কে নেবে এই হত্যার দায় by ইকবাল হাসান
এখন শীতকাল। সারাদেশে শীতের প্রকোপ কমে গেলেও উতপ্ত হয়ে উঠেছে রাজপথ; রাজপথের রাজনীতি। কালবৈশাখীর মতো আর এক দফা তাণ্ডব ঘটে গেল সারাদেশের ওপর দিয়ে। বিরোধী দলের গণমিছিলকে কেন্দ্র করে প্রাণ হারাল পাঁচজন। তাদেরও তো আমাদের মতো বেঁচে থাকার কথা।
তারা অতিশয় সাধারণ মানুষ। দু'দিন পর তাদের আর কেউ মনেও রাখবে না। যে গণমিছিলের কারণে তাদের জীবন দিতে হলো_ তার নেত্রীও না। আমরা সবাই ভুলে যাব নিরীহ এই মূল্যবান পাঁচটি জীবনের কথা। অথচ কোনো প্রয়োজন ছিল না এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। প্রতিহিংসা, একগুঁয়েমি আর পাল্টাপাল্টির ছেলেমানুষী রাজনীতি পরিহার করলে অকালে ঝরে পড়ত না এ পাঁচটি জীবন। কী এমন ক্ষতি হতো সরকার যদি আর একটু রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা দেখাত? কী প্রয়োজন ছিল ১৪৪ ধারা জারি করার? কী প্রয়োজন ছিল একই দিনে একই সময়ে পাল্টা সমাবেশ ডাকার? এ ধরনের দু'চারটা গণমিছিল দিয়ে একনায়ক বা স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটানো গেলেও নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটানো যায় না, যাবে না_ এ সত্যটি বিরোধী দলেরও জানা আছে। এ সত্য জেনেও বিরোধী দল যে দুটি কারণে রাজপথ উত্তপ্ত করে চলেছে; অস্থির করে তুলেছে দেশের রাজনীতি, তা আজ আর কারও অজানা নয়। এক. যেহেতু তারা প্রায় বিনা কারণে সংসদ বর্জন করে চলেছে; অতএব দল ও দলের কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে (ইস্যুবিহীন) রাজপথই একমাত্র ভরসা এবং দুই. কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে রোডমার্চের নামে 'গাড়িমার্চ' আর এ ধরনের গণমিছিল ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় না থাকা। এক্ষেত্রে সরকারি দলের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি, নিপীড়ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিপরীতে অবস্থান সার্বিকভাবে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে তুলেছে।
দেশের তিনটি জায়গায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করেছে। এই অন্যায় অবিবেকী হত্যার দায়-দায়িত্ব কে নেবে এখন? রাষ্ট্র, সরকার, না বিরোধী দল?
এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে নতুন নয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঘরে-বাইরে, রাজপথে, মাঠে-ময়দানে, ফাঁসির মঞ্চে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড এর আগেও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বহুবার। একদলীয় কিংবা বহুদলীয়, স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক, সামরিক কিংবা বেসামরিক একনায়ক_ সরকার যে চরিত্রেরই হোক না কেন, রাজপথে প্রাণ হরণ করা হয়েছে নিরীহ মানুষদের। কোনো আমলই নিষ্কলুষ নয়। সব আমলেই মানুষকে হত্যা করা হয়েছে পাখির মতো। আর এই বেআইনি কাজে ব্যবহার করা হয়েছে স্টেট-মেশিনারি। বিশেষ বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে বিনা বিচারে বিরোধী বামপন্থিদের পাইকারি হত্যা, স্বৈরাচারী সেনা শাসকের আমলে ক্যু-পাল্টা ক্যুর অভিযোগ তুলে শত শত নিরপরাধ সৈনিক-অফিসারকে ফাঁসির মাধ্যমে হত্যা, শান্তিপূর্ণ ছাত্র মিছিলের ওপর ট্রাক চালিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, অপহরণ, গুম, গুপ্তহত্যার মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের মানুষদের বিনা বিচারে হত্যা করার দুষ্কর্মটি এখন চলছে প্রায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে। ভাবতে অবাক লাগে, স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও কী এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ও পরাধীনতার মধ্যে বাস করতে হচ্ছে নিরীহ মানুষদের।
আমরা অবাক হয়ে দেখি, দেশ ভেসে যাচ্ছে ডেফিজিট ফিন্যান্সিং আর লাগামহীন মুদ্রাস্টম্ফীতির জোয়ারে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে হুহু করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বাড়ছে। শুধু বাড়ছে না সময় আর মানুষের জীবনের দাম।
No comments