শ্রদ্ধাঞ্জলি-বিপ্লবী রবি নিয়োগীর জন্ম দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি by রতন সিদ্দিকী

আজ ১৬ বৈশাখ। ২৯ এপ্রিল। অগ্নিযুগের বিপ্লবী আজীবন সংগ্রামী কমরেড রবি নিয়োগীর এক শত অথবা এক শত একতম জন্মবার্ষিকী। ১৯১০ বা ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে তিনি শেরপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরেই তিনি অতিবাহিত করেন তাঁর আনন্দময় শৈশব, দুরন্ত যৌবন, বার্ধক্যসহ কারামুক্ত সমগ্র জীবন।


দীর্ঘ কারাবাসে নির্যাতিত, ত্যাগী বিপ্লবী রবি নিয়োগী ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে শেরপুরের জিকেপিএম ইনস্টিটিউট থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হন। এ সময় কলেজ ছাত্রদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা প্রবল হয়েছিল। তা হলো শরীরচর্চা ও কুস্তির অনুশীলন করা। রবি নিয়োগী ময়মনসিংহ শহরে শরীরচর্চা করা ও কুস্তি শেখার কেন্দ্রে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন কেন্দ্রে গিয়ে কুস্তি করতেন। এখানে কুস্তি করতে করতে পরিচয় হয় ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের গুপ্ত সংগঠন যুগান্তর সমিতির সদস্যদের সঙ্গে। ফলে ময়নসিংহ শহর তাঁর লেখাপড়ার কেন্দ্র থাকল না। একসময় হয়ে উঠল রাজনীতিচর্চার কেন্দ্র। যে ধীরেন সেনের আখড়াই ছিল কুস্তির কেন্দ্র তা হয়ে গেল ব্রিটিশ শাসন উত্খাতের গোপন পরামর্শ কেন্দ্র। এখানেই তিনি দীক্ষিত হন সর্বোচ্চ ত্যাগের মন্ত্রে গড়ে ওঠা গুপ্ত বিপ্লবী দল যুগান্তর সমিতির আদর্শে। বিপ্লববাদী ধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার কারণে ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত রবি নিয়োগী তখন বাধ্য হয়ে চলে যান কলকাতায়। ভর্তি হন বিদ্যাসাগর কলেজে।
কলকাতায় বসবাস করার সুবাধে যুগান্তর সমিতির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি যোগাযোগ রক্ষা ও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পান। এখানে তিনি পরিচিত হন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রসিদ্ধ নেতাদের সঙ্গে। সান্নিধ্য লাভ করেন সুরেন্দ্রনাথ ঘোষ, জীবন চ্যাটার্জির মতো সশস্ত্র বিপ্লবীদের। দলের নিয়মিত বৈঠকে অংশগ্রহণ, প্রাত্যহিক কাজ এবং অগ্রজ ত্যাগী বিপ্লবীদের সাহচর্য ও সান্নিধ্য তাঁকে খাঁটি বিপ্লবীতে রূপান্তর করে। তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করে, ভোগ-সুখ ও কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে, চরম বিপজ্জনক অভিযানে নিঃশেষে জীবন উত্সর্গ করার মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই যুগান্তরের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
এই আত্মনিবেদিত বিপ্লবীর কলেজে লেখাপড়া করা হলো না। মনে হলো যে জাতি পরাধীন, শৃঙ্খলিত, সে জাতির একজন হয়ে লেখাপড়া করে ব্যক্তিগত সুখে মগ্ন থাকায় আনন্দ নেই। ভোগে তৃপ্তি নেই। পরম শান্তি দেশের জন্য জীবন উত্সর্গ করার মধ্যে। তাই রবি নিয়োগী পরীক্ষা দিলেন না। ফিরে এলেন জন্মভূমি শেরপুরে। শুরু করলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতি। জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেশের স্বার্থে নেমে পড়লেন পথে।
শেরপুরে এসে সংগঠিত করতে লাগলেন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন। যুক্ত হলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনে। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে সে কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো। সেই তাঁর প্রথম কারাবাস। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে তিনি কারাগারে থেকেছেন জীবনের ৩৪টি বছর। বস্তুত রবি নিয়োগী আনন্দমোহন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থা থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। এর ফলে তিনি বারবার মামলায় পড়েছেন। কারারুদ্ধ হয়েছেন। তিনি আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে বন্দি থেকেছেন। কালাপানি নামে খ্যাত ওই জেলে থেকে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তিনি আন্দামান থেকে প্রেরিত হন কলকাতার আলিপুর জেলে। পরে সেখান থেকে যান ময়মনসিংহ কারাগারে। মেয়াদান্তে একসময় মুক্তি পান কিন্তু মুক্তিপ্রাপ্তির পরদিনই আবার গ্রেপ্তার হন এবং দিনাজপুর কারাগারে বন্দী থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুই বছর নিজগৃহে অন্তরীণ থেকেছেন। পাকিস্তান শাসনামলসহ বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু সরকারের আমল ছাড়া আর প্রায় সব সরকারই তাঁকে কারারুদ্ধ করেছিল। বলা যায় একসময় কারাগারই ছিল তার স্থায়ী ঠিকানা।
উল্লেখ্য, অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা স্বামী বিবেকানন্দের ত্যাগ ও সেবার আদর্শ দ্বারা এবং গীতার ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত নিষ্কাম কর্মের ধারণা দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু এ বিপ্লবীরা যখন মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন তখন তাঁরা এমন এক সমাজ পদ্ধতির কথা ভেবেছেন যেখানে মানুষ অন্যের উদ্দেশ্য সাধনের যন্ত্র হয়ে কিংবা করুণার বা সেবার পাত্র হয়ে থাকবে না। দরিদ্র নারায়ণ ধারণা থেকে তাঁরা বেরিয়ে আসেন। তাঁরা ফলাকাঙ্ক্ষার বা ফল অর্জনের পূর্ণ স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করেছেন। গুপ্ত সমিতির বিপ্লবীদের মতো কমিউনিস্ট পার্টিতে সংসার করার নিয়ম রুদ্ধ ছিল না। অনুমতির প্রয়োজন ছিল মাত্র। তিনি অনুমতি নিয়ে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে জ্যোত্স্না রানী মজুমদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পরপরই আবার কারারুদ্ধ হন। এরপর যত সংগ্রাম—সব স্বামী-স্ত্রী দুজনে একসঙ্গে।
১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের নিখিল ভারত কৃষক সভার ঐতিহাসিক সম্মেলন, তেভাগা আন্দোলন, টঙ্ক প্রথাবিরোধী আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের সংগ্রামসহ মেহনতি মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। যার কারণে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। তিনি সব নির্যাতন সহ্য করেই সমাজ বদলের সংগ্রাম করেছেন।
রবি নিয়োগী খুদে জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েও বসবাস করেছেন সাধারণ মানুষের মতো। আজীবন থেকেছেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। স্বীয় বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিরানব্বই ছুঁয়ে ছিলেন। এমন দীর্ঘ বিশ্বাসী মানুষের বড় অভাব এখন। এমন পরচিন্তায় ক্লিষ্ট মানুষের খুব আকাল এখন। তাই তাঁর জন্ম দিবসে প্রত্যাশা করি দেশ ও জাতির স্বার্থে অসংখ্য রবি নিয়োগীর। জানাই তঁকে লাল সালাম। বিপ্লবী রবি নিয়োগী লাল সালাম।

No comments

Powered by Blogger.