইকোসিসের উপসর্গ-লক্ষণগুলোকে জিনের আসর, পরীর আসর, জাদুটোনা, বাতাস লাগা, বাণ মারা, পাপের ফল ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করে পীর-ফকির, ওঝা-কবিরাজি, ঝাড়-ফুঁক-তাবিজ, তেল-পানি পড়ার মতো অপ্রয়োজনীয় অপচিকিৎসা থেকে শুরু করে রোগীকে চিকিৎসার নামে নানা বর্বর উপায়ে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে অহরহ।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগেও নিমেষেই সব তথ্য হাতে পাওয়ার অপার সুযোগের এই সময়েও মানসিক রোগ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার এই চলমান ধারা খুবই দুঃখজনক। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১০ অক্টোবর সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয় 'বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস'। মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে সামনে রেখে সবার মধ্যে মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা জাগ্রত হোক, সব নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, কুসংস্কার ও জড়তা কাটিয়ে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুচিকিৎসা লাভে সচেষ্ট হোন_প্রত্যাশা এটাই।

লেখক : সহকারী রেজিস্ট্রার, মানসিক রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল,marufdmc@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.