চার অধিনায়কের গল্প by আরিফুল ইসলাম

স্টার ক্রিকেটের বিশেষজ্ঞ আলোচনায় প্রশ্নটি তুলেছিলেন সঞ্জয় মাঞ্জরেকার। মহেন্দ্র সিং ধোনি যদি ‘ক্যাপ্টেন কুল’ হন, তাহলে মাহেলা জয়াবর্ধনেকে কী বলা যায়, ‘সুপার কুল?’ অধিনায়কত্ব কেমন হওয়া উচিত, এটার আদর্শ একটা ডকুমেন্টারি হতে পারে হোবার্টের ওই ম্যাচটি। সিবি সিরিজের শেষ গ্রুপ ম্যাচ।


ব্যাটিং উইকেটে ২৩৯ রানের একটা মাঝারি পুঁজি ছিল সেদিন শ্রীলঙ্কার। এর মধ্যেই চোট নিয়ে মাঠ ছাড়লেন দুই বোলিং অস্ত্র থিসারা পেরেরা ও অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো বোলার দিলশানের আঙুলে ব্যান্ডেজ। বাঁচা-মরার লড়াইয়ে যেকোনো অধিনায়কের মাথা খারাপ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জয়াবর্ধনে কী করলেন? নিয়তির কাছে হার মানার সহজ রাস্তায় না গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন যা আছে তা-ই নিয়ে। চাঙা রাখলেন সতীর্থ, হারানো মহাস্ত্রের জন্য হাহুতাশ না করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দারুণ বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহার করলেন হাতে থাকা অস্ত্রগুলোকে, উজ্জীবিত বোলিং-ফিল্ডিংয়ে ১৫ রানে জিতে শ্রীলঙ্কা উঠে গেল ফাইনালে। জয়াবর্ধনে ‘সুপার কুল’!
অথচ ক্রিকেট বিশ্বে ‘সুপার কুল’ বললে সবার আগে ভেসে ওঠে মিসবাহ-উল হকের ছবিটাই। একজন ক্রিকেটারের ব্যাটিং-অধিনায়কত্ব-ব্যক্তিত্ব-জীবনদর্শন—সবকিছুই যে একই রকম হতে পারে, মিসবাহ এর আশ্চর্য উদাহরণ। মিসবাহ মানেই যেন শান্ত এক জলধারা। মাঠের ভেতরে-বাইরে প্রতিটি পদক্ষেপে যাঁর শেষ কথা—স্থৈর্য!
মুশফিকুর রহিমের অধিনায়ক-জীবনে এখনো শৈশবকাল। মাত্রই দুটি সিরিজ হলো, তাঁর নেতৃত্বকে কোনো একটা ছাঁচে ফেলার মতো সময় এখনো সম্ভবত হয়নি। তবে এই দুই সিরিজ, সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্বের ধরনটার সঙ্গেও ওই ‘কুল’ শব্দটা খুব যায়। সব মিলিয়ে যা দাঁড়াল, এশিয়া কাপের চার অধিনায়ক, মানে এশিয়ার চার টেস্ট খেলুড়ে দেশের অধিনায়কেরই মূল গুণ বা বৈশিষ্ট্য কিন্তু একই—‘কুল’, ধীর-স্থির!
তবে মূল বৈশিষ্ট্যের বাইরে অবশ্যই নেতৃত্বের আলাদা ধরন আছে চারজনেরই। অধিনায়ক ধোনি যেন ‘মিডাস টাচ’ নিয়ে এসেছিলেন। যেখানে হাত দিয়েছেন, সোনা হয়ে যাচ্ছিল সেটাই। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ে শুরু। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় সিবি সিরিজ জয়, ভারতকে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে তোলা...দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়। বৃহত্তর এই ছবির ভেতরে ছিল টুকরো টুকরো ছবি। হয়তো অভাবনীয় কোনো বোলিং পরিবর্তন, নাটকীয়ভাবে ব্যাটিং অর্ডারে কাউকে ওপরে তোলা বা নিচে নামিয়ে দেওয়া, অস্বাভাবিক কোনো ফিল্ডিং পজিশন—কেউ ভাবতেই পারেনি, এমন কিছু করে ফেলা। বেশির ভাগ সময়ই দারুণভাবে কাজে লেগে যেত এ ধরনের ফাটকা। শুরুতে সবাই মনে করত, এটা ধোনির সৌভাগ্য। কিন্তু একই জিনিস দিনের পর দিন হতে থাকলে কি আর তা বলা যায়! এসব হয়ে গেল তাই ধোনির ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্কের প্রমাণ। সঙ্গে ব্যাট হাতে সাফল্য মিলিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলী পর্যন্ত গত বিশ্বকাপের পর রায় দিয়ে দিলেন, ‘ভারতের ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক ধোনি।’
