চরাচর-বন ছাড়ছে বনের প্রাণী by আবদুল হামিদ মাহবুব

জেলাপর্যায়ের একটি সভায় পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, 'একটি হরিণের মাংসই হয় পাঁচ-ছয় কেজি। এ থেকে প্রভাবশালীরা আর কতটুকুই বা পান!' গত এপ্রিলে দুই দিনে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় তিনটি মায়া হরিণ মানুষের হাতে বধ হয়েছে।


একদিকে নিবিড় বনাঞ্চল ধ্বংস এবং বনে জনসাধারণের অবাধ প্রবেশ, অন্যদিকে বনে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় বন্য প্রাণীরা বন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১৪ এপ্রিল ভোরে কমলগঞ্জের কালাছড়া বন বিটের গভীর জঙ্গল থেকে একটি মায়া হরিণ বেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসে। কিছু মানুষ হরিণটিকে তাড়িয়ে ধলাই নদীতে ফেলে ধরে। পরে হরিণটি জবাই করে মাংস ভাগাভাগি করে নেয়। গত ১৫ এপ্রিল এ উপজেলারই আদমপুর বন বিট এলাকা থেকে অপর একটি মায়া হরিণ লোকালয়ে বেরিয়ে এলে মধ্যভাগ গ্রামের কিছু লোক হরিণটি জবাই করে। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় লোকজন জবাইকৃত হরিণটি না কেটে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে আদমপুর বন বিট কর্মকর্তা মধ্যভাগ গ্রামের মারিয়া বেগমের বাড়ি থেকে জবাইকৃত মায়া হরিণটি উদ্ধার করে কমলগঞ্জের রাজকান্দি বন রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। গত ৯ এপ্রিল কুরমা বন বিট এলাকার মখাবিল গ্রাম থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা মায়া হরিণটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় রাজকান্দি বন রেঞ্জ কার্যালয়ে মারা যায়। এর আগে ২৫ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের বড়লেখার পানিধার এলাকায় একটি মায়া হরিণ এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ে। পরদিন ২৬ জানুয়ারি ঘোলষা এলাকায় খাদ্যের অন্বেষণে আসা একটি মেছোবাঘ ধরা পড়ে এলাকাবাসীর পাতা ফাঁদে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি চান্দেরগুল এলাকায় একইভাবে খাদ্যের খোঁজে আসা একটি মেছোবাঘ ছাগল দিয়ে তৈরি ফাঁদে আটকা পড়ে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বড়লেখা পৌর এলাকার মহবন্দ এলাকায় জনসাধারণ তাড়া করে একটি মায়া হরিণ আটক করে। বন বিভাগ এগুলো উদ্ধার করে মাধবকুণ্ড এলাকার বনে অবমুক্ত করেছে। বন বিভাগের মৌলভীবাজার বিট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত কয়েক মাসে জনসাধারণের হাতে আটক একটি মেছোবাঘ ও তিনটি মেছোবাঘের বাচ্চা, একটি সারস, ১০টি ঘুঘু পাখি, তিনটি লক্ষ্মীপেঁচা উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলা শহরের ফ্লাওয়ার্স কেজি অ্যান্ড হাই স্কুল থেকে একটি লক্ষ্মীপেঁচা উদ্ধার করা হয়। লক্ষ্মীপেঁচাটি অসুস্থ ছিল। বন বিভাগ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। একপর্যায়ে লক্ষ্মীপেঁচাটি মারা যায়। এ ছাড়া গত বছরের ২৮ আগস্ট মৌলভীবাজার শহরের সড়ক ও জনপথ বিভাগের কার্যালয়ের কাছে একটি কড়ই গাছে চশমা পরা তিনটি বিলুপ্তপ্রায় হনমুান এসে আশ্রয় নেয়। পরে বন বিভাগ হনুমানগুলোকে পাহারা দিয়ে আবার বনে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। ওই বছরের ৭ মে মৌলভীবাজার শহরতলির বর্ষিজোরা এলাকায় লোকজন তাড়া করে একটি মায়া হরিণ আটক করে। এতে মায়া হরিণটি আহত হলে চিকিৎসার একপর্যায়ে সেটি মারা গেছে। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, 'বন্য প্রাণীর বাইরে আসার বড় কারণ বন-জঙ্গল কমে গেছে। খাদ্যের অভাবই বেশি। মনে হয় খাদ্যের খোঁজেই এসব প্রাণী বাইরে বেরিয়ে আসে। আগে বনে ফলের গাছ থাকত, এখন শাল-সেগুনে ভর্তি। ফলের গাছ নেই।' সর্বশেষ গত ২ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার গাজীপুর বড়ছড়া এলাকায় মানুষের হাতে ধরা পড়েছে প্রায় তিন ফুট লম্বা একটি বনরুই। এর আগে ২৯ এপ্রিল কুলাউড়ার পৃথি্বমপাশা ইউনিয়নের কলিরকোনা গ্রামে একটি বনরুই ধরা পড়েছিল।
আবদুল হামিদ মাহবুব

No comments

Powered by Blogger.