'অনার কিলিং' : আলোর পৃথিবীতে অন্ধকার উপত্যকা by লুৎফর রহমান রনো
তথাকথিত 'অনার কিলিং'-এর অপরাধে সম্প্রতি কানাডার একটি আদালত অভিবাসী একটি আফগান পরিবারকে ২৫ বছরের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন। দোষী তিনজনের- স্বামী (৫৮), স্ত্রী (৪২) ও তাঁদের ছেলে (২৫)। তাঁরা তাঁদের পরিবারের 'সম্মান' রক্ষার্থে টিনএজ তিন মেয়েকে ও লোকটির প্রথম স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন।
তাঁদের সঙ্গে সায় দিয়েছেন তাঁদের ছেলেও। মেয়েরা পরিবারের নিষেধ সত্ত্বেও কাউকে ভালোবেসেছিল, কেউ হয়তো খোলামেলা চলাফেরা করেছে ও ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এত কিছুর পরও আমরা বাংলাদেশিরা সৌভাগ্যবান যে এ খবর আমাদের সবাইকে মর্মাহত করবে এবং কেউই এমন বিকৃত অনার কিলিং বা পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে সেই প্রাচীনকালের রোমান বা আরবদের মতো নারী হত্যাকে মেনে নেবে না। অথচ এ সময় যে পাকিস্তান আমাদের সঙ্গে এক দেশরূপে ছিল, সেই পাকিস্তানে অনার কিলিং এখনো সমাজে বিরাজ করছে বৃদ্ধমূল সংস্কাররূপে। একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার (এইচআরসিপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরের মাত্র ৯ মাসে পাকিস্তানে প্রায় ৬৭৫ জন নারীকে অনার কিলিং-এর শিকারে জীবন দিতে হয়েছে।
বাঙালির সাংস্কৃতিক-মানবিক ঐতিহ্যের উচ্চতাকে ভেঙে ধর্মের বিকৃতিপ্রসূত বর্বরতা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি কখনো। অন্যদিকে ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গোষ্ঠী ও আফ্রিকার কোথাও কোথাও 'সম্মান রক্ষার্থে' নারী হত্যার মতো নৃশংসতা আজকের আলোকিত সভ্যতাকে মুখ ভেংচাচ্ছে। এসব দেশের অনেক মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে অভিবাসিত। ইংল্যান্ড, কানাডা প্রভৃতি দেশে সভ্য মানুষের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও পড়াশোনা করছে। পড়াশোনা করাচ্ছে সন্তানদের বহির্বিশ্বে। বলা ভালো, বর্তমান সভ্যতায় তুলনামূলক আলোকিত দেশগুলোয় বসবাস করেও ওসব লোকের অন্তরের অন্ধকার আজও দূর হলো না, ভাবতে অবাক লাগে, অস্বস্তি হয়।
২০০৪ সালে Dicle University-র একদল গবেষক তুরস্কের কুর্দি এলাকায় স্ট্যাডি করে দেখেছে সেখানেও অনার কিলিং হচ্ছে। যারা এই কিলিং প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ ওই সমাজের শক্তি যারা, তারা নূ্যনতম হাইস্কুল পাস, অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। দুঃখজনক নয় শুধুই, সভ্য সমাজে অবিশ্বাস্যকর নির্মমতা এটি। সম্মান রক্ষা তো তুচ্ছ অজুহাত, কোনো অজুহাতেও কি পরিবারের আপনজন, মা-বাবা সন্তানদের খুন করতে পারেন! শত শত বছর আগে পৃথিবীর কিছু কিছু জায়গার মানুষ পাশবিক জীবনযাপনের অবশিষ্ট রেশ বহন করে চলছিল। আর তারই রেশ এখনো মানুষ-সমাজে মানুষের রক্তে-মগজে অবিচল থাকবে? বিবর্তনের এত শত বাঁক-বিভঙ্গের পরেও কি ভাবা যায়?
