জুবায়ের হত্যা :পুরনো রাজনীতি আবারও নয়া বোতলে by আলমগীর স্বপন, নূর সিদ্দিকী ও ইমরান হোসেন ইমন
জুবায়েরের রক্তে জাহাঙ্গীরনগরের লজ্জাবতী গাছের সবুজ পাতা নুয়ে যে লাল হয়ে আছে_ এসব পরিস্থিতি কি লজ্জাবতী লতাকে আবারও উঠে দাঁড়ানোর পথ দেখাচ্ছে? এরই মধ্যে নিশ্চয়ই অনেকে ভুলতে বসেছেন জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। যারা তার জন্য কেঁদেছেন, প্রতিবাদ করেছেন তাদের প্রতিরোধের ইচ্ছায়ও নিশ্চয়ই ভাটার টান এসেছে।
আর যারা এ হত্যাকাণ্ডের ফলে ক্ষমতার গদিতে টান পড়ে কি-না সেজন্য লোক দেখানো হা-হুতাশ করেছেন, তারা অবশ্য এখন অনেকটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলছেন, 'যাক বাবা, প্রক্টরকে বাদ দিয়ে, আর কয়েক ছাত্রকে বহিষ্কার করে, ধরিয়ে দিয়ে এ দফায় বাঁচা গেল!'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন এতে অবশ্য বেঁচে গেছে_ তাহলে মরেছে কে? শুধু জুবায়ের-কবীর-দীপু-আনন্দ নাকি শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতিও?
তাই দেখা যাচ্ছে আবারও ক্ষমতা পোক্ত করার নয়া ছক কষছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর। আর এ ছকে শামিল হতে, আরও সুযোগ-সুবিধা পেতে নিশ্চয়ই আরও নতুন কিছু শিক্ষক ভিড়েছেন উপাচার্যের দলে। আর যারা সুবিধা করতে পারেননি, পারছেন না তাদের সংযোগ উপাচার্যবিরোধী দলে। জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে 'ছাত্রলীগ ভিসি গ্রুপ' এরকম কিছু শব্দ শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হয়েছেন! সেটা স্বাভাবিকও। ছাত্রলীগের ওমুক-তমুক গ্রুপ থাকতে পারে; কিন্তু 'ভিসি গ্রুপ' এটা আবার কী? তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির খবর যারা জানেন তাদের কাছে অবশ্য এটা খুব স্বাভাবিক। এখানকার শিক্ষকরাজনীতি কিন্তু উপাচার্য বনাম উপাচার্যবিরোধী বলয়েই হয়ে থাকে_ আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি বা নীল-সাদা নয়।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় সাংবাদিকতা করার সুবাদে, তাদের (শিক্ষক সমাজ) সঙ্গে আলাপ, বাতচিতের সৌভাগ্য হওয়ায় এরকম ধারণাই আমরা পেয়েছিলাম। সেই ধারণার পাটাতন অবশ্য এখন আরও শক্ত হয়েছে। যখন পত্রিকার পাতায় পড়তে হয় বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন বছরে দুটি ইনস্টিটিউটসহ ৩৩টি বিভাগে ১৮৭ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগের এ মচ্ছব যতটা না শিক্ষক সংকট মেটাতে তার চেয়েও বেশি দল ভারী করতে।
একটি জাতীয় দৈনিকের (সমকাল) ১৪ জানুয়ারির প্রথম পাতায় খবরে জানা গেল_ কারা কারা এ প্রশাসনের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের যোগ্যতা কী? তাদের দলীয় ও প্রশাসনিক আনুগত্যের ওজন কত? কোন মাপজোখে তাদের নেওয়া হয়েছে। আর এক্ষেত্রে দু'একটি উদাহরণও হাজির করা যেতে পারে_ ইতিহাস বিভাগে রেকর্ডসংখ্যক নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে বাদ দিয়ে নেওয়া হয়েছে এমন দু'জনকে যাদের প্রধান যোগ্যতা ছাত্রলীগ কর্মী হওয়া। এভাবে আত্মীয় কোটায় সরকার ও রাজনীতি বিভাগে একজনকে, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি খোদ উপাচার্যের বোনের ছেলের স্ত্রী। আর এমপি কোটায় বাংলা বিভাগে এমন একজন নিয়োগ পেয়েছেন যাকে তার নামের চেয়ে এমপি কোটার শিক্ষক হিসেবেই চেনেন সবাই। এরকম যেসব বিভাগে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের বেশির ভাগেরই পরিচয় দলীয়, কারও আত্মীয় কিংবা স্বজন। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এই যখন জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের আগের পরিস্থিতি তখন নতুন খবর আরও নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০ জনের বেশি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে বা প্রক্রিয়া চলছে। সেটা শিক্ষক সমিতির আন্দোলনের যে দাবি 'গণনিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্য ও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ বাতিল'-এর দাবিকে বুড়ো আঙুলই দেখাচ্ছে।
