শেকড়ের ডাক-ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়তে পারছে না রেলওয়ে by ফরহাদ মাহমুদ

বাংলাদেশ রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসছিল। বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া, খাদ্যগুদাম ও শিল্প-কারখানাগুলোর সঙ্গে থাকা রেল সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া, অলাভজনক আখ্যায়িত করে অনেক স্থান থেকে রেললাইন তুলে ফেলা, লিজ দেওয়ার নামে রেলওয়ের জমি লুটপাট করা, রেললাইনের সংস্কার না করা, দক্ষ ও প্রয়োজনীয় লোকবল কমিয়ে অদক্ষ ও দলীয় নিয়োগের মাধ্যমে মাথাভারী প্রশাসন তৈরি করা, কারখানাগুলো প্রায়


অকেজো করে রাখা, ট্রেনের বেশির ভাগ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লেও নতুন ইঞ্জিন না কেনা_এমন অনেক ষড়যন্ত্রই চলেছে প্রায় তিন দশক ধরে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। একসময়ের লাভজনক রেলওয়ে খাত ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এসে লোকসান দিয়েছিল ৫১৬ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল রেলওয়ে খাতকে আবার শক্তিশালী করার। সেই লক্ষ্যে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবেও এ ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রেলওয়ের জনবল-কাঠামো পুনর্গঠিত করতে না পারায় সেই উদ্যোগও বাস্তবে মুখথুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন খবর থেকে জানা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত রেলওয়ের উন্নয়নে ৩১টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০০৯ সালেই। কিন্তু ২১টি প্রকল্পের কোনো কাজ এখনো শুরুই হয়নি। বাকিগুলোর অগ্রগতিও খুব একটা ভালো নয়। তবে এর মধ্যে সামান্য হলেও রেলওয়ের জন্য যে কয়টি ভালো কাজ হয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে এ পর্যন্ত চারটি নতুন রেল ইঞ্জিন আনা হয়েছে, চারটি শিগগিরই এসে পেঁৗছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আরো কিছু ইঞ্জিন আনার প্রক্রিয়া চলছে। দেশের বিদ্যমান কারখানাগুলো আবার সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। মাঝখানে বগি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলেও এখন আবার বগি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান ছয়টি কারখানার যে ক্ষমতা রয়েছে, তার সিকিভাগও ব্যবহার করা হচ্ছে না।
১৮৭০ সালে ব্রিটিশরা যখন সৈয়দপুরে রেলওয়ে ওয়ার্কশপটি তৈরি করেছিল, তখন এখানে রেলগাড়ির ইঞ্জিনও তৈরি হতো। তদানীন্তন পাকিস্তান আমলেও এখানে রেলগাড়ির বগি তৈরি হয়েছে। ১৯৬৭-৬৮ অর্থবছরে এখানে ২৬৪টি বগি নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে বিদেশ থেকে একটি বগি আমদানিতে খরচ হয় প্রায় চার কোটি টাকা। অথচ রেলওয়ের সূত্র মতে, এখানে একটি বগি তৈরিতে খরচ পড়বে এক কোটি টাকারও কম। পাশাপাশি এখানে বগি তৈরি হলে দেশের বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো। তার পরও রহস্যজনক কারণে দীর্ঘদিন এখানে কোনো বগি তৈরি হয়নি। দুর্জনরা বলে, তাতে কমিশন-বাণিজ্য নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ চিত্র শুধু সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার নয়, পার্বতীপুর, পাহাড়তলী কিংবা ছয়টি রেল কারখানার সবগুলোরই। এমনকি ছাতকের স্লিপার ফ্যাক্টরিতেও উপযুক্ত পরিমাণে স্লিপার বানানো হচ্ছে না। কারখানাটির প্রতিদিন এক হাজার ৬০০ স্লিপার তৈরির ক্ষমতা আছে। অথচ মাসে চার-পাঁচ হাজারের বেশি স্লিপার সেখানে তৈরি হয় না।
রেলওয়ে অপেক্ষাকৃত পরিবেশবান্ধব হওয়ায় সারা দুনিয়ায় ট্রেন আবার প্রধান পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ ছাড়া সড়কপথের চেয়ে রেলপথে যাত্রী বা মালামাল পরিবহনের খরচও অনেক কম। এক হিসাবে দেখা যায়, রেলের চেয়ে সড়কপথে যাত্রীপ্রতি জ্বালানি খরচ ৩ দশমিক ৫ গুণ বেশি এবং একই পরিমাণ মালামাল পরিবহনে সড়কপথের খরচ ৮ দশমিক ৭ গুণ বেশি। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সাইলো বা খাদ্যগুদামের সঙ্গে যে রেলপথ ছিল, সেগুলো কেন তুলে ফেলা হলো? সরকারগুলোর জবাবদিহি না থাকায় জনগণ কোনো দিনই তা জানতে পারবে না। তবে আন্দাজ করাটা খুব কঠিন নয়। এখন সাইলোগুলো থেকে ট্রাকে মালামাল পরিবহন করা হয়। আর তা থেকে অনেকেই লাভবান হয়। বিদেশিরা অনেক বেশি গাড়ি বিক্রি করতে পারছে এ দেশে।
