কালান্তরের কড়চা-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আরেক সহযোগীর বিদায় by আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

সিঙ্গাপুরে ১৬ অক্টোবর মঙ্গলবারের সকাল। সবে ঘুম থেকে উঠেছি। দ্য স্ট্রেইটস টাইমস কাগজটা এলো, প্রথম পাতাতেই খবরটা- প্রিন্স নরোদম সিহানুক মারা গেছেন। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।


তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। সঙ্গে সঙ্গে সত্তরের দশকের গোড়ার কথা মনে পড়ল। তখন সিহানুক পরিচিত ছিলেন প্রিন্স সিহানুক হিসেবে। কম্বোডিয়ার রাজা ছিলেন, মার্কিন ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তখন বেইজিংয়ে বসবাস করছিলেন। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আলজিয়ার্সে ৭৩ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন হয়। বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেক রাষ্ট্রনায়ক এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। আমি সাংবাদিক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়েছিলাম।
এখানে বিশ্বের অনেক শীর্ষ রাষ্ট্রনায়ককে দেখতে পাই। যেমন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, মিসরের আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার গাদ্দাফি, তিউনিসিয়ার হাবিব বরগুইবা, সাইপ্রাসের আর্চ বিশপ ম্যাকারিউস ও আরো অনেককে। তাঁদের মধ্যে কম্বোডিয়ার ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রনায়ক সিহানুকও ছিলেন। তখনো তাঁর চুল কালো। সাদা হয়নি। বেঁটে-খাটো মানুষ। প্রাণবন্ত হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। তাঁকে সম্মেলন কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখেছি। কথায় কথায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তাঁকে ওই দিন ভালোভাবে দেখার সুযোগ পাই।
আমি একদিন আলজেরিয়া সরকারের অতিথি হিসেবে তাদের দেওয়া হোটেলে ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ বন্ধুবর তোয়াব খানের ডাকে ঘুম ভাঙে। তোয়াব খান এখন দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক। তখন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি। তোয়াব আমাকে জানালেন, প্রিন্স সিহানুক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ভূমধ্যসাগরের পারে বঙ্গবন্ধুর ভিলায় আসছেন। আমি যেন সেখানে উপস্থিত থাকি। আমি তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে বঙ্গবন্ধুর ভিলায় ছুটি এবং প্রিন্স সিহানুককে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একান্ত আলাপে নিবিষ্ট দেখি। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল। তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন; সাম্রাজ্যবিরোধী সংগ্রামেরও একজন নির্ভীক যোদ্ধা। সে কারণেই তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে। কিন্তু বেইজিংয়ে আশ্রয় নিলেও তিনি তখনো নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগোষ্ঠীর কাছে কম্বোডিয়ার আসল নায়ক হিসেবে স্বীকৃত। কম্বোডিয়ার শীর্ষ নেতা হিসেবেই তিনি আমন্ত্রিত হয়ে আলজিয়ার্স এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষ হতেই আমি তাঁকে আমার লেখা বঙ্গবন্ধুর একটি জীবনী পুস্তিকা উপহার দিই। তিনি সেটি সানন্দে গ্রহণ করেন এবং আমার সঙ্গে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। এখানে বলা দরকার, ১৯৭৩ সালে আমি বঙ্গবন্ধুর একটি জীবনী লিখি। সেটি বাংলাদেশের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় ইংরেজি ও বাংলায় প্রকাশ করেছিল। শিল্পী কালাম মাহমুদ বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন। আমি এর ইংরেজি সংস্করণটি প্রিন্স সিহানুককে উপহার দিই। তিনি খুব খুশি হন। বলেন, 'আমি শেখ মুজিবকে শ্রদ্ধা করি। আশা করি, এই বইটি পড়ে তাঁকে আমি আরো ভালোভাবে জানতে পারব।'
মুজিব-সিহানুক ওই বৈঠকের সময় বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, এম আর আখতার মুকুল, অবজারভার সম্পাদক ওবায়েদ উল হক এবং আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
আমাদের সঙ্গে প্রিন্স সিহানুক একটি ফটোসেশন করেন। বঙ্গবন্ধু তাতে ছিলেন। আমি প্রিন্সকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি আশা করেন যে কম্বোডিয়া আবার মুক্ত হবে? এবং আপনি দেশে ফিরে যাবেন? তিনি হেসে বললেন, তোমাদের দেশ কি মুক্ত হয়নি? শেখ মুজিব কি দেশে ফিরে আসেননি? এই যে তিনি দীর্ঘকাল বিদেশে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে আছেন, তাতে তাঁর মনোবল বিন্দুমাত্র ভেঙে পড়েনি।
পরে বঙ্গবন্ধুর কাছে শুনেছি, প্রথম আলাপেই প্রিন্স সিহানুক বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কি মার্কিন প্রচারণা আসলে বিশ্বাস করেন? আমি চীনের তাঁবেদার? এবং দেশে ফিরে গিয়ে তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করব?
বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়েছেন, আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা চলছে, আমি ভারতের তাঁবেদার এবং ঢাকায় তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করেছি। আপনি কি তা বিশ্বাস করেন? প্রিন্স সিহানুক দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলেছেন, না, আমি বিশ্বাস করি না। আপনি রাজনৈতিক কৌশলের জন্য ভারতের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। আমিও একই কৌশলের জন্য চীনের সাহায্য গ্রহণ করেছি। আমি চীনের তাঁবেদার নই। চীন জোটনিরপেক্ষ দেশের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও আমাকে এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাধা দেয়। আমি জোটনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি।
সেদিন আমাকে একটি ছোট সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন এবং দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অবসানের পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এই সাম্রাজ্যবাদেরও পতনের দিন ঘনিয়ে আসছে। আজ হোক, কাল হোক এশিয়া ও আফ্রিকার পদানত জাতিগুলো মাথা তুলবেই। সব সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি ব্যর্থ হবে। আমাদের সামনে অনেক দুঃখ ভোগ ও রক্তপাত রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে তিনি এই বলে সতর্ক করেছিলেন যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে তিনি যেন কোনো কারণেই বিশ্বাস না করেন। তিনি সেই প্রবাদটি উল্লেখ করেন, আমেরিকা কারো বন্ধু হলে তার শত্রুর দরকার হয় না। প্রিন্স সিহানুক ১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত শুধু কম্বোডিয়া নয়, সারা এশিয়ার রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
কম্বোডিয়ায় সপ্তাহব্যাপী শোক প্রকাশ করা হচ্ছে এবং তাঁর প্রতি আবালবৃদ্ধবনিতা শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। তিনি অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য বেইজিং গিয়েছিলেন। এবং সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, বৌদ্ধদের প্রথা অনুযায়ী তাঁর দেহ যেন পোড়ানো হয় এবং সেই দেহভস্ম রাজধানী নমপেনের রাজপ্রাসাদে সংরক্ষণ করা হয়। কম্বোডিয়া সরকার তাঁর ইচ্ছা পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কম্বোডিয়ায় শাসক হিসেবে তিনি নানা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কখনো রাজা, কখনো প্রেসিডেন্ট, কখনো প্রিন্স সিহানুক নামে প্রধানমন্ত্রী এবং সর্বশেষ কিং সিহানুক। সিঙ্গাপুরের দৈনিক পত্রিকাটির মতে, সিহানুকের শাসনকাল কম্বোডিয়ার জন্য স্বর্ণযুগ বলা হয়। তাঁর জীবন বড় বিচিত্র। কম্বোডিয়া যখন ফরাসি উপনিবেশ; তখন তিনি দেশটির রাজা হন। কিন্তু ফরাসিদের তাঁবেদারি করেননি। তিনি জাপানকে কম্বোডিয়া দখল করতে দেখেছেন এবং কম্বোডিয়াকে স্বাধীন করার ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা নিয়েছেন। ১৯৭০ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
খেমাররুজরা যখন কম্বোডিয়ায় প্রচার চালাচ্ছে তখন তিনি মার্কিন তাঁবেদার সরকারকে হটানোর জন্য খেমাররুজদের সমর্থন দেন এবং সমালোচিত হন। ১৯৯৩ সালে কম্বোডিয়া আবার মুক্ত হয় এবং তিনি রাজা হিসেবে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তারপর তিনি ছেলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে কিং ফাদার নামে পরিচিত হন। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি সেঙ্াফোন বাজাতেন, ছবি পরিচালনা করতেন এবং নিজে ভালো নাচতে জানতেন। তিনি নারীপ্রীতির জন্যও বিখ্যাত ছিলেন এবং ১৪টি সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা শোক প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, এ রকম বর্ণাঢ্য জীবন এশিয়ার রাজনীতিতে আর নেই। তিনি তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, তিনি স্বৈরাচারী নন। তবে তাঁর মধ্যে একনায়কসুলভ ভাব আছে। তিনি মিসরের নাসের ও ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নর মিশ্রণ। তাঁর মতে, আই এম এ ম্যান উইথ মাই গুড পয়েন্টস অ্যান্ড মাই ব্যাড পয়েন্টস আই অ্যাম সিহানুক অ্যান্ড অল কম্বোডিয়ানস আর মাই চিলড্রেন।
নেহরু, নাসের, সুকর্ন, মুজিব যুগের শেষ নক্ষত্রটির মৃত্যু হলো। আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু যে কজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ার সাদাত, মার্শাল টিটো, সিহানুক প্রমুখ। তাঁদের মধ্যে কাস্ত্রো ছাড়া আর কেউ জীবিত নেই। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে বেইজিংয়ে বসে প্রিন্স সিহানুক তাঁর শোকবাণীতে বলেছিলেন, 'সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধে মুজিব আমার কমরেড ছিলেন। তিনি আমার প্রাণের ভাই, আমি সেই ভাইকে হারিয়েছি।' আজ সেই সিহানুকও চলে গেলেন। তাঁর উত্থান-পতনময় জীবন রূপকথার মতো। আজ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। তাঁর বিচিত্র জীবন নিয়ে আলোচনা স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়।
১৭.১০.২০১২

No comments

Powered by Blogger.