আলোকের এই ঝরনাধারায় (পর্ব-৪৪)-অসম্পূর্ণ শিক্ষিতদের জয়জয়কার by আলী যাকের

রের দিন সকাল ৭টায় আমি উপাচার্য ভবনে হাজির। ঠিক ৮টায় ড. মতিন চৌধুরী এলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ওসমান গনি_পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোনেম খান এবং পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। এঁদেরই তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন নামে একটি ছাত্রদল ছাত্ররাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়ন করেছিল।


এদের দুই নেতা সরাসরি নানা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে দুর্বৃত্তদের শেষ যেভাবে হয়, এদেরও সেই পরিণতিই হয়েছে। পাকিস্তানবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন সাধারণ মানুষের হাতেই এদের মৃত্যু হয়। সেই সময় আমরা যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম এবং এনএসএফের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম, তারা সাধারণত ভয়ে ভয়ে থাকতাম, কখন কী অঘটন ঘটে! আমিও সেদিন উপাচার্যের দপ্তরের ওয়েটিংরুমে বসে ভাবছি, কি জানি কী হয়? প্রতিটি মুহূর্তকে মনে হচ্ছে একেকটি ঘণ্টা। অবশেষে প্রায় আধঘণ্টা পর ড. মতিন চৌধুরী বেরিয়ে এলেন এবং হাসতে হাসতে আমাকে বললেন, 'যাও, ভালো করে পড়াশোনা করো, পরীক্ষায় ভালো করা চাই।' একধাক্কায় মর্ত্য থেকে স্বর্গে পেঁৗছে গিয়েছিলাম যেন। আবার দ্বিগুণ উৎসাহে পড়াশোনা শুরু করলাম। এবং একে একে অনার্স, সাবসিডিয়ারি আর ফাংশনাল ইংলিশ পরীক্ষা দেওয়া শেষ করলাম। তারপর ফলের অপেক্ষা।
সামগ্রিকভাবে তখনকার তরুণরা আজকের তরুণদের মতো এত চটপটে ছিল না। একটা বিষয় তো ছিলই যে তথ্য আদান-প্রদানের এত বাহন তখন ছিল না। বস্তুত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রায় শেষের দিকে এই ভূখণ্ডে টেলিভিশনের আগমন। তাও আবার প্রতি সন্ধ্যায় অল্প কিছু্ক্ষণের জন্য। অতএব, তথ্যের জন্য আমাদের পত্রপত্রিকার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো। আর ছিল বেতার। দুটি স্টেশন আমাদের পরিচিতদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল_এক. আকাশবাণী কলকাতা আর দুই. বিবিসি। এর বাইরে অনেকেই রেডিও সিলোনের অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় হিন্দি গান শুনত। রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্র খুব একটা শুনতে চাইতাম না। আমার মনে আছে, বেতারে বিনোদনের জন্য আমাদের ভাইবোনদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল আকাশবাণীর 'অনুরোধের আসর'। একবার কোনো একটি পূজায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া 'মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে যার চোখ তাকে আর মনে পড়ে না' গানটি শুনতে চেয়ে আকাশবাণী কলকাতায় আমি একটি চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কোনো এক রবিবার দুপুরে গানটি প্রচারিত হয়েছিল এবং ঘোষক গানটি বাজানোর আগে আমার নাম উল্লেখ করেছিল। এটাই ছিল অনুরোধের আসরের নিয়ম। এদিকে আমি তো আহ্লাদে আটখানা। মা ও দিদিকে দেখেছি এই অনুষ্ঠানটি এবং রেডিও সিলোনের পুরনো হিন্দি গানের অনেক অনুষ্ঠান অভিনিবেশসহকারে শুনতেন। বিবিসি রেডিও নিয়মিত শোনা আমাদের বাড়িতে বাধ্যতামূলক করেছিলেন আমার বাবা। তাঁর প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল আমাদের ভালো ইংরেজি শেখানোর। ইংরেজি শব্দের প্রমিত উচ্চারণ যদি কিছু শিখে থাকি, তা বিবিসির কল্যাণে_এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তখন রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। প্রতি রবিবার কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকাটি বাবা রাখতেন মূলত আমাদের ইংরেজি শেখার উদ্দেশ্যে। এই যে অভ্যাস, যেগুলোতে আমাদের অভিভাবকরা আমাদের অভ্যস্ত করেছিলেন, তা আমাদের স্বশিক্ষিত হতে সাহায্য করেছে_এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করার আগেই নানাভাবে আমাদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি বিনোদনের জন্য আমরা যে চলচ্চিত্রগুলো দেখতাম, তার মানও আজকের সস্তা ছবিগুলোর চেয়ে অনেক উঁচু ছিল। সব সময়ের তরুণদের মতোই নারীদের প্রতি সহজাত দুর্বলতা তখনকার আমাদেরও ছিল। তবে যেহেতু একটি রক্ষণশীল সমাজের মানুষ ছিলাম আমরা, সেখানে আজকের মতো এত দুঃসাহসী হওয়া তখন সম্ভব ছিল না। সেই সময় মেয়েদের আকর্ষণ করার জন্য সাধারণত 'আমরা কত বিদ্বান'_এই বিষয়টি জাহির করার একটা প্রবণতা সবার মধ্যেই দেখা যেত। হয়তো ইউনিভার্সিটি করিডরে আমরা তিন-চার বন্ধু আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় একদল মেয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য আমাদের আলোচ্য বিষয় বদলে যেত। হয়তো একজন বলে উঠল, "সার্ত্রের এগজিস্টেনশিয়ালিজমের ওপর 'বিইং অ্যান্ড নাথিংনেস' বইটা পড়েছিস?" আমি হয়তো বললাম, "না, ওটা এখনো পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে অস্তিত্ববাদের ওপর আমার কাম্যুকে বেশি ভালো লাগে। জাঁ পল সার্ত্রেকে আমার একটু ভণ্ডই মনে হয়।" মেয়েরা আমাদের কথা শুনল কি না তা আদৌ বোঝা গেল না। তারা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করতে করতে আমাদের পাশ ঘেঁষে নিজেদের গন্তব্যে চলে গেল। আমরা বোকা বনে গেলাম। এই যে আঁতলামি, এর একটা নামও আমরা দিয়েছিলাম_'পেপারব্যাক ইন্টেলেকচুয়ালিজম'। আমরা সবাই জানি, প্রায় সব ধরনের ইংরেজি লেখারই পেপারব্যাক সংস্করণ পাওয়া যায়, হার্ড কাভারের চেয়ে যার দাম অনেক কম। পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এবং তাৎক্ষণিকভাবে তার কৌতূহল বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই বইগুলোর পেছনের মলাটে বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে একটি বিবরণ দেওয়া থাকত। এই সংক্ষিপ্তসার পড়ে আমরা অনেকেই এমন ভাব দেখাতাম, যেন আমরা লেখাটি আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলেছি এবং লেখক সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা আছে। এ ধরনের আঁতেল চালবাজি আমাদের তারুণ্যে বেশ চালু ছিল, বিশেষ করে যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পেঁৗছে গেছে তাদের মধ্যে। স্বীকার করি যে এ এক প্রচণ্ড ভণ্ডামি। তবে এই ভণ্ডামির একটা ভালো দিক হচ্ছে, 'কী জানি' তা নিয়ে আমি ভণ্ডামি করছি, 'কী জানি না' তা নিয়ে গর্ব নয়। কিছু তরুণ বাদ দিলে আমি লক্ষ করেছি যে এখনকার বেশির ভাগ তরুণ এই কথাবার্তা শুনলে একেবারে ভাষাহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাদের কিছুই বলার থাকে না এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো, অজ্ঞতা নিয়ে তাদের কোনো বিকার নেই। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে_মিডিয়ক্রিটি, অভিধানে যার অর্থ মাঝারি জ্ঞানসম্পন্ন। আসলে শব্দটা হওয়া উচিত অসম্পূর্ণ শিক্ষা। এই অসম্পূর্ণ শিক্ষিতদের জয়জয়কার আজকের বাংলাদেশে।
(চলবে)
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

No comments

Powered by Blogger.