প্রধানমন্ত্রীও শঙ্কিত - খালেদার ছোবল মারাত্মক'

প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ১২ মার্চের 'চলো চলো ঢাকা চলো' কর্মসূচি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি সহিংস ঘটনার জন্ম দেবে আশঙ্কা ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা কিভাবে দেবে, সেটা নিয়ে তিনি চিন্তিত।


গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে কুমিল্লা জেলার (উত্তর) তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার প্রারম্ভিক বক্তব্যে শেখ হাসিনা তাঁর এ শঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার কথা ও কাজে মিল নেই অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার কথা ও কাজে কোনো মিল নেই। তিনি মুখে বলেন এক, করেন আরেক। তিনি শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি যে কী অশান্তি সৃষ্টি করবেন তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। কিভাবে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেব তা নিয়ে চিন্তিত।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'খালেদা জিয়ার ছোবল যে কত মারাত্মক, তা ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে টের পেয়েছি। দেশের মানুষ শান্তিতে থাকলে তিনি অশান্তিতে ভোগেন।' মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব- এমন মন্তব্য করে শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে দলীয় নেতা-কর্মীসহ সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) কাছ থেকে খালেদা জিয়া পাঁচ কোটি রুপি নিয়েছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে যখন টাকা নিয়েছেন '৯৬ সালেও নিয়েছেন। আশা করি, এ তথ্য ভবিষ্যতে বের হবে। তাঁরা ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আরো বেশি টাকা এনেছেন।'
শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, 'খালেদা জিয়া পরাজিত শক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার মতো লজ্জা ও ঘৃণার কাজ করে যাচ্ছেন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের টাকা খেয়ে দালালি করে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বিএনপি। পরাজিত শক্তির পদলেহন করার চরিত্র দলটির এখনো বদলায়নি।' শেখ হাসিনা বলেন, 'যারা টাকা নিয়ে আরেক দেশের দালালি করছে তাদের সেই দেশে প্যাক করে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত।'
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, 'বিরোধীদলীয় নেত্রী এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেন। অথচ কিছুদিন আগেই তিনি এ ব্যবস্থা বুঝতেন না, জানতেন না। পাগল ও শিশু ছাড়া দেশের আর নাকি কেউ নিরপেক্ষ নন, তাও বলেছেন।' তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, 'বিরোধীদলীয় নেত্রী এখন কোথায় শিশু খুঁজে পেলেন? কোন পাগলকে বসাতে চান? তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলেই তাঁকে (খালেদা জিয়া) কোলে তুলে ক্ষমতায় বসাবে না।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'ভোট চুরি করে ক্ষমতায় বসাবেন এমন পরিকল্পনা থেকেই খালেদা জিয়া তাঁর প্রিয় ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনদের এনেছিলেন। কিন্তু ইয়েসউদ্দিনও তাঁর কথা রাখেননি। তাঁর প্রিয় এই তিন ব্যক্তি তাঁকে (খালেদা) জেলে পুরেছেন, দুই ছেলেকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছেন।'
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, 'তিন মাসের জন্য ক্ষমতায় এসে ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতার লোভ পেয়ে বসে। তিন মাসের জায়গায় কাটাল দুই বছর। ক্ষমতায় যেন গ্লু দিয়ে লাগানো ছিল- আর ওঠে না।'
২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তে সেই সময়কার নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০০১ সালের পর বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নির্যাতিতরা মামলা করলে সরকার থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরবর্তী ইতিহাস বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, 'ওই নির্বাচনে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে আমি হাত মেলাইনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর লোভে খালেদা জিয়াই জামায়াতের সমর্থন নিয়ে ওই সময় সরকার গঠন করেছিল।'
সেনাবাহিনীর অফিসার হত্যা, স্বাধীনতার মূল চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করা এবং যুদ্ধাপরাধীদের দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান যে পরিমাণ সামরিক ও বিমান বাহিনীর অফিসারকে হত্যা করেছেন এত অফিসার স্বাধীনতাযুদ্ধেও নিহত হননি।
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা সারা দেশে সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া প্রতিটি এলাকায় নতুন সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেন। দলের জাতীয় কাউন্সিল দ্রুত হবে বলেও নেতা-কর্মীদের জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর কুমিল্লা (উত্তর) জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল আওয়াল সরকার উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। জেলার সাংগঠনিক প্রতিবেদন তুলে ধরেন সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সতীশ চন্দ্র রায়, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান, আবদুল মতিন খসরু, মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভুঁইয়া, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, হাবিবুর রহমান সিরাজ, মৃণাল কান্তি দাস, ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা, সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ।

No comments

Powered by Blogger.