স্বামীর বর্বরতা-পড়ালেখা বন্ধ করতে স্ত্রীর হাতের কব্জি কর্তন!

রসিংদী শহরের উপজেলা মোড় এলাকার হাওয়া আক্তার জুঁই। সদা চঞ্চল সুন্দর মেয়েটি লেখাপড়ার মাঝপথেই পরিবারের সিদ্ধান্তের কারণে বিয়ের পিঁড়িতে বসে। বিয়ে শেষে স্বামী চলে যায় বিদেশে। জুঁইও চালিয়ে যায় পড়াশোনা। কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি সম্পন্ন করে নরসিংদী সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হয়। কিন্তু অশিক্ষিত প্রবাসী স্বামীর মনে ভয়, শিক্ষিত হয়ে জুঁই যদি তাকে ছেড়ে চলে যায়। তাই সে জুঁইয়ের পড়াশোনার বিরোধী।


কিন্তু অদম্য জুঁই লেখাপড়া ছাড়তে নারাজ। তাই স্বামীর সিদ্ধান্ত অমান্য করে পড়াশোনা করার 'অপরাধে' জুঁইয়ের হাতের কবজি কেটে ফেলেছে বর্বর স্বামী রফিকুল ইসলাম। গত ৪ ডিসেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার জিয়া কলোনিতে এই নির্মম ঘটনা ঘটে। বর্তমানে জুঁই নরসিংদীর বাবার বাড়িতে রয়েছে। হাত হারানোর যন্ত্রণায় কাতরানো জুঁইয়ের প্রশ্ন, স্বামী এত বর্বর হয়?
এ ঘটনায় পুলিশ ঘাতক স্বামী রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে।
জুঁইয়ের পরিবারের লোকজন জানায়, শহরের উপজেলা মোড় এলাকার ইউনুছ মিয়ার মেয়ে হাওয়া আক্তার জুঁইয়ের ২০০৮ সালের ৩০ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার নুরজাহানপুর গ্রামের বাতেন মিয়ার ছেলে রফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পরই রফিক চলে যায় দুবাই। ছেলেবেলা থেকেই জুঁইয়ের লেখাপড়ার প্রতি ছিল অদম্য আগ্রহ। কিন্তু বিয়ের পরই তার পড়াশোনা নিষিদ্ধ করে স্বামী। তাই স্বামীর বাধা সত্ত্বেও সে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকে। সে ব্রাহ্মন্দী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ 'এ' গ্রেড পায়। মেয়ের লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় স্বামী রফিককে না জানিয়েই নরসিংদী সরকারি কলেজে ভর্তি করে দেন ইউসুফ মিয়া। কলেজে ভর্তির খবর শুনেই ক্ষিপ্ত হয় রফিক। এ ছাড়া শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনও বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। এরই মধ্যে নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করে সামনে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল জুঁই।
জুঁইকে বিদেশ থেকে রফিক জানায়, একটি মোবাইল ফোন, কিছু স্বর্ণালংকার ও কসমেটিকস বাড়িতে পাঠিয়েছে। এগুলো আনার জন্য সে যাতে বাড়িতে যায়। কিন্তু জুঁই পরীক্ষার কারণে শ্বশুরবাড়িতে যেতে পারেনি। গত ২৭ নভেম্বর রফিক ফের জুঁইকে জানায়, ওই জিনিসপত্রগুলো তার বোন নাঈমা বেগমের বাসায় রয়েছে। এগুলো ঢাকায় এসে তার বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। স্বামীর কথামতো জুঁই ১ ডিসেম্বর স্বামীর পাঠানো জিনিসপত্র নিতে নরসিংদী থেকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার জিয়া কলোনিতে নাঈমা বেগমের বাসায় যায়। সেখানে তিন দিন থাকার পরও জুঁইকে কোনো জিনিসপত্র দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সে ননদের কাছে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, আর এক দিন পরই তোমার জিনিসপত্র দিয়ে দেব। এরই মধ্যে ৪ ডিসেম্বর জুঁই ঘুম থেকে জেগে দেখে বিছানার সামনে রফিক দাঁড়ানো।
রফিক জুঁইকে একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে বিদেশ থেকে আনা জিনিসপত্র দেওয়ার ছলে তার চোখ বেঁধে হাতের কবজি কেটে ফেলে। পরে কাটা স্থান থেকে অধিক রক্তক্ষরণের ফলে তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের সন্দেহ হলে জুঁইয়ের পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। জুঁইয়ের পরিবার আহত জুঁইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে নরসিংদীর বাড়িতে নিয়ে আসে। এ ঘটনায় জুঁইয়ের বাবা বাদী হয়ে গত ৫ ডিসেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা করেছেন। পুলিশ জুঁইয়ের স্বামী রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে।
হাত হারানোর যন্ত্রণায় কাতরানো হাওয়া আক্তার জুঁই বলে, 'রফিক আমাকে গলায় অলংকার পড়াবে বলে চোখ বন্ধ করতে বলে। আমি চোখ বন্ধ করলে সে ওড়না দিয়ে আমার দুই চোখ বাঁধে এবং হঠাৎ করেই মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দেয়। এতে আমার সন্দেহ হয়। তাই আমাকে ডান হাত টেবিলের ওপর রাখার কথা বললে আমি রাখিনি। কিন্তু সে জোর করে ডান হাত টেনে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়।'
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার উপপরিদর্শক আল মামুন কালের কণ্ঠকে জানান, ঘটনা শোনার পরপরই পুলিশ রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি ও কাটা পাঁচটি আঙুলের মধ্যে চারটি আঙুল উদ্ধার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল বলেছে, শিক্ষিত হয়ে জুঁই যদি তাকে ছেড়ে চলে যায়। এ ভয়ে সে জুঁইয়ের ডান হাত কেটে ফেলেছে।

No comments

Powered by Blogger.