বৈষম্যের অবসান হোক-সমাজ by তৃপ্তি বালা

গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণের শ্রম ঝরানো, রক্ত জল করা টাকায় জনদায়িত্বপ্রাপ্ত ওই শিক্ষিতের কতটা ন্যায্য সুবিধা ভোগ করার অধিকার আছে কিংবা থাকা উচিত তা নির্ধারিত হওয়া দরকার। কতখানি অন্যায্য অধিকার অন্যায়ভাবে তিনি ভোগ করছেন তা নির্ধারিত এবং পুনর্নির্ধারিত হওয়া দরকার।


আর সর্বোপরি সাধারণের ভাগ্যে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া দরকার এবং এখনই বাংলাদেশ আজ দারিদ্র্য-বেকারত্ব, অন্যায়-অবিচার, প্রাচুর্য-ভোগ-দুর্নীতি আর বঞ্চনা-বৈষম্যের নিদারুণ চিত্রভূমি। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র কয়েক হাজার পরিবারের কাছে দেশের সহায়-সম্পত্তি গচ্ছিত হয়ে আছে। বলা যায়, পুরো দেশের সাধারণ মানুষজনের জীবন আজ জিম্মি ওই হাজারকতক দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে। এ তো একটা দিক। আরেকটি যে বিষয়, ব্যক্তিগত আয়-উন্নতি, ভোগবিলাসের ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যেই শিক্ষার উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে। আয়-উপার্জনের উপযুক্ত হওয়ার একটা লক্ষ্য শিক্ষায় আছে অবশ্যই। কিন্তু সার্বিকভাবে শিক্ষিত মানুষ হওয়ার মূল বিষয় যে একজন আলোকিত মানুষ হওয়া_ আজ যেন তা হারাতেই বসেছে।
দেশের প্রচলিত চাকরি ব্যবস্থায় প্রশাসন ক্যাডার সবচেয়ে গৌরবজনক, অর্থকরী এবং সুবিধাজনক চাকরি হিসেবেই স্বীকৃত। সে কারণেই টেকনোক্র্যাট পেশাজীবীর বাইরে মেধাবীদের একটি বিরাট অংশ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সরকারি সুবিধার উচ্চ ক্যারিয়ার সম্ভাবনার একটি চাকরি পেতে প্রাণপাত করে। টিকে গেলে_ মানে চাকরিটি অর্জন করতে পারলে তিনিই পেয়ে যান সৌভাগ্য-সুবিধার অনন্য চাবিকাঠি।
পর্যায়ক্রমিক সাফল্যের ধাপ পেরিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটি অর্জন করেন যে মানুষটি, মনে হয় মানুষ হওয়ার মৌলিক শিক্ষায় তিনি পিছিয়েই যান। লোভ আর অসংযমের প্রতিযোগিতাই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। দেশের রাজনীতিবিদ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় শিক্ষাদীক্ষায় মানসম্পন্ন না-ও হতে পারেন; কিন্তু সরকারের প্রশাসনে যথেষ্ট মেধা আর দক্ষতার পরিচয় দিয়েই একজন কর্মকর্তা সচিব, অতিরিক্ত সচিব পদে অধিষ্ঠিত হন। দারিদ্র্যপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর বিবেক যদি বলি তাদের তবে তো খুব অত্যুক্তি হওয়ার কথা নয়। কারণ তাদের ওপরই দেশটির গতি, নির্দেশনা অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই মানুষগুলো যদি সাধারণের কথা না ভেবে কেবলই লোভী, ভোগসর্বস্ব আত্মসুখে স্থবির-মগ্ন হয়ে ওঠেন, তখন আর দুঃখের অন্ত থাকে না। দরিদ্র জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির লাগামহীন বিলাসিতা, বিত্তবৈভব মানুষ হিসেবে তাদের পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধই করে তোলে। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনার কোনো পথ থাকে না।
একটা ক্ষুদ্র নমুনার উল্লেখ করা যাক। সবকারের একজন সচিব অনেক ক্ষেত্রেই ৩ থেকে ৪টি সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক কাজে ব্যবহার করেন, যার প্রতিটির পেছনে মাসিক খরচ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। ভাবতে অবাক লাগলেও চিত্রটা এমনই। শুধু যানবাহন বাবদ যাদের অন্যায্য খরচটা এ রকম, জীবনযাপনের অন্যান্য ক্ষেত্রে_ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, বিদেশ যাত্রা, বিলাসে অন্যায় খরচের মাত্রাটা অনুমান করাটা কঠিন নয়। আবার হয়তো খুব সহজও নয়। এ কারণেই যে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অশিক্ষা, অনাহারপীড়িত একটি দেশের শিক্ষিত সন্তানের পক্ষে কী করে সম্ভব অতখানি আত্মকেন্দ্রিক নিরেট ভোগসর্বস্ব জীবে পরিণত হওয়া? বর্তমান বাজারমূল্যের গতির সঙ্গে টিকে থাকতে যেখানে সাধারণ প্রতিটি মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো প্রতিটি মৌলিক বিষয় থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পেট্রোল-গ্যাস-অকটেন-যানবাহন যাতায়াত সমস্তটাই যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ার অবস্থা, সেখানে এই দেশে দেশ মায়ের সন্তান-হিতের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক উপযোগী সন্তানের ওই রকম জীবনমান, বিলাস, বিত্তবৈভবের মাত্রা নির্ণয় তো খুব সহজ হওয়ার কথা নয়।
মানুষের স্বভাব-চরিত্রের বিষয়ে যথার্থ আন্দাজের কারণেই বিজ্ঞ, জ্ঞানী-বিদগ্ধজন একসময় নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধের শিক্ষার পরও আইনকানুন, বিধিনিষেধ আরোপের বাস্তব ব্যবস্থা প্রবর্তনের ভাবনা করেছিলেন। আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা_ সবই নিবন্ধিত আইনের বিষয় হলেও মানুষের মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের চর্চার তো বিকল্প নেই। আদর্শলিপির শিক্ষা, মহাপুরুষদের বাণী_ সব তো স্কুলপাঠ্যে সনি্নবেশিত ছিল যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যেই। কিন্তু মনে হয় শিক্ষার সে লক্ষ্য থেকে তারা আজ অনেক দূরেই সরে গেছে। একজন শিক্ষিতজন কিংবা সার্বিকভাবে একজন মানুষ হিসেবে দেশ মায়ের এক সন্তান হিসেবে এই শিক্ষা কোনো কাজেই আসেনি!
বরং মনে হয়, কাঁধের ওপর চেপে বসা এই জাতীয় শিক্ষিত ভাগ্যবানের দুর্ভার বোঝায় ভারাক্রান্ত আজ সাধারণের জীবন।
এর প্রতিকার দরকার। গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণের শ্রম ঝরানো, রক্ত জল করা টাকায় জনদায়িত্বপ্রাপ্ত ওই শিক্ষিতের কতটা ন্যায্য সুবিধা ভোগ করার অধিকার আছে কিংবা থাকা উচিত তা নির্ধারিত হওয়া দরকার। কতখানি অন্যায্য অধিকার অন্যায়ভাবে তিনি ভোগ করছেন তা নির্ধারিত এবং পুনর্নির্ধারিত হওয়া দরকার। আর সর্বোপরি সাধারণের ভাগ্যে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া দরকার এবং এখনই।

তৃপ্তি বালা :গল্পকার

No comments

Powered by Blogger.