খ্রিস্টান আরব লেখক নরমা খউরি লিখেছেন, হাজার বছর আগে প্রাচীন রোমের সংস্কৃতির প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য বা ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে মেয়েদের সতীত্ব পরিবারের সম্পত্তি। শেকসপিয়ারের লেখায় Titus Andronicus-কে হত্যা করে তার বাবা। কারণ অ্যানড্রনিকাস অন্য পুরুষের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিল। স্পার্টাকাস উপন্যাসে দেখা যায় দ্রোহী কোনো দাস দ্বারা মনিবের স্ত্রী, মেয়ে, কেউ ধর্ষিত হলে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হতো। প্রাচীন ব্যাবিলন ও মিসরের সংস্কৃতিতেও এরূপ সংস্কার দেখা যায়। নিষিদ্ধ যৌনাচারের অভিযোগে মেয়েদের বন্দি করা, পেটানো ও অঙ্গচ্ছেদ করার মতো শাস্তি দেওয়া হতো। হাজার বছর আগের মানুষের জীবন আজকের মানুষের কাছে কী নিষ্ঠুর অমানবিক দুঃস্বপ্নময় মনে হচ্ছে। অথচ ওই রেওয়াজের অস্তিত্ব বহন করছে 'সভ্য মানুষ'।
লন্ডনেও বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন অভিবাসিত হয়েছে, হচ্ছে। অনেকের দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের কাল চলছে। লন্ডনের পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর প্রায় তিন হাজার 'অনার' আঘাত ঘটেছে নারীর ওপর। এসবের মধ্যে মারধর, এসিড ছোড়া ও চূড়ান্ত পর্যায়ে খুন পর্যন্ত। দেখা যাচ্ছে, ইংল্যান্ড-কানাডার মতো দেশে থেকেও একবিংশ শতাব্দীতে নারীর জীবন নিরাপদ নয়। নারীর সতীত্বের ওপর যে পুরুষ-পরিবার বা গোষ্ঠীর সম্মান নির্ভর করে, তাকে কী বলা যায়? এসব উন্মাদনা চলছে 'মুসলিম' কিছু কিছু জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে। তারা এই অন্যায় অমানবিক হত্যাকাণ্ডকে ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে কুসংস্কারটি চালু রেখেছে। অথচ ইসলামী চিন্তাবিদ ও সুশিক্ষিত মুসলিমরা বলছেন, মূলত ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অতএব বলা যায়, ইসলাম-পূর্ব পৃথিবীর অনাচার-উপাচার-অত্যাচারের প্রথা কোনো কোনো জাতি-গোষ্ঠীর রক্তপ্রবাহে পরম্পরাগতভাবে লালিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে নারী হত্যা রোধে ক্রিমিনাল ল (অ্যামেন্ডমেন্ট) ২০০৪ নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়েছে, যদিও আইনটি দুর্বল। অপরাধীর শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কা কম বলে পিপলস পার্টি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবাদ করেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও নির্দেশ দিয়েছেন এই অবিচার রোধ করার জন্য। কোনো রাজ্যের প্রশাসন তা রোধ করতে ব্যর্থ হলে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির শাস্তি হবে বলা হয়েছে। যদি তা-ই হয়, অর্থাৎ দুর্বল আইনের মাধ্যমে খুনের মতো অপরাধকে আইনের ছদ্মাবরণে জিইয়ে রাখার শামিল। এ সত্যটি পাকিস্তানসহ অন্যদেরও উপলব্ধি করা উচিত। একসময় ভারতে সতীদাহ প্রথা ছিল অনুরূপ ধর্মীয় আবরণে নিষ্ঠুর খুনের প্রথা। এখন প্রায় বিলুপ্ত। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহকে নারীর অধিকাররূপে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছিলেন। নিজের ছেলেকে বিধবার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। আহা! এমন মহামানুষের আবির্ভাব ঘটুক পৃথিবীর এসব নারী বলির অন্ধকার উপত্যকায়।
লেখক : সাংবাদিক
বাঙালির সাংস্কৃতিক-মানবিক ঐতিহ্যের উচ্চতাকে ভেঙে ধর্মের বিকৃতিপ্রসূত বর্বরতা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি কখনো। অন্যদিকে ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গোষ্ঠী ও আফ্রিকার কোথাও কোথাও 'সম্মান রক্ষার্থে' নারী হত্যার মতো নৃশংসতা আজকের আলোকিত সভ্যতাকে মুখ ভেংচাচ্ছে। এসব দেশের অনেক মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে অভিবাসিত। ইংল্যান্ড, কানাডা প্রভৃতি দেশে সভ্য মানুষের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও পড়াশোনা করছে। পড়াশোনা করাচ্ছে সন্তানদের বহির্বিশ্বে। বলা ভালো, বর্তমান সভ্যতায় তুলনামূলক আলোকিত দেশগুলোয় বসবাস করেও ওসব লোকের অন্তরের অন্ধকার আজও দূর হলো না, ভাবতে অবাক লাগে, অস্বস্তি হয়।
২০০৪ সালে Dicle University-র একদল গবেষক তুরস্কের কুর্দি এলাকায় স্ট্যাডি করে দেখেছে সেখানেও অনার কিলিং হচ্ছে। যারা এই কিলিং প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ ওই সমাজের শক্তি যারা, তারা নূ্যনতম হাইস্কুল পাস, অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। দুঃখজনক নয় শুধুই, সভ্য সমাজে অবিশ্বাস্যকর নির্মমতা এটি। সম্মান রক্ষা তো তুচ্ছ অজুহাত, কোনো অজুহাতেও কি পরিবারের আপনজন, মা-বাবা সন্তানদের খুন করতে পারেন! শত শত বছর আগে পৃথিবীর কিছু কিছু জায়গার মানুষ পাশবিক জীবনযাপনের অবশিষ্ট রেশ বহন করে চলছিল। আর তারই রেশ এখনো মানুষ-সমাজে মানুষের রক্তে-মগজে অবিচল থাকবে? বিবর্তনের এত শত বাঁক-বিভঙ্গের পরেও কি ভাবা যায়?
