খোলা চোখে-চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি... by হাসান ফেরদৌস

গোড়াতে একটা গল্প শুনুন। একদিন আকাশে গুরু গুরু মেঘের গর্জন শুনে এক বালক ভয় পেয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, কিসের শব্দ?’ আবহাওয়াবিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব না শুনিয়ে বাবা বললেন, ‘কোথাও কখনো যদি কেউ মিথ্যা বলে, তখন ঈশ্বর আকাশে আওয়াজ করে সাবধান করে দেন।’


বিনা তর্কে ছোট্ট বালক বাবার সে কথা মেনে নিল। সেদিন আকাশে প্রচণ্ড মেঘ ও বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হলো সশব্দ বজ্রপাত। শব্দের সে ঘনঘটা আর থামে না। বিস্মিত ও ভীত বালকটি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বাবা, এখন কী হচ্ছে? শব্দ যে থামে না?’ বাবা ছোট্ট ছেলেটির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘বাবা, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এখন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন। সম্মেলন শেষ হলেই শব্দ থেমে যাবে।’

২.
বমাল ধরা পড়ার পরও রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাঁরা নির্দোষ। সদ্য পদচ্যুত মন্ত্রীও নিজেকে নির্দোষ বলেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর কোনো দায়দায়িত্ব নেই, কারণ টাকা তো তাঁর কাছে পাওয়া যায়নি! সে টাকা তিনি বহনও করেননি। এ টাকা কোত্থেকে এল, সে প্রশ্নের জবাবে রেলওয়ে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর ব্যাখ্যা, এ টাকার মালিক বিদেশে বসবাসরত তাঁর শ্যালক। মন্ত্রী অবশ্য আগ বাড়িয়ে জানিয়েছিলেন, এ টাকা তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর নিজের। সে টাকা যদি অবৈধ হয়, তা নিয়ে দুদক তদন্ত করুক। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এত টাকা তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী কোত্থেকে পান, প্রায় মাঝরাতে তা বস্তা করে বয়ে নিতে হবে কেন, এমন প্রশ্ন তাঁর মনে একবারের জন্যও জাগেনি। অর্থাৎ তাঁর নাকের ডগার ওপর দিয়ে পুকুর চুরি হলেও এ নিয়ে তাঁর বলার, দেখার বা আপত্তি করার কিছু নেই! যা করার করুক ঢাল-তলোয়ারবিহীন দুদক নামক নিধিরাম সর্দার।
হায়, এই না হলে বাংলাদেশের মন্ত্রী!
আমাদের দেশে যাঁরা দায়িত্ববান, তা তিনি মন্ত্রী হোন বা পাড়ার দারোগা, কোনো ব্যাপারে দায়দায়িত্ব নেওয়ার কোনো তাগাদা, ঔচিত্যবোধ, অথবা কোনোরকম বিবেকের তাড়না তাঁদের নেই। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। কৃতিত্ব নেওয়ার বেলায় কিন্তু তাঁরা সর্বদা দুই পায়ে খাড়া। যেমন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রী হওয়ার পর বাংলাদেশের রেলওয়ের কী কী উন্নতি হয়েছে, তার সবিস্তার বিবরণ দিয়েছেন। সত্য-মিথ্যা জানি না। কিন্তু এটুকু তো জানি, যদি কোনো উন্নতি হয়ে থাকে, তার কোনোটাই তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে করেননি। এ জন্য রেলের ইঞ্জিনিয়ার আছেন, টেকনিশিয়ান আছেন, কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। আসল কৃতিত্ব তো তাঁদের। টাকা হাতানোর জন্য সব দোষ যদি একা মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর হয়, তাহলে রেলওয়ের তাবৎ সাফল্যের ভাগীদার তাঁরাই হবেন, যাঁরা এ কাজ নিজ হাতে করেছেন।
কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তো বটেই, একদম স্থানীয়, এমনকি পারিবারিক পর্যায়েও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা তদারকের জন্য কেউ না কেউ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সে জন্য আমরা স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিই। ক্রিকেটদলে অধিনায়ক রাখি। মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দিই মন্ত্রীকে। তাঁরা কেউই সব কাজ নিজেরা করেন না, কিন্তু কাজগুলো যেহেতু তাঁদের নেতৃত্বে সাধিত হয়, অতএব সে কাজের দায়দায়িত্ব তাঁরাই নেবেন, এমন আশা আমরা করি। খেলার মাঠের কথা ভাবুন। মুশফিকুর রহিম তো একা খেলছেন না। তামিমের ভুল মারটির দায়দায়িত্বও তাঁর নয়। তার পরও খেলায় জিতলে অভিনন্দনের চাপড় এবং হারলে বিরক্তির চড় তাঁর পিঠেই পড়ে সবচেয়ে বেশি। একই কারণে বড় কোনো ধরনের বিপর্যয় হলে আমরা দলের কোচ বা ক্যাপ্টেনকে পত্রপাঠ বিদায় দিই।
এই নিয়মের এক বড় ব্যতিক্রম আমাদের মন্ত্রী, আমলা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো মন্ত্রীকে তাঁর নিজের মন্ত্রণালয়ের ভুলের জন্য কোনো দায় স্বীকার বা কোনো মাশুল দিতে দেখিনি। লঞ্চডুবিতে মানুষ মারা গেলে আমাদের মন্ত্রীরা সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে। বাজারে দ্রব্যমূল্য আগুন হলে তাঁরা বুদ্ধি দেন, কম খান, দেখেন না আমি কম খাই? কেউ কেউ আছে এর চেয়ে দড়া। টাকা চুরির অভিযোগে পুত্র অভিযুক্ত হলে তারা হরতাল ডেকে বসে!
কথায় বলে, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা। কয়েক বছর আগে আমেরিকার এক কংগ্রেসম্যান চুরি বিদ্যায় তাঁর পরীক্ষিত দক্ষতা সত্ত্বেও ধরা পড়ে যান, মুখ্যত দুর্নীতিবিরোধী সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতায়। ভদ্রলোকের নাম উইলিয়াম জেফারসন, লুইজিয়ানা থেকে নির্বাচিত ডেমোক্রেটিক দলীয় কংগ্রেস সদস্য। পরপর নয়বার তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। জেফারসন তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এখান থেকে, সেখান থেকে টাকা হাতাচ্ছেন, এই সন্দেহে এফবিআইয়ের একটি বিশেষ দল ২০০৬ সালে তাঁর দপ্তরে অতর্কিতে তল্লাশি চালায়। তার আগে এফবিআইয়ের পরামর্শে নাইজেরিয়ার একজন ব্যবসায়ী জেফারসনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কংগ্রেসম্যান তাঁকে ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ চেয়ে বসেন। সে সময় কড়কড়ে নোটের এক লাখ ডলার পকেটস্থ করেন জেফারসন। তিনি অবশ্য জানতেন না নাইজেরীয় ব্যবসায়ীটির সঙ্গে টেপ রেকর্ডার ছিল, ফলে তাঁদের দুজনের তাবৎ কথা রেকর্ড হয়ে যায়। সেই প্রমাণ বগলে নিয়ে এফবিআই জেফারসনের দপ্তরে এসে দেখে, ভদ্রলোক ঘুষ নেওয়া অর্থের ৯০ হাজার ডলার তাঁর রেফ্রিজারেটরে লুকিয়ে রেখেছেন। আদালতে এ নিয়ে বিচার শুরু হলে জেফারসনের আইনজীবী যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন, আফ্রিকায় বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াতে তিনি নিয়মমাফিক ‘ফি’ নিয়েছেন মাত্র। কিন্তু সে ‘ফি’ ফ্রিজে লুকিয়ে রাখতে হবে কেন, এমন প্রশ্নের জবাব আইনজীবী দিতে পারেননি। বিচারে কংগ্রেসম্যান ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
