হলমার্ক কেলেঙ্কারি- অর্থ পাচার হয়েছে কি না সেটাই এখন দেখছে দুদক

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক ঢাকা শেরাটন হোটেল) শাখা থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ পাচার হয়েছে কি না, সেটাই এখন খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদিকে গতকাল বুধবার ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করেছেন, হলমার্ক ইতিমধ্যে ২৩২ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছে।


তবে ব্যাংকেরই একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন হয়ে আসা হলমার্কের রপ্তানির টাকা সমন্বয় হয়েছে মাত্র।
গতকাল বিকেলে দুদক কার্যালয়ে কমিশনার মো. সাহাবউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আত্মসাৎ করা অর্থ হলমার্ক বিদেশে পাচার করেছে কি না, কিংবা টাকা দেশে থাকলেও তা কোথায় বিনিয়োগ করেছে, সেটা খতিয়ে দেখছে দুদকের অনুসন্ধান দল।
মো. সাহাবউদ্দিন বলেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে এজাহারভুক্ত আসামিদের বাইরে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন কি না, তা-ও যাচাই করে দেখছে দুদক। এ ছাড়া টাকা পাচারের সম্ভাবনা নিয়ে আরও তথ্য জানতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্তের সঙ্গে আলোচনা করেছে অনুসন্ধান দল।
এ পর্যন্ত এজাহারের বাইরে কোনো প্রভাবশালীর নাম এসেছে কি না, জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম হলমার্কের এমডি তানভীর এখনো বলেননি। তবে নেপথ্যে কেউ রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুই দিন ধরে রিমান্ডে থাকা হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ, পরিচালক তুষার আহমেদ ও সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমানকে একসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দুদকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক মীর মো. জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের সূত্র জানায়, হলমার্কের কর্মচারী মো. জাহাঙ্গীর আলমকে মালিক সাজিয়ে আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের নামে ২৬৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টাকা এবং আরেক কর্মচারী মীর জাকারিয়াকে মালিক সাজিয়ে ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের নামে ২১৯ কোটি ৬০ লাখ ৬২ হাজার ২০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের ভূমিকার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
কমিশনার বলেন, অর্থ উদ্ধার ও মামলার অনুসন্ধানকাজ একসঙ্গেই চলতে পারে। দুদক কর্তৃপক্ষ দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
২৩২ কোটি টাকা সমন্বয়: এদিকে দুদকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর গতকাল সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, ইতিমধ্যে হলমার্ক ব্যাংককে ২৩২ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। শিগগির আরও ৪৮ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। তবে ব্যাংকেরই একটি সূত্র বলেছে, প্রদীপ কুমার দত্ত হলমার্কের কাছ থেকে যে টাকা ফেরত পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন, তা আসলে ফেরত নয়। হলমার্ক সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে যে রপ্তানি করেছে, তার অর্থ বিদেশ থেকে প্রত্যাবাসন হয়ে ফেরার পর তা সমন্বয় করা হয়েছে মাত্র।
গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ৩০ সেপ্টেম্বর হলমার্কের এমডি তানভীর সোনালী ব্যাংকের এমডিকে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে গ্রুপের ১৯টি কোম্পানির কাছে ব্যাংকের মোট দায়, এ পর্যন্ত আদায় (রপ্তানি বিল, আইবিপি সমন্বয় ও এলসি বাতিলের মাধ্যমে সমন্বয়), যন্ত্রপাতি, জেনারেটর ও আসবাবপত্রের মূল্যমান উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, জুন মাসের শেষ ভাগ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হলমার্ক ১৭৪টি এলসি বাতিল করেছে। এসব এলসি বাতিল করতে রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। হলমার্ক তাদের চিঠিতে ইতিমধ্যে ৩৫৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধের তথ্য দিয়েছে। কিন্তু তাদেরই উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে এলসি বাতিল করা এবং বিদেশ থেকে রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসন হয়ে সোনালী ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থ।
হলমার্কের আত্মসাৎ করা অর্থ আদায়ে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রদীপ দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, এ জন্য দুজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। তবে গুছিয়ে নিতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে তাঁর নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে প্রদীপ দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, সোনালী ব্যাংকের আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সময় নিরীক্ষায় দুর্বলতার কারণে এটা ঘটেছে।
প্রদীপ কুমার দত্ত গত জুনে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন।
হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঋণের নামে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে তিন হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। দুদক বলেছে, ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়টি তাদের কাছে স্বীকার করেছেন হলমার্কের এমডি তানভীর।

No comments

Powered by Blogger.