পরিচিতির প্রতীক by গৌতম লাহিড়ী

দিলি্ল পরিচিতির প্রতীক কি শুধু লালকেল্লা বা কুতুবমিনার অথবা হুমায়ুন সমাধি? এটা হওয়ার কথা ছিল না। এর বাইরেও বহু মোগল এবং প্রাক-মোগল পাঠান স্থাপত্যের নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে নগর দিলি্লর আনাচে-কানাচে। যেগুলো রাজধানীর নগরায়নের বিকাশে কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে চাপা পড়ে রয়েছে অথবা গরিবদের অস্থায়ী নিবাস


হয়ে উঠেছে। পুরাতত্ত্ব বিভাগ এরকম শ'খানেক প্রাচীন স্থাপত্যের সংস্কারের জন্য অর্থ চেয়েছে ভারত সরকারের কাছে। এর প্রত্যেকটির সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক বিবর্তনের অনন্য উপাদান অন্তর্নিহিত। যেমন_ দিলি্লর সরকারি বাবুদের নিবাস_ রামকৃষ্ণ পুরমের সেক্টর তিনের উপকণ্ঠে গরিব ঝুগ্গি-ঝুপড়ির আড়ালে চাপা পড়ে রয়েছে লোদির রাজত্বের সময়কার খ্যাতনামা শিল্পী বিরজি খানের সমাধি। ইব্রাহিম লোদির পিতা সিকন্দর লোদি যখন দিলি্লর মসনদে তখন তিনি ছিলেন সুলতানের ছায়াসঙ্গী। সুলতান দিলি্ল থেকে রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করতে চেয়েছিলেন। তার সমগ্র পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন এই বিরজি খান। যদিও তার সময়ে রাজধানী তৈরি হয়নি। পরে সম্রাট আকবর তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এ বিরজি খানের সমাধি পাশতুন এবং পারসি স্থাপত্যের মিশ্রণে এমনভাবে নির্মিত করা হয়েছিল, যা আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার বিদ্যার্থীদের কাছে বিস্ময়কর!
দক্ষিণ দিলি্লর কুতুবমিনার ছাড়িয়ে মেহরলির এক পার্কের মধ্যে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে মোহাম্মদ কুলি খানের সমাধি। কে ইনি? সম্রাট আকবরের ধাত্রীমাতা মাহাম আঙ্গার পুত্র আদহাম খানের ভাই। ইনি সম্রাট আকবরের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। আদহাম খানের সমাধির রক্ষণাবেক্ষণ হলেও কুলি খানের সমাধি এবং স্মৃতিসৌধ অনাদরে পড়ে আছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর এখানে গ্রীষ্মকালীন বিশ্রামাগার বানিয়েছিলেন। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়ে স্যার থমাস মেটকাফে ঊনবিংশ শতাব্দীতে 'দিলখুসা' নামে বিশ্রামাগার তৈরি করেন এখানেই। মেটকাফে ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর রাজদরবারে গভর্নর জেনারেলের প্রতিনিধি। তিনিই প্রথম দিলি্লর মোগল স্থাপত্যের নিদর্শনগুলো নিয়ে চিত্রাবলি তৈরি করিয়েছিলেন, যা আজও 'দিলি্ল অ্যালবাম' নামে একটি প্রামাণ্য দলিল। এ দিলখুসাতেই রয়েছে হলুদ-সবুজ-নীল টালিতে খোদিত নকশা।
দক্ষিণ দিলি্লর গুলমোহর পার্কের কাছে পারসি স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ স্বরূপ পড়ে রয়েছে দরবেশ শাহর মসজিদ। কথিত আছে, লোদি বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাহলুল লোদি এই দরবেশ নামক ফকিরের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে কিনেছিলেন দিলি্ল রাজধানীর জমি। কিন্তু লোদি সম্রাট তার স্মৃতিতে যে সৌধ তৈরি করেছিলেন তা স্থাপত্য বিজ্ঞানের এক নজিরবিহীন নিদর্শন। কিন্তু সবার অগোচরে এবং পর্যটনের সঙ্গে ইতিহাস যুক্ত না হওয়ায় বিস্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছে। নগরায়ণের সঙ্গে ইতিহাসকে মুছে দেওয়া এক অদ্ভুত আধুনিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মসজিদের মিনারে খচিত ছিল মণি-মাণিক্য, যা আজ উধাও।
দক্ষিণ দিলি্লর মেহরলিতে খুঁজলