অর্থনীতির কালো ছায়া-পরিকল্পিত উদ্যোগেই আলোর ইশারা

দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে এমন মন্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মুখে বারবার শোনা গেছে। কিন্তু সরকারের তরফে বিষয়টি বারবার অস্বীকার করা হয়েছে। এবার খোদ অর্থমন্ত্রীই নীরবতা ভেঙে সংকটের কথা স্বীকার করলেন। বিষয়টি ইতিবাচক।


কেননা সংকটের কথা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে সাময়িকভাবে তা এড়ানো হয়তো সম্ভব, কিন্তু সমাধানের পথে অগ্রসর হতে হলে সংকটকে স্বীকার করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মঙ্গলবার সংসদে প্রশ্নাত্তর পর্বে বলেছেন, 'আমরা প্রতিনিয়ত অর্থনীতির একটি কালো ছায়ার মধ্যে আছি।' তার এই বক্তব্যের অর্থ হলো, অর্থনীতির স্বাস্থ্য সম্পর্কে ইতিপূর্বে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন সে পর্ব এক্ষণে গত হয়েছে। তার বক্তব্য অনুসারে অর্থনীতি সংকটের অজানা গর্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে_ বৈদেশিক বিনিয়োগের অভাব, মূল্যস্ফীতি এবং অধিকহারে ভর্তুকি দেওয়া। অবশ্য এফবিসিসিআই সভাপতি একই দিন ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ীরা নিষ্পেষিত হচ্ছেন বলে উলেল্গখ করেছেন। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার যোগ ঘটলে অর্থনীতি সংকটে পড়বে বলেও তিনি ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছেন। এটা ঠিক যে, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নতি না হওয়া এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে নতুন দেশীয় বিনিয়োগ তেমন হচ্ছে না। বৈদেশিক বিনিয়োগের অবস্থা তো আরও শোচনীয়। অথচ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকট এবং চীনে শ্রমিকদের বেতন বেড়ে যাওয়ায় আমাদের এখানকার সস্তা শ্রম ও উদার অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ উচ্চহারে হওয়ার কথা। তবে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উষ্ণতাকে যথাযথভাবে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার কতটুকু সফল সে ব্যাপারেও প্রশ্ন রয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, এখনও আমাদের রফতানি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কিছুটা পরিমাণে বেশি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমদানি লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার কারণে বাজারের ওপরও চাপ পড়ছে, ফিক্সড ইনকাম গ্রুপের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে যায়। অর্থনৈতিক এই ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার জন্য স্বল্পমেয়াদি দাওয়াই হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে অর্থপ্রবাহ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। তবে এই পদ্ধতি পুরনো ও বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় একটি দেশের ক্ষেত্রে একমাত্র উপযুক্ত বিকল্প কি-না সে ব্যাপারে প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গতি সঞ্চারের জন্য বিনিয়োগ, বিশেষ করে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগে যে শুধু নতুন কর্মসংস্থানই সৃষ্টি হয় তা নয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও এতে বাড়ে। তবে বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার হ্রাস করা। অর্থনীতিকে কালো ছায়া থেকে বের করে দ্রুতগতির ধনাত্মক ধারায় স্থাপন করার জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্যাংকের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে দ্রুত নামিয়ে আনা, ভর্তুকি যৌক্তিককরণ ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতির উন্নতি তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এভাবেই পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে কালো ছায়ার গ্রাস থেকে অর্থনীতি মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.