ক্ষুদ্র একটি পরিসংখ্যান থেকে রেলওয়ের উত্থান-পতনের একটি চিত্র পাওয়া যাবে। ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরে যেখানে রেলপথ ছিল দুই হাজার ৮৫৮ দশমিক ২৩ কিলোমিটার, সেখানে ২০০০-০১ অর্থবছরে রেলপথের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭৬৮ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার। সংস্কারের অভাবে তারও অনেকটাই এখন প্রায় পরিত্যক্ত। ১৯৬৯-৭০ সালে ছিল ৪৮৬টি লোকোমোটিভ ইঞ্জিন, ২০০০-০১ সালে ছিল ২৭৭টি। সেগুলোরও বেশির ভাগই অনেক আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে সেগুলোই চালানো হচ্ছিল। সাধারণত ইঞ্জিনের ইকোনমিক লাইফ বা সাশ্রয়ী আয়ু ধরা হয় ২০ বছর, কিন্তু বর্তমানে ১৫৫টি ইঞ্জিনেরই বয়স ৩৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে এমন ইঞ্জিনের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। একইভাবে কমেছে বগির সংখ্যাও। কমেছে রেলকর্মী ও স্টেশনের সংখ্যা। ১৯৬৯-৭০ সালে রেলে কর্মকর্তা ছিল ২১০ জন এবং কর্মচারী ছিল ৫৫ হাজার ২০৩ জন। ২০০০-০১ সালে কর্মকর্তা বেড়ে হয়েছে ৫০৪ জন, কিন্তু কর্মচারীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৯। বর্তমানে সে সংখ্যা আরো কমেছে। স্টেশনগুলোর মধ্যে ইন্টারলকিং ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানাটি যথেষ্ট আধুনিক একটি কারখানা। বলা যায়, এই কারখানাটির বদৌলতেই এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনগুলো কোনো রকমে চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। এখানে যে ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা রয়েছে, তাতে কেবল যন্ত্রাংশ আমদানি করে এখানে নতুন ইঞ্জিন সংযোজন করাও সম্ভব। তাতে খরচও অনেক কম পড়ত। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো সরকারই সে উদ্যোগ নেয়নি, কিংবা ইঞ্জিন সংযোজনের জন্য বাজেট বরাদ্দও দেয়নি। স্বাধীনতার পরও পরিবহন খাতে যেখানে সড়ক ও রেলপথে বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় সমান সমান, সেখানে ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রেলের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১২ শতাংশ এবং সড়ক খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৮ শতাংশ। তদুপরি ১৯৮২ সালে রেলওয়ে বোর্ডকে বিলুপ্ত করে দিয়ে মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিভাগের কাছে রেলওয়ে-সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা হয়। জানা যায়, রেলওয়ের মহাপরিচালককে সামান্য কাজেও একজন সহকারী সচিবের কাছে ধরনা দিতে হয়। যে কারণে যেকোনো কাজই দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকা পড়ে যায়। রেলপথের উন্নয়নে আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি। এরা ঋণ দেওয়ার আগেই নানা রকম শর্ত জুড়ে দেয়। তাদের পরামর্শে এ পর্যন্ত তিনবার রেলওয়েতে সংস্কার হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বরাবরই তাদের পরামর্শের ফল রেলওয়ের জন্য লাভজনক না হয়ে ক্ষতিকর হয়েছে। তাদেরই পরামর্শে অলাভজনক দেখিয়ে অনেক এলাকার রেললাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