তাহলে কী দাঁড়াল? জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে প্রশাসনের দেউলিয়াত্বের বিরুদ্ধে, অযোগ্য ও দলীয় শিক্ষকদের বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তার সমীকরণ আবারও মিশেছে দল ভারী করার রাজনীতিতে। এর সঙ্গে এ আন্দোলনকে ভয় না পেয়ে, জুবায়েরকে পুরোপুরি ভুলে গিয়ে উপাচার্য গ্রুপ তাদের ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের (?) নয়া কৌশল নিয়েছেন। কীভাবে? এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে ৩-৪টির দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের একটি পদেই রাখা হচ্ছে। আর এতদিন কুক্ষিগত থাকা পদগুলো দেওয়া হচ্ছে বা হয়েছে তাদের যারা এতদিন কোনো পদেই ছিলেন না। তাই বলা যায়, জুবায়ের তাদের মনস্তত্ত্বে হাওয়া হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে হালুয়া-রুটি ভাগাভাগির নতুন হিসাব-নিকাশ।
এ তো গেল ভাগাভাগি ও নিয়োগের রাজনীতি। আর যে রাজনীতির কারণে জুবায়ের বলি হলো তার কী অবস্থা? এ ক্ষেত্রেও জুবায়ের বেমালুম হাওয়া_যতটুকু খবর পাচ্ছি তা একটু ভয়াবহও! কেননা আমরা যখন ছাত্র ছিলাম বা ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করতাম তখন আবাসিক শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টরদের কোনো ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব দেওয়ার খবর সে রকম একটা শুনিনি। কিন্তু এখন নাকি প্রত্যেক হলে একজন আবাসিক শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টরদের তত্ত্বাবধানে চলছে ছাত্রলীগ কর্মীদের সংগঠিত করার কাজ। এমনকি তারা আর্থিক সহযোগিতাও করছেন। যাতে এ পোষ্য ছাত্রলীগ কর্মীরা প্রশাসনের পক্ষে কাজ করে। এরই মধ্যে প্রক্টরিয়াল বডি ও আবাসিক শিক্ষকদের ছাতার নিচে যারা আছেন তারা প্রতিদানও দিতে শুরু করেছেন। জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে যারা আন্দোলন করছেন, সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষার পরিবেশের দাবি যারা জানাচ্ছেন তাদের অনেকেই এখন হলে থাকতে পারছেন না বলেই জানা যাচ্ছে। তাহলে কী দাঁড়াল? জুবায়ের কি আছে তাদের এবং আমাদের মাথায়?
জুবায়েরের রক্তে জাহাঙ্গীরনগরের লজ্জাবতী গাছের সবুজ পাতা নুয়ে যে লাল হয়ে আছে_ এসব পরিস্থিতি কি লজ্জাবতী লতাকে আবারও উঠে দাঁড়ানোর পথ দেখাচ্ছে? নাকি শিবিরের হামলায় কবির হত্যা, ছাত্রদলের কোন্দলে দীপু কিংবা ছাত্রলীগের কোন্দলে আনন্দ হত্যার মতো জুবায়ের শুধুই ছবি হয়ে থাকবে?
তবে আশার শেষ প্রদীপটা এত হিংসা এবং লোভের মাঝেও জ্বালিয়ে রেখেছেন সাধারণ ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকরা। কেননা অতি দাপুটে ক্ষমতাবানরা যতই ভুলে যাক এক অতি সাধারণ বাস্তবতা, তাদের মনে রাখতে হবে এটা জাহাঙ্গীরনগর? এখানে পুকুরে পদ্ম ফুটলেও, অতিথি পাখিরা জলকেলিতে নামলেও এখানকার জলে বুদবুদও হয়? এখানে সম্পর্ক শুধু নোবেল বাগ্মিতায় নয়_ বোধের তাড়নায় বেড়ে ওঠে। এখানে যারা অতিসাধারণ তারা কদম আর মহুয়া ফুলের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারে_ মানুষের চেয়ে বড় কিছুই নেই জীবনে। তাতে কফির মগ হাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের কথা ভাবলেও, কিংবা বর্ষায় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজলেও জাহাঙ্গীরনগরে যখন সন্ত্রাস অথবা রক্ত ঝরানোর পাশবিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তখন প্রচণ্ড প্রতিরোধে জীবনানন্দের বোধ খেলা করে সাধারণ অন্তরে। সেই বোধে ঐক্যবদ্ধ হয় তারা, যারা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন এবং যারা ক্যাম্পাসে কখনও ছিলেন। তাই এখানে বইয়ের পোকা ভালো ছাত্রটির প্রতিরোধের মুখেই পালাতে হয় মৌলবাদী-জামায়াত-শিবির চক্রকে, ধর্ষক-নিপীড়ক শিক্ষককে ছাড়তে হয় ক্যাম্পাস।
তবে যে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধের ঐতিহ্য জাহাঙ্গীরনগরের তা কি আগের মতোই আছে? এমন প্রশ্ন উঠলেও যারা আন্দোলনে আছেন তাদের লড়াইয়ের জোরই উত্তর দেবে এ প্রশ্নের। জবাব দেবে জুবায়ের আমাদের মনস্তত্ত্বে কতটা আছেন সে প্রশ্নেরও। আর তা না হলে কোনো এক রোদেলা দুপুরে জাহাঙ্গীরনগরের অসংখ্য লজ্জাবতী গাছ আবারও পাতা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে লাল হয়ে, অন্য কোনো জুবায়েরের রক্তে ভিজতে।
লেখকত্রয় :সাংবাদিক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র
No comments