খ্রিস্টান আরব লেখক নরমা খউরি লিখেছেন, হাজার বছর আগে প্রাচীন রোমের সংস্কৃতির প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য বা ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে মেয়েদের সতীত্ব পরিবারের সম্পত্তি। শেকসপিয়ারের লেখায় Titus Andronicus-কে হত্যা করে তার বাবা। কারণ অ্যানড্রনিকাস অন্য পুরুষের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিল। স্পার্টাকাস উপন্যাসে দেখা যায় দ্রোহী কোনো দাস দ্বারা মনিবের স্ত্রী, মেয়ে, কেউ ধর্ষিত হলে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হতো। প্রাচীন ব্যাবিলন ও মিসরের সংস্কৃতিতেও এরূপ সংস্কার দেখা যায়। নিষিদ্ধ যৌনাচারের অভিযোগে মেয়েদের বন্দি করা, পেটানো ও অঙ্গচ্ছেদ করার মতো শাস্তি দেওয়া হতো। হাজার বছর আগের মানুষের জীবন আজকের মানুষের কাছে কী নিষ্ঠুর অমানবিক দুঃস্বপ্নময় মনে হচ্ছে। অথচ ওই রেওয়াজের অস্তিত্ব বহন করছে 'সভ্য মানুষ'।
লন্ডনেও বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন অভিবাসিত হয়েছে, হচ্ছে। অনেকের দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের কাল চলছে। লন্ডনের পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর প্রায় তিন হাজার 'অনার' আঘাত ঘটেছে নারীর ওপর। এসবের মধ্যে মারধর, এসিড ছোড়া ও চূড়ান্ত পর্যায়ে খুন পর্যন্ত। দেখা যাচ্ছে, ইংল্যান্ড-কানাডার মতো দেশে থেকেও একবিংশ শতাব্দীতে নারীর জীবন নিরাপদ নয়। নারীর সতীত্বের ওপর যে পুরুষ-পরিবার বা গোষ্ঠীর সম্মান নির্ভর করে, তাকে কী বলা যায়? এসব উন্মাদনা চলছে 'মুসলিম' কিছু কিছু জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে। তারা এই অন্যায় অমানবিক হত্যাকাণ্ডকে ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে কুসংস্কারটি চালু রেখেছে। অথচ ইসলামী চিন্তাবিদ ও সুশিক্ষিত মুসলিমরা বলছেন, মূলত ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অতএব বলা যায়, ইসলাম-পূর্ব পৃথিবীর অনাচার-উপাচার-অত্যাচারের প্রথা কোনো কোনো জাতি-গোষ্ঠীর রক্তপ্রবাহে পরম্পরাগতভাবে লালিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে নারী হত্যা রোধে ক্রিমিনাল ল (অ্যামেন্ডমেন্ট) ২০০৪ নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়েছে, যদিও আইনটি দুর্বল। অপরাধীর শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কা কম বলে পিপলস পার্টি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবাদ করেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও নির্দেশ দিয়েছেন এই অবিচার রোধ করার জন্য। কোনো রাজ্যের প্রশাসন তা রোধ করতে ব্যর্থ হলে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির শাস্তি হবে বলা হয়েছে। যদি তা-ই হয়, অর্থাৎ দুর্বল আইনের মাধ্যমে খুনের মতো অপরাধকে আইনের ছদ্মাবরণে জিইয়ে রাখার শামিল। এ সত্যটি পাকিস্তানসহ অন্যদেরও উপলব্ধি করা উচিত। একসময় ভারতে সতীদাহ প্রথা ছিল অনুরূপ ধর্মীয় আবরণে নিষ্ঠুর খুনের প্রথা। এখন প্রায় বিলুপ্ত। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহকে নারীর অধিকাররূপে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছিলেন। নিজের ছেলেকে বিধবার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। আহা! এমন মহামানুষের আবির্ভাব ঘটুক পৃথিবীর এসব নারী বলির অন্ধকার উপত্যকায়।
লেখক : সাংবাদিক
No comments