গন্তব্য ঢাকা-মনের কোণে গ্রামে ফেরার স্বপ্ন by শর্মিলা সিনড্রেলা

ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষগুলো বোধ হয় প্রকৃতির প্রতি টানটা আরও বেশি অনুভব করে। প্রকৃতিকে তেমন করে কাছে পাওয়া হয়ে ওঠে না তো কারও, তা-ই। মিজানুর রহমান জুয়েলেরও প্রকৃতি ছাড়া ভালো লাগে না। গাছপালা লাগানো, সেই গাছের যত্ন করা বা গাছের ছায়ায় বসে একটু অবকাশ পাওয়া—সবই তাঁর কাছে অনেক ভালো লাগার।


কিন্তু এই ঢাকা শহরে তেমন করে প্রকৃতিকে পাওয়ার সুযোগ কোথায়? তবু ভালো যে তিনি এমন একটা কাজ করেন, যেখানে গাছের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতে হয়। তিনি বলেন, ‘কাজটি করে বেশ মজা পাই। গাছ নিয়েই সারা দিন ব্যস্ত থাকি। চারপাশে সবুজের সমারোহ নিয়ে দিন কাটাই।’ সিটি করপোরেশন এবং একটি বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়ে রাস্তার পাশে বাড়ির লাগোয়া একটু জায়গায় গাছের চারা বিক্রি করেন জুয়েল।
তখন সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন জুয়েল। একাজ-সেকাজ করতে করতে একসময় জড়িয়ে পড়লেন রাজনীতিতে। নিয়মিত যাতায়াত ছিল মিছিল-মিটিং, আলোচনা-সমালোচনায়। কখনো কখনো হয়তো একটু-আধটু ঝামেলাও হয়ে যেত কারও কারও সঙ্গে। মা-বাবা তো চিন্তায় অস্থির। অবশেষে তাঁরা যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। ঢাকাতেই থাকতেন জুয়েলের বোন ও বোনজামাই। তাঁদের কাছে জুয়েলকে পাঠিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য, ছেলে সাঙ্গপাঙ্গ থেকে দূরে থাকলে ভালো থাকবে। ব্যস, পাঠিয়ে দিলেন ঢাকায়। বোনের জামাইয়ের ছিল নার্সারির ব্যবসা। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে করতে একসময় ভালো লেগে যায় এই কাজ। তখন নিজেই আলাদা করে নিজের ব্যবসা নিয়ে বসেন।
সে ঘটনাও আজ থেকে ১০ বছর আগের। জুয়েল বলেন, ‘যখন গ্রাম থেকে ঢাকায় আসি, তখন প্রথমেই ঢাকাকে ভালো লেগেছে। আর এখন যতই দিন যাচ্ছে, ততই ঢাকায় বিরক্ত হয়ে উঠছি। আমি থাকি পাশেই। অল্প একটু পথ, তবু আসতেই আমার অনেক সময় লেগে যায়। কোনো জরুরি কাজে যেতে হলেও অর্ধেক দিন শেষ। গ্রামে তো আর সেই ঝামেলা নেই।’ গ্রামের কথা খুব মনে পড়ে জুয়েলের। মনে পড়ে সেসব স্মৃতি। তিনি আরও বলেন, ‘একবার হয়েছিল কি, বন্ধু রাহাতের সাথে চলে গেছি জ্যাতা (জ্যান্ত) ইলিশ দেখব বলে। সারা দিন মেঘনা নদীতে জেলেদের সাথে কাটিয়ে জ্যাতা ইলিশ দেখে তবেই এক দিন পর বাড়ি ফিরেছি। অনেক খুশি হয়েছি তখন। এখন আর সেসব দিন কোথায় পাব?’
‘গ্রামে যান না?’ প্রশ্ন শুনেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে জবাব দেন, ‘আরে কী বলেন, গ্রামে যাব না! সময়ের অভাবের জন্য কখনো ছয় মাস পর যাই, আবার কখনো আরও দেরি হয়। কিন্তু গ্রামে কি না গিয়ে থাকা যাবে?’
হ্যাঁ, তাই তো, গ্রামে না গেলে কি চলে? মাগুরার বাপ্তা গ্রামেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জুয়েলের যত স্মৃতি। আছেন মা, আছে ভাইবোনেরা। তাঁদের স্মৃতি তো প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় তাঁকে। সে সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি প্রিয় মুখ। সেই প্রিয় মুখ স্ত্রী হাফছার। জুয়েল যোগ করেন, ‘মাত্র দেড় মাস হলো বিয়ে করেছি। এখন আর ছয় মাস ঢাকায় থাকা সম্ভব হবে না। তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে। ভাবছি, হাফছাকেও ঢাকায় নিয়ে আসব। যতই ঢাকার সবকিছু নিয়ে বিরক্ত হই, আমি এক জায়গায় আর সে এক জায়গায়—সেটা তো সম্ভব নয়। তাই দ্রুত ওকে নিয়ে আসব ঢাকায়।’
গুলশান-২-এর ১০৩ নম্বর রোড দিয়ে ঢুকতেই পিংক সিটি মার্কেটের পাশে দেখা হয়ে যাবে জুয়েলের সঙ্গে। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত তিনি এখানে থাকেন। নিজেই বন মন্ত্রণালয়ের একটুখানি জায়গায় গাছ উৎপাদন করেন। এরপর সেগুলো এনে এখানে বিক্রি করেন। মাস শেষে লাভের অঙ্কে জমা হয় বেশ কিছু টাকা। তাই এই ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা মাথাতেই আসে না। ‘আর গ্রামে গিয়ে হবেই বা কী? ওখানে তো কোনো ব্যবসা করার সুযোগ নেই। আগে আমাদের যে ব্যবসা ছিল, এখন গিয়ে সেটা শুরু করলে আরও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে সেই ব্যবসাকে চাঙা করতে। ঢাকায় থাকতে এখন খারাপ লাগে না। তবু গ্রামে যাওয়ার চিন্তাটা মনের কোণে ঠিকই বাসা বেঁধে থাকে।’ কথাগুলো বলতে বলতেই গাছের পরিচর্যায় আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠেন জুয়েল। তাঁর ভালোবাসা পেয়ে গাছগুলো সজীব-সতেজ হয়ে ওঠে। কে জানে, মনের কোণে স্বপ্নের ছোট্ট যে চারাটা রোপণ করেছেন, তা ডালপালা মেলে কখনো বাস্তবতা পাবে কি না?
শর্মিলা সিনড্রেলা

No comments

Powered by Blogger.