Sunday, July 12, 2026

প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে সামুদ্রিক পাখি থেকে কচ্ছপ by জাহিদ হোসাইন খান

প্লাস্টিক গ্রহণের ফলে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর হার বাড়ছে। এ জন্য বিজ্ঞানীরা প্রায় ১০ হাজার সামুদ্রিক প্রাণীর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক পাখিরা মাত্র ২৩ টুকরা প্লাস্টিক গিলে ফেললে চরম বিপদের সম্মুখীন হয়। এতে তাদের মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে ৯০ শতাংশ। সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ২৯ টুকরা প্লাস্টিক গ্রহণে একই বিপদের মুখে পড়ে। আর সামুদ্রিক কচ্ছপদের একই মাত্রার ঝুঁকির জন্য প্রায় ৪০৫ টুকরা প্লাস্টিক গ্রহণ করতে হয়।

প্লাস্টিকের সামান্য পরিমাণ বিপজ্জনক হতে পারে। আয়তনের দিক থেকে একটি ফুটবলের চেয়ে কম পরিমাণ নরম প্লাস্টিক একটি ডলফিনের জন্য মারাত্মক হতে পারে। অন্যদিকে একটি সামুদ্রিক পাখি মটরশুঁটির আকারের চেয়ে ছোট কয়েকটি রাবারের টুকরা গিলে ফেলেই মারা যেতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, নতুন এই তথ্য বন্য প্রাণী রক্ষায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে নতুন রূপ দিতে সহায়তা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবাদী গোষ্ঠী ওশেন কনজারভেন্সির প্রধান গবেষক এরিন মারফি বলেন, প্লাস্টিক দূষণ সমুদ্রে প্রাণীর জন্য অস্তিত্বের হুমকি সৃষ্টি করে। সিল, সি লায়ন ও ডলফিনের মতো সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী, সামুদ্রিক কচ্ছপ ও সামুদ্রিক পাখিদের বিশ্বব্যাপী সংগৃহীত ময়নাতদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অধ্যয়ন করা সামুদ্রিক কচ্ছপদের প্রায় অর্ধেক, সামুদ্রিক পাখিদের এক–তৃতীয়াংশ ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের প্রতি ১০টির মধ্যে একটি প্লাস্টিক খেয়েছে বলে দেখা গেছে।

গবেষকেরা সামুদ্রিক প্রাণীর প্রতিটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক গিলে ফেলার ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি কতটুকু, তা অনুমান করেছেন। প্লাস্টিকের ধরন বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাবার সামুদ্রিক পাখিদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। নরম প্লাস্টিক ও মাছ ধরার সরঞ্জাম থেকে তৈরি আবর্জনা সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করে। শক্ত ও নরম উভয় প্রকার প্লাস্টিকই কচ্ছপদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।

এ গবেষণায় শুধু প্রাণীদের পাকস্থলীর মধ্যে পাওয়া প্লাস্টিক পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে রাসায়নিক প্রভাব বা প্লাস্টিকে জড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় মূল্যায়ন করা হয়নি। যে কারণে ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা আরও বেশি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা যায়, শত শত সামুদ্রিক প্রজাতির দেহে প্লাস্টিক আছে। পাখিরা প্রায়ই প্লাস্টিকের টুকরা গিলে ফেলে। কচ্ছপেরা প্লাস্টিকের ব্যাগকে জেলিফিশ ভেবে ভুল করে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের প্রাণীর জন্য ঠিক কতটুকু প্লাস্টিক প্রাণঘাতী, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব ছিল।

বিজ্ঞানী মারফি বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণের মোকাবিলা করতে হলে আমাদের অবশ্যই প্লাস্টিক উৎপাদন কমাতে হবে। সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের উন্নতি করতে হবে। এরই মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে।’ নতুন গবেষণা প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য প্লাস্টিক ভয়ংকর হতে পারে
সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য প্লাস্টিক ভয়ংকর হতে পারে। ছবি: রয়টার্স।

হরমুজে ফি দিতে সম্মত হচ্ছে ইউরোপ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৌ-নির্দেশনা সেবার বিপরীতে ফি আরোপের একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইউরোপীয় দেশগুলো। তবে এই ফি বাধ্যতামূলক হবে না এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন থাকলেই তা কার্যকর করা যেতে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।

ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা বিপর্যয়কর হবে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো আন্তর্জাতিক জলপথে যেভাবে নির্দিষ্ট নৌ-সেবা বাবদ অর্থ নেওয়া হয়, একই ধরনের ব্যবস্থা হরমুজেও বিবেচনা করা যেতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই পথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা ও তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেন, তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটিই জাতির ইচ্ছা।

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ইতোমধ্যে মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত ওই পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে ওমান তাদের আইন বিশেষজ্ঞদের তেহরানে পাঠাতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি ও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও আশা প্রকাশ করেছেন, এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে যে ছাড় দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করেছে।

হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে। দেশটি বাধ্যতামূলক টোলের বিরোধিতা করছে। কাতারও বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে ইরানকে প্রণালির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলার বিষয়ে অনাগ্রহী, অন্য অংশ সহযোগিতার পক্ষে। ফলে এ বিষয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে।

লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং সেখানে বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

এদিকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণ উপেক্ষা করেছে। চীনের ভাষ্য, এটি একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে মূল বিতর্ক দুটি বিষয়কে ঘিরে। একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না।

গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর অর্থ এই নয় যে, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে, সমঝোতা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাহিনীর কোনো ভূমিকা থাকার সুযোগ নেই। 

হরমুজে ফি দিতে সম্মত হচ্ছে ইউরোপ