গত ঈদের সময় সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ যখন প্রায় ভেঙে পড়েছিল, তখন যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল ট্রেনের ওপর। আগের রাতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কিনতে দেখা গেছে অনেককে। আবার প্রায় পঙ্গু বাংলাদেশ রেলওয়েও তাদের সাধ্যমতো যাত্রীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ যখন ভালো ছিল, তখন এসব যাত্রীর অনেকেই রেলস্টেশনে যাননি। কেন? দোষটা যাত্রীরও নয়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষেরও নয়। দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের কারণেই যাত্রী পরিবহনে রেলওয়ে তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ ট্রেনে একই গন্তব্যে যেতে সময় অনেক বেশি লাগে এবং যাত্রার অনিশ্চয়তা থাকে। পুরনো ইঞ্জিন প্রায়ই রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে। রেললাইন সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় ধীরগতিতে গাড়ি চালাতে হয়। তার পরও প্রায় প্রতিবছরই ট্রেন লাইনচ্যুতি ও দুর্ঘটনা অন্তত হাজারখানেক। গত বুধবারও নরসিংদীর ঘোড়াশালে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেটের মধ্যে ট্রেন চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। কেবল ২০০৯ সালেই লাইনচ্যুতি ও দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯৯৭টি। সংকেতব্যবস্থা এবং মধ্যবর্তী বহু স্টেশন বন্ধ থাকায় গাড়ির ক্রসিংয়ে সময় বেশি লাগে। সর্বোপরি বরাদ্দের অপ্রতুলতার কারণে সময়মতো কোচ বা ওয়াগনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নবায়ন করা যায় না। ফলে যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধাও দিন দিনই হ্রাস পাচ্ছে। এসব কারণে যাত্রীরা রেলপথে চলাচলের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল।
টঙ্গী থেকে ভৈরব পর্যন্ত দুই লাইন করার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০০৬ সালে। ২০১১ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে খুবই সামান্য। আখাউড়া থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডাবল লাইন করার কাজও চলছে কচ্ছপগতিতে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথটি একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। কেবল সংস্কারের অভাবে এ পথে এখন ট্রেন চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। অথচ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-ভৈরব রেলপথ সংস্কার ও ডাবল লাইন করে প্রতি ঘণ্টায় ট্রেন চালানো হলে প্রচুর লোক ঢাকা ছেড়ে দিত। এসব জায়গা থেকে এসে অফিস করত। এতে ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও যানবাহনের যে চাপ, তাও অনেকটাই কমে যেত। আর গৌরীপুর-মোহনগঞ্জ, গৌরীপুর-জারিয়া-জাঞ্জাইল, সিলেট-ছাতক, চট্টগ্রাম-দোহাজারী, লালমনিরহাট-বুড়িমারী, তিস্তাঘাট-বামনাবাজার, লাকসাম-চাঁদপুর, রাজশাহী-রোহানপুর, আমানুরা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিংবা আরো কিছু রেলপথ আছে, যেগুলোতে ট্রেন চালানোটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এদিকে রেলওয়ের ভূসম্পত্তি নিয়েও চলছে নানা ধরনের তেলেসমাতি। জোট সরকারের আমলে যোগাযোগমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে রেলের জমি লিজ দেওয়া নিয়ে গণমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় হয়েছিল। এর আগেও বিভিন্ন সরকারের সময় এ অপকর্মটি বেশ ভালোভাবেই সম্পাদন করা হয়েছে। এখনো রেলওয়ের দুই হাজার একরের বেশি জমি অপদখলে আছে বলে জানা যায়।
বাংলাদেশে প্রতিবছর কেবল বায়ুদূষণের কারণে ২০ থেকে ২৫ হাজার লোক মারা যায়। রোগাক্রান্ত হয় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এর পরও কি আমরা বাংলাদেশ রেলওয়েকে এমন অকার্যকরই রেখে দেব? যারা আমাদের উপদেশ দেয়, আমাদের কাছে প্রচুর গাড়ি বিক্রি করে_আমরা কি তাদের উপদেশে রেলকে গলা টিপে হত্যা করব? বর্তমান সরকারের আন্তরিকতাকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু উদ্যোগগুলো দ্রুত কার্যকর করার জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা চাই, গণমানুষের এই পরিবহনব্যবস্থাটিতে পুনরায় প্রাণের সঞ্চার হোক।
লেখক : সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.