আমাদের দেশে দুর্নীতির অভিযোগে ওপরতলার কেউ কেউ অভিযুক্ত হয়েছেন, তা আমরা জানি। কিন্তু তাঁরা জেলের ঘানি টানছেন, তার খুব বেশি নজির নেই। এর একটা কারণ আমরা, দেশের সাধারণ মানুষ, ধরেই নিই যে ক্ষমতাবান মানুষ দুর্নীতি করবে। এ নিয়ে তীব্র কোনো ক্ষোভ, তীব্র প্রতিবাদ করার প্রয়োজন আমরা দেখি না। ওপর থেকে যে দুর্নীতির শুরু, চুইয়ে চুইয়ে তা নিচের দিকেও গড়ায়। স্কুলের চেয়ারম্যান, পাড়ার দারোগা, তহশিলদার, উপজেলা চেয়ারম্যান—সবাই নির্বিঘ্নে চুরি করছেন। এঁদের কেউ কেউ আবার বছর বছর পুনর্নির্বাচিত হয়ে আসছেন, আমাদেরই ভোটে। দুর্নীতির অভিযোগে আমাদের এক প্রেসিডেন্ট ‘বিশ্ব বেহায়া’ উপাধি পেয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোক এখনো আমাদের দেশের একজন অতিজনপ্রিয় নেতা ও সংসদ সদস্য। অর্থ কেলেঙ্কারির পর রেল মন্ত্রণালয় হারিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কিছুদিন চুপ করে থেকে আবার ঘোষণা দিয়েছেন রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের।
দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয় সে দেশের নেতাদের কার্যকলাপে। কিন্তু সেই নেতাদের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা সীমিত আকারে হলেও থাকে সে দেশের মানুষের হাতে। দুর্নীতি দূর করতে চাইলে দুর্নীতিকে ঘৃণা করা শিখতে হবে, দুর্নীতিবাজকে ছুড়ে ফেলার সাহস অর্জন করতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ এক নাটকে একবার পোষা পাখিকে বলতে শিখিয়েছিলেন ‘তুই রাজাকার’। আসুন, দুর্নীতিবাজকে দেখে আমরাও বলতে শিখি, ‘তুই দুর্নীতিবাজ।’

৩.
এই গল্পটা আমি আগে একবার বলেছিলাম। কিছুটা বদলে তা আরেকবার বলার লোভ সামলাতে পারছি না।
ক্লাস ফাইভের বাবুলের খুব ইচ্ছা একটা ডিজিটাল ক্যামেরা। কিন্তু তার জন্য চাই কম করে হলেও ১০ হাজার টাকা। কে দেবে সে টাকা? বাবা উপদেশ দিলেন, ঈশ্বরের কাছে চাও, তিনিই দেবেন। পরামর্শমোতাবেক বাবুল খুব যত্ন করে ঈশ্বরের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে আবেদন করল, তিনি যেন অনুগ্রহ করে তার জন্য হাজার দশেক টাকা পাঠিয়ে দেন। ঈশ্বরের নামে পাঠানো পোস্ট কার্ডে লেখা সে চিঠি পোস্ট মাস্টার পড়ে ভাবলেন, ঈশ্বরের কাছে তো আর চিঠি পাঠানো যাবে না। তার চেয়ে বরং শিশুকল্যাণমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দিই, সেখানে মন্ত্রী বা তাঁর লোকজন ঠিক ঠিক জবাব পাঠিয়ে দেবেন। যথারীতি সে চিঠি মন্ত্রণালয়ে গেলে কয়েক হাত ঘুরে তা পৌঁছাল মন্ত্রীর টেবিলে। চিঠি পড়ে খুব মজা পেয়ে মন্ত্রী নির্দেশ দিলেন, বাবুলের জন্য সৌজন্য উপহার হিসেবে শখানেক টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হোক। সময়মতো বাবুলের হাতে ১০০ টাকার কড়কড়ে একটি নোট এসে হাজির। আনন্দিত বাবুল তখন ঈশ্বরের উদ্দেশে লিখল, ‘ঈশ্বর, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ টাকা পাঠানোর জন্য। আমি জানি আপনি ১০ হাজার টাকাই পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু মন্ত্রীর অফিস হয়ে সে টাকা পাঠানোর সময় তারা সব টাকা নিজেরা হাতিয়ে নিয়ে আমার জন্য মাত্র ১০০ টাকা পাঠিয়েছে। এরপর টাকা পাঠালে, প্লিজ, তা সরাসরি আমার ঠিকানায় পাঠাবেন।’
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.