এখনও সর্বস্তরে বাংলা চাই-ভাষা সংগ্রামের ৬০ বছর by কামাল লোহানী

প্রশাসনে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে এখন। দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত বহু শব্দ প্রয়োগ হাস্যকর, দুর্বোধ্যও বটে। ফাইলে বাংলায় নোট লেখা হলে তা যায় আমলাতন্ত্রের নিচ থেকে ওপরতলা পর্যন্ত। তারা হয়তো এ 'অভিনব' ভাষা ব্যবহারের পরও বাক্যের অর্থ অনুধাবন করতে পারেন বা পারছেন।


কিন্তু বাইরে ওই বিশেষ দাফতরিক ভাষা সাধারণের বোধগম্য হয় না। এ জন্য ভাষাতত্ত্ববিদদের সহায়তা নিয়ে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত ভাষাকে সহজবোধ্য করা বাঞ্ছনীয়। ভাষাতাত্তি্বকদের সহযোগিতায় ইংরেজিসহ বিদেশি ভাষার শব্দগুলোকে যথার্থ অনুবাদ করা সম্ভব হলে সহজবোধ্য এবং গ্রহণযোগ্য শব্দাবলি পাঠে কোনো হাসির উদ্রেক করবে না। আমার ধারণা, বাংলা একাডেমী এ বিষয়ে সরকারি যন্ত্রকে সহায়তা
দিতে পারে


এ বছর ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর। আমরা গান গেয়েছি, এখনও গাইছি_ 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'। আমরা ভুলিনি, এ কথা ঠিক; কিন্তু শহীদদের যে দাবি এবং প্রত্যাশা ছিল তা কি পূরণ করতে পেরেছি? এ বিরাট জিজ্ঞাসা আজ জাতির সামনে, বিশেষ করে সচেতন বাংলার মানুষের কাছে। ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর আমাদের জীবনে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। এর দুটি দিক আছে। এক. যারা ভাষা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেকেই মারা গেছেন। জীবিতদের অধিকাংশের বয়স এখন ৮০ ছুঁই ছুঁই করছে, কেউবা ৮০ পেরিয়ে গেছেন, বার্ধক্যের কারণে চলৎশক্তিহীন অথবা দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে পরনির্ভর হয়ে পড়েছেন, নয়তো অসুস্থতায় শয্যাগত। এসব সত্ত্বেও সংগ্রামের ৬০ বছর পর তাদের জীবনকে আলোকিত করে আছে দেশপ্রেম ও মাতৃভাষাপ্রীতি। ১৯৫২ সালের স্মৃতিময় অধ্যায়ের আবেগঘন মুহূর্তগুলো আজও ভিড় করে আছে তাদের জীবনে। তাদের বেঁচে থাকা আমাদের গর্বিত উত্তরাধিকারের পথে এগিয়ে চলার অফুরন্ত শক্তির বিপুল আধার। দুই. ৬০ বছর আগে দ্বিজাতিতত্ত্বে বিভক্ত বাংলার এই অংশে, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যাকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ অপরিচিত ও ভিন্ন ভাষা_ উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাংলার তরুণ ছাত্রসমাজ। শুরুতেই উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ভাষাতত্ত্ববিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একে 'গণহত্যা'র শামিল বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য পূর্ববাংলার আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার অধিকার দাবি করেছিলেন; কিন্তু কুচক্রী পাকিস্তানি নেতৃত্ব তা হতে দেয়নি সেদিন। অবশেষে '৪৮ পেরিয়ে '৫২ সালে রক্ত দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হয়েছিল। সেদিন স্লোগান ছিল_ 'অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' এবং 'সকল আঞ্চলিক ভাষার সমান মর্যাদা দিতে হবে।' কোনো ভাষার বিরোধিতাও আমরা কখনও করিনি। আজও করি না; কিন্তু পরম পরিতাপের বিষয়, বিপুল রক্তের বিনিময়ে বাংলা ও বাঙালিবিরোধী পাকিস্তানি দুশমনদের একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত করে রক্তোৎপল বাংলাদেশ অর্জন করলেও আমরা অভিশপ্ত অতীতকে আঁকড়ে ধরে রয়েছি শুধু বলব না, আমরা মাতৃভাষার অবমাননা করে চলেছি নিত্যদিন। স্বাধীন বাংলাদেশে মাতৃভাষার যে মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল, আমরা সে ক্ষেত্রে কার্পণ্য দেখাচ্ছি নির্লজ্জভাবে। জীবনের বহু ক্ষেত্রেই ভাষা শহীদ, সংগ্রামী, দেশবাসী সব নাগরিকের যে দাবি ছিল_ 'সর্বস্তরে বাংলা চালু কর', আজ যেন তাকে প্রত্যাখ্যান করে ইংরেজি বা অন্য বিদেশি ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছি নিরন্তর। তবে এ কথা ঠিক, বহু বিদেশি শব্দ আমাদের ভাষায় গৃহীত হয়েছে, যা দৈনন্দিন জীবনেও ব্যবহৃত হচ্ছে, এমনকি নিত্যদিন ব্যবহৃত ইংরেজি বা বিদেশি শব্দ অশিক্ষিত বহু মানুষ বুঝতে পারে এবং বলেও। তাই বলে উচ্চবিত্ত বা ধনিকশ্রেণীর ঘরে ওই সব ভাষা এমনভাবে অনুপ্রবেশ করেছে, যা কেবল তাদের আভিজাত্য অক্ষুণ্ন রাখায় ব্যবহৃত হচ্ছে তাই নয়, অর্থোপার্জনেও সহায়ক হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। অন্যদিকে গরিব জনসাধারণের ছেলেমেয়েরা বৈষম্যের কারণে প্রতিযোগিতায় আসতে পারছে না। ফলে ভোগবিলাসী একটি শ্রেণীর শিকারে পরিণত হচ্ছে গরিবরা। সামাজিকভাবেও এ প্রবণতা শিক্ষা পদ্ধতিকে কলুষিত করছে এবং মানুষে মানুষে ব্যবধান বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিত্তবানরা মনে করছেন, তারা যথোপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত। সুতরাং প্রশাসন, অফিস-আদালতে তারাই সুযোগ পাবেন। অথচ এ আচরণে বঞ্চিত গরিবদের মধ্যে বহু প্রতিভাই অপ্রকাশিত থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রশাসনে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে এখন। দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত বহু শব্দ প্রয়োগ হাস্যকর, দুর্বোধ্যও বটে। ফাইলে বাংলায় নোট লেখা হলে তা যায় আমলাতন্ত্রের নিচ থেকে ওপরতলা পর্যন্ত। তারা হয়তো এ 'অভিনব' ভাষা ব্যবহারের পরও বাক্যের অর্থ অনুধাবন করতে পারেন বা পারছেন। কিন্তু বাইরে ওই বিশেষ দাফতরিক ভাষা সাধারণেরও বোধগম্য হয় না। এ জন্য ভাষাতত্ত্ববিদদের সহায়তা নিয়ে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত ভাষাকে সহজবোধ্য করা বাঞ্ছনীয়। ভাষাতাত্তি্বকদের সহযোগিতায় ইংরেজিসহ বিদেশি ভাষার শব্দগুলোকে যথার্থ অনুবাদ করা সম্ভব হলে সহজবোধ্য এবং গ্রহণযোগ্য শব্দাবলি পাঠে কোনো হাসির উদ্রেক করবে না। আমার ধারণা, বাংলা একাডেমী এ বিষয়ে সরকারি যন্ত্রকে সহায়তা দিতে পারে।
গণমাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব কাজ করছে, তা দারুণভাবে পীড়িত করছে বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করা একুশে চেতনার অনুসারী এবং সর্বোপরি মাতৃভাষার প্রতি অনুরক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষকে। সাধারণ মানুষ যারা টেলিভিশন দেখেন কিংবা এফএম বেতার শোনেন তারা কিন্তু অনেকটাই বাধ্য হয়ে শোনেন কিংবা দেখেন এবং বিনোদনটাই গ্রহণ করতে পারেন। টেলিভিশনে যে বাংলা ভাষার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় তাকে বলা হয় টক শো, রিয়ালিটি শো ইত্যাদি। বাংলা নাম আছে অনেকগুলোরই, কিন্তু উপস্থাপক যখন হাই ভিউয়ার্স বলে বাংলার আপামর দর্শক-শ্রোতাদের সম্বোধন করেন, তখন বিরক্তি ধরে যায়। কারণ ওটা তো কোনোভাবেই বঙ্গ সংস্কৃতির অন্তর্গত নয়। বিদেশি টিভি থেকে সংক্রমিত একটি সম্বোধন, যা কেবল ভিনদেশি সংস্কৃতিতেই চলছে এবং চলেও। বাংলা টেলিভিশনগুলো সেই পাকিস্তানিদের মতো উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিতে ওদের বর্তমান শব্দগুলো ব্যবহার করছে। আর এফএম বেতার বলে যে নতুন 'চটকদার' আবিষ্কার বেতার জগতে হয়েছে, তার কথা না বলাই ভালো।
দোকানপাট এবং ঘরবাড়ির দুরবস্থা তথৈবচ। দোকানের সাইনবোর্ড তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও বাংলায় লেখা হতো। সঙ্গে ইংরেজি থাকত, তবে প্রাধান্য বাংলারই থাকত। এ সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনের মাস এলেই দেখতাম, সাইনবোর্ডের ইংরেজি অংশটা খবরের কাগজ অথবা কালো কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দোকানিরা নিজ স্বার্থেই ওই কাজটি করতেন, না হলে ছাত্ররা এ দায়িত্ব পালন করতেন। কারণ, এ আন্দোলন ছাত্ররাই সংঘটিত করেছিলেন। অনেক সময় ইংরেজি লেখাটাকে কালো কালিতেও লেপে দেওয়া হতো। কিন্তু লাখো শহীদের রক্তস্নানে অর্জিত বাংলাদেশে আজ একি দেখছি? দেশ পাকিস্তানিমুক্ত হলেও তাদের প্রেতাত্মা থেকে গেছে। তাই ক্রমেই কৌশলে বাংলাকে বিতাড়িত করে ইংরেজিতে সাইনবোর্ড লেখা শুরু হয়ে গেছে। দেখলাম_ স্বাদেশিকতা, স্বাজাত্যবোধ, মাতৃভাষার প্রতি প্রেম ক্রমেই উবে যেতে থাকল। সেখানে জুড়ে বসতে থাকল ইংরেজি তো বটেই, আরবিও। শহীদ বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারের দেশ, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ভাষার এ দুর্দশা কেন? তার চেয়ে নির্মম পরিহাস হলো, বিত্তবান ব্যক্তিরা ঘরবাড়ি নয়, ভবন-অট্টালিকা করে তাতে বাবুয়ানার ইংরেজি নাম দিতে শুরু করলেন, এখনও করছেন। বিশেষ স্বার্থান্বেষী ভোগবিলাসী মহল নিজ ভাষা ত্যাগ করে পরদেশি ভাষার প্রতি এত আকৃষ্ট হলেন কেন? আমার দেশের সব মানুষ, যারা দোকানে দোকানে সদাই করতে আসেন, তারা সবাই ইংরেজ হয়ে গেলেন নাকি! নাকি বৈষম্যের পাল্লাটাই কেবল ভারী নয়, নতুন কোনো পরাধীনতার শৃঙ্খল পরানোর উদ্দেশ্যেই এ মানসিকতা জন্মেছে আমাদের মধ্যে? এ দেশ স্বাধীন করেছি আমরা; কিন্তু অলক্ষ্যে দেশটাকে বর্গা দিয়ে ফেলেছি ইংরেজি বলা বিত্তশালীদের কাছে। যাদের সংখ্যা হাতেগোনা এবং দেশটা তো তারাই চালাচ্ছে। বুঝি, বিত্তশালী-রাজনীতিবিদ থেকে শিল্পপতি-ব্যবসায়ী সবাই ওই ইংরেজি বলা লাল-প্রভুদের মনোরঞ্জনে নিজেদেরও রঞ্জিত করেছেন। তাই কোনো অনর্থ ঘটাতে চান না তারা। কারণ জানেন তারা, ওদের ঘাঁটালে রাজনীতি, শিল্প, ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
আরেক ধরনের অতি ভক্তি রাজধানী ঢাকাকে প্লাবিত করে দিয়েছে। ঢাকার সাবেক পৌরপিতা বড় আহ্লাদে ভাষাসংগ্রামী, সেক্টর কমান্ডার ও রাজনীতিবিদদের নামে রাস্তাঘাট-অলিগলির নামকরণ করেছেন। কিন্তু অলিগলি জুটেছে ভাষাসংগ্রামীদের নামে। বড় রাস্তার দু'একটি জীবিত রাজনৈতিক নেতা আর বেশিরভাগই মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারদের নামে হয়েছে। অথচ ১৯৪৮-৪৯ সালে যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া 'গণহত্যা'র শামিল বলার সাহস দেখিয়েছিলেন এবং পাকিস্তান গণপরিষদে যে বঙ্গসন্তান, কৃতী রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার দাবি করেছিলেন, তাদের নামে তো কোনো রাস্তাই হয়নি; এমনকি আজ থেকে ২৪ বছর আগে ঢাকা-আরিচা সড়ককে শহীদ রফিক ও জব্বার এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহাসড়ককে শহীদ সালাম-বরকতের নামে করার দাবি তুলেছিল 'একুশে চেতনা পরিষদ' ১৯৮৬ সালের ভাষাসংগ্রামী সমাবেশে। তারও কোনো হদিস নেই আজ পর্যন্ত। তাই ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর উপলক্ষে একুশে চেতনা পরিষদ আগামী ১৯, ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি সাভার গণস্বাস্থ্য চত্বরে যে ভাষাসংগ্রামী সম্মেলনের আয়োজন করছে, তার প্রাক্-সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে উল্লেখও করা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, এবারের সম্মেলনের স্লোগান হলো_ 'সর্বস্তরে বাংলা চাই'। পাকিস্তান আমলে এ স্লোগান ছিল_ 'সর্বস্তরে বাংলা চালু কর'। এখন তো নিজেরাই রাষ্ট্রের স্রষ্টা, এখনও 'সর্বস্তরে বাংলা চাই' স্লোগান দিচ্ছেন তারা, নাগরিক জীবনে বাংলায় দুরবস্থা অন্য ভাষার অনুপ্রবেশ দেখে।
কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং ইংরেজি ভাষা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একের পর এক প্রতিষ্ঠা করছেন বিত্তবান লোকেরা। কখনওবা কয়েকজন 'জনপ্রিয় শিক্ষক' মিলে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল খুলে বসছেন। তারা এটাকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে মুনাফা লোটার মানসে করে যাচ্ছেন। তাদের কোনো দেশপ্রেম আছে বলে মনে হয় না। তারা কেবল অর্থ উপার্জনের পেছনে ছুটছেন বলেই এ কর্মটি করছেন। তারা জানেন, এমন একটি ইংরেজি স্কুল খুলতে পারলে, তারা অর্থবিত্তে প্রভাবশালীদের ছেলেমেয়েদের পেয়ে যাবেন। বিদেশি ভাষার মাধ্যমে নিজেরা ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে সমাজে অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে চান। এ প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অজুহাত, ইংরেজি না জানা থাকলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুবিধা করা যাবে না। বিদেশিদের সঙ্গে কথাবার্তা না বলতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য জুতসই হবে না। তাই বাংলাকে ফেলে রেখে ইংরেজি চর্চা প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেছে। তারাই আবার এখানে পড়িয়ে বিদেশে যখন উচ্চশিক্ষার জন্য সন্তানদের পাঠান, তখন তাদের সে দেশে গিয়েও ওখানকার শিক্ষার মান ও ভাষাজ্ঞান অর্জন করতেই হয়।
যে কোনো জাতি মাতৃভাষায় কথা বলতে, মতবিনিময় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অথচ আমরা বাংলায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ কেন করি না? বিদেশ থেকে যে-ই আসুক আমরা কেন তাদের সঙ্গে দোভাষীর মাধ্যমে বাংলা ভাষা ব্যবহার করি না? আমরা যেদিন মাতৃভাষা বাংলাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলাম, সেই ২১ ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বসংস্থার মাধ্যমে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। প্রায় দেড়শ'টি দেশ এদিনটি পালন করছে। সেই আমরাই আজ ঝুঁকে গেছি ভিনদেশি ভাষার দিকে।
এই হীনমন্যতা দূর করার উদ্দেশ্যে 'একুশে চেতনা পরিষদ' ফেব্রুয়ারির ১৯, ২০ ও ২১ এ ৩ দিনব্যাপী ভাষাসংগ্রামী সম্মেলনের আয়োজন করছে 'সর্বস্তরে বাংলা চাই' স্লোগানে সোচ্চার হতে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেলা-উপজেলায় যারা সরাসরি ভাষাসংগ্রামের সঙ্গে জড়িত তারাই এতে অংশগ্রহণ করবেন। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষাতেই কথা বলি, দেশকে ভালোবাসি। এ ভাষাতেই মরি-বাঁচি। এ ভাষাতেই স্বপ্ন দেখি। সুতরাং এ ভাষা আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনে বিপুল উদ্দীপনার হাতিয়ার। আদিবাসী সম্প্রদায় আমাদের দেশের নাগরিক, তাদের মাতৃভাষা, সংস্কৃতিও আছে, তাদের প্রতিও আমরা সম্মান জানাব; কিন্তু ভিনদেশি ভাষা-সংস্কৃতির কাছে মাতৃভাষার সম্মানকে বিসর্জন দেব না।

কামাল লোহানী :সাংবাদিক ও
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

No comments

Powered by Blogger.