দাদনের ফাঁদে জেলে-এই লজ্জা আমাদের সবার

সাগরে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, দস্যুতার কাছে নয় কেবল; ডাঙাতেও উপকূলীয় জেলেরা কতটা বিপন্ন বুধবার সমকালে প্রকাশিত আলোকচিত্রটি তার প্রমাণ। দেখা যাচ্ছে, মহাজনের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বরগুনার পাথরঘাটায় এক জেলেকে পিঠমোড়া বেঁধে আড়তে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আধোমুখে বসে থাকা ওই জেলের জন্য রশির বাঁধন ব্যক্তিগতভাবে যেমন দুর্ভাগ্যজনক সত্য, সমষ্টিগতভাবে তার সম্প্রদায়ের জন্য প্রতীকীও।


মহাজনের ঋণের ফাঁসে এভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে তারা। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরগুনা জেলাতেই অন্তত ২৫ হাজার জেলে দাদনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হতে বসেছে। দেনা শোধ করতে না পেরে ভিটেমাটি ছেড়েছে_ এমন নজিরও অনেক। বস্তুত উপকূলীয় জেলেদের ওপর মহাজনের নিপীড়ন মধ্যযুগের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক বাংলাদেশে মধ্যযুগীয় এই ব্যবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। আমরা মনে করি, স্থানীয় প্রশাসন আন্তরিক হলে জেলেদের ওপর মহাজনের নিপীড়ন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এর বিকল্পও নেই। কারণ, দেনার দায়ে কাউকে ধরে এনে বেঁধে রাখা আইনের শাসনের প্রতিও বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়। অত্যাচারী মহাজনদের বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি, অর্থের জোরে নাগরিক অধিকার হরণ করা যায় না। একই সঙ্গে জেলেদের যাতে মহাজনের দ্বারস্থ হতে না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সহজ শর্তে সরকারি ঋণ মিললে দাদনের ফাঁদে কেউ পা দিতে চাইবে না। সরকারি ঋণ ব্যবস্থার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কথা আমাদের অজানা নয়; কিন্তু উপকূলীয় বিপুলসংখ্যক জেলের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে হলেও তা কাটিয়ে উঠতেই হবে। বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ওই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম কেন পর্যাপ্ত মাত্রায় সম্প্রসারণ করছে না, সে প্রশ্নও আমরা তুলতে চাই। বাংলাদেশ ক্ষুদ্রঋণের বৈশ্বিক মডেল কেবল নয়, নোবেল পুরস্কারও মিলেছে। তারপরও যদি এ দেশের নাগরিক দাদনের দায়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়, সে লজ্জা কেবল মহাজনের হতে পারে না। উপকূলীয় জেলেরা এমনিতেই তাদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করে মৎস্যসম্পদ আহরণ করে থাকে। ডাঙার স্বস্তি ও নিরাপত্তার ভার কি আমরা নিতে পারি না?

No comments

Powered by Blogger.