খুনীদের প্রতিহত করতে সংস্কৃতিকমর্ীদেরই এগিয়ে আসতে হবে- সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সম্মেলনে আহ্বান

রাজনীতির লৰ্য ৰমতা। রাজনীতির লৰ্য লুণ্ঠন। আর এর ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি আমাদের মেরম্নদ-। এ মেরম্নদ- শক্ত বলেই বাঙালী বার বার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। পুঁজিবাদ, ধমর্ীয় মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধী, রাজাকাররা তাই সংস্কৃতিকে ভয় পায়। আলবদর আলশামসরা কখনও গান, নৃত্য, আবৃত্তি জানে না।


এরা কবিতা লিখলে তা হয় হাস্যকর। তাই সৃষ্টির বদলে ধ্বংসলীলা চালানোর পৰে ওরা। এসব খুনীকে প্রতিহত করতে হলে সংস্কৃতিকমর্ীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সম্মেলন উপলৰে শুক্রবার আয়োজিত আলোচনাসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কয়েক বছর বিরতির পর এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
পাবলিক লাইব্রেরীর শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। সম্মেলনের আহ্বায়ক রামেন্দু মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন জোট সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম কুদ্দুছ, বাংলাদেশ গ্রম্নপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকি, পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরা, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি হাবিবুলস্নাহ সিরাজী ও নাট্যজন মামুনুর রশীদ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান রাষ্ট্র পুঁজিবাদী। কিন্তু পুঁজিবাদ আর সংস্কৃতি একসঙ্গে যায় না। তাই এসব রাষ্ট্র সংস্কৃতিকমর্ীদের ধ্বংস কামনা করে। পুরস্কার পদক ইত্যাদি দিয়ে কিনে নেয়ার চেষ্টা চালায়। মানুষের মুক্তির পথ বন্ধ করে দিতে চায় তারা। কিন্তু সংস্কৃতি আমাদের মেরম্নদ-। এটি আছে বলেই শত দুযের্াগের মধ্যেও আমরা মাথা উঁচু করে চলতে পারি। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এরা পুঁজিবাদ ভোগবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু সংস্কৃতি আমাদের মেরম্নদ-। এ মেরম্নদ- আছে বলেই হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হয় না আমাদের। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এরা কখনও গান নৃত্য আবৃত্তি জানে না। কবিতা লিখলে তা হয় হাস্যকর। তাই সৃষ্টির বদলে ধ্বংসলীলা চালানোর পৰে ওরা। রাজনীতিকরা এসব অপশক্তির সঙ্গে আপোস করতে পারেন কিন্তু সংস্কৃতিকমর্ীরা তা করে না মনত্মব্য করে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিককমর্ীদের মধ্যে কোন বিভক্তি নেই। ভবিষ্যতেও এ ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মকা- সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি ছড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন।
জোটের গত কয়েক বছরের কার্যক্রম তুলে ধরে এর সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের জন্মই হয়েছিল একটি প্রতিকূল সময়ে, ১৯৮৪ সালে। সেই সময় থেকে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোট আন্দোলন করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর শাসক গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জাতিকে দূরে সরিয়ে রাখতে নানা অপতৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্তু সামরিক ও একনায়কদের রক্তচৰুকে উপেৰা করে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের নানা অত্যাচার নিযর্াতনের কথা উলেস্নখ করে তিনি বলেন, আমারা তবু পিছু হটিনি। এসব কারণেই সম্মেলন আয়োজনে বিলম্ব হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের যাঁরা সমালোচনা করতে চান তাঁদের এ বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। জোটকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের রায় দ্রম্নত কার্যকরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটিও খুব দ্রম্নত শুরম্ন করতে হবে। এ ব্যাপারে কোন ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
সাধারণ সম্পাদক গোলাম কুদ্দুছ বলেন, চারদলীয় জোট সরকার আমাদের শহীদ মিনারকে পর্যনত্ম অবরম্নদ্ধ করে রেখেছিল। জোট নেতাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু আমাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি তারা। বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানির সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে এরা সামান্য টাকায় কিনতে ওত পেতে আছে। এদের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে সরকারের কাছে সংস্কৃতি খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
বিশিষ্ট নাট্যকার মামুনুর রশীদ বলেন, রাজনীতিবিদরা গর্বের সঙ্গেই বলেন, তাঁরা গান নাটক কবিতা বোঝেন না; কিন্তু আমরা সাংস্কৃতিককমর্ীরা রাজনীতি বুঝি। বর্তমান সরকার সংস্কৃতির জন্য মঙ্গলজনক কিছু করবে আশা প্রকাশ করলেও তিনি বলেন, বিগত দিনে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা আমরা ভুলিনি। সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে এ আলোচনার সমাপ্তি টানেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার।
এর আগে সকালে পাবলিক লাইব্রেরী প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, দেশের মুখকে মলিন করে দেয় যে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি তার বিরম্নদ্ধে আন্দোলন শুধু আদর্শিক দায়িত্ব নয়, সামষ্টিক লৰ্য হওয়া উচিত। ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের বিরম্নদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে এদিন সারাদেশের বিভিন্ন শাখা থেকে আসা জোট সদস্যরা যোগ দেন। কাউন্সিলে নাসির উদ্দিন ইউসুফকে পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত করা হলেও নতুন মুখ আসে সাধারণ সম্পাদক পদে। প্রথমবারের মতো এ দায়িত্ব পান আবৃত্তি শিল্পী হাসান আরিফ। ৪৭ জনের কমিটিতে আছে আরও বেশ কিছু নতুন মুখ।

No comments

Powered by Blogger.