তবে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই যেন ওই ‘মিডাস টাচ’ হারিয়ে ফেলেছেন ধোনি। ধোনির
অধিনায়কত্বে সবচেয়ে বড় উপাদান ছিল রোমাঞ্চ। কিন্তু ‘সব’ পেয়ে যাওয়ার কারণেই কিনা, রোমাঞ্চকর ওই ধোনি ইদানীং বড়ই একঘেয়ে। ঝুঁকি নিতে যেন এক শ বার ভাবেন। গৎবাঁধা চিত্রনাট্যের বাইরে যেতে ভীষণ আপত্তি। দলের সাফল্যের ধারাতেই তাই পড়েছে ছেদ। অনেকে বলতে পারেন, দল ব্যর্থ হচ্ছে বলেই এমনটা মনে হচ্ছে। আদতে দুটোই এসেছে হাত ধরাধরি করে। ভারতের সাফল্যের জন্য রোমাঞ্চপ্রিয় ধোনির ফিরে আসা বড্ড প্রয়োজন।
কৌশল বা রোমাঞ্চ, কোনোটিতেই কখনো খুব একটা আগ্রহী মনে হয়নি মিসবাহকে। সহজাত নেতা তিনি কখনোই ছিলেন না, ক্যারিয়ার গোধূলিতে অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন আসলে বিকল্পের অভাবে। পাকিস্তানের সঙ্গে বেমানান রকম ধীর-স্থির আর নিষ্কলুষ ভাবমূর্তিরও একটা ভূমিকা ছিল। হয়তো ব্যতিক্রম বলেই দলকে একসূত্রে গাঁথতে পেরেছেন, পাকিস্তান ক্রিকেটে যেটার প্রয়োজনই ছিল সবচেয়ে বেশি। সাফল্যও তাই ধরা দিয়েছে। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় খুব একটা পাওয়া যায়নি। নিজে থেকে কোনো কিছু করার চেয়ে তিনি অপেক্ষা করেন কিছু হয়ে যাওয়ার জন্য। টেস্টের চেয়ে তুলনায় ওয়ানডেতে সাফল্যও তাই কমই এসেছে।
মুশফিকের নেতৃত্ব বিচারগুণের সময় এখনো আসেনি। তবে বাংলাদেশ অধিনায়ককে খানিকটা মেলানো যায় মিসবাহর সঙ্গে। ধীর-স্থির আর অনেকটা নিষ্কলুষ, মিসবাহর মতো মুশফিককেও অধিনায়ক করার ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য ছিল এটাই। মাঠের ভেতর প্রভাববিস্তারী, কৌশলী কিংবা নাটকীয় কোনো সিদ্ধান্তের প্রমাণ এখনো রাখতে পারেননি। তবে রোমাঞ্চকর অভিযানে নামার মতো অস্ত্রই বা তাঁর হাতে কোথায়! হাতে নেই যথেষ্ট মারণাস্ত্র, মাঠের বাইরে আবার হাজারো চাপ। মুশফিককে তাই ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য শুধু শুভকামনাই করা যায়।
অধিনায়কত্বের প্রথম মেয়াদেও দারুণ সফল ছিলেন জয়াবর্ধনে। ইচ্ছা না থাকলেও দ্বিতীয় দফায় অধিনায়ক হতে বাধ্য হয়েছেন দলের প্রয়োজনে। তবে প্রতিনিয়তই প্রমাণ করে যাচ্ছেন তিনি জাত অধিনায়ক। একবার ভেবে দেখুন, টানা হারে বিপর্যস্ত, দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এক দলকে সিবি সিরিজে কী দারুণভাবেই না নেতৃত্ব দিলেন! মাঠের ভেতরে-বাইরে দলকে চাঙা রাখার পাশাপাশি ক্রিকেটীয় কৌশল, ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া আর ভুল থেকে দ্রুত শিক্ষা নেওয়া মিলিয়ে জয়াবর্ধনে যেন আদর্শ অধিনায়কের প্রতিচ্ছবি। রোবোটিক ক্রিকেটের এই যুগে এক ঝলক মুক্ত বাতাসও!

No comments

Powered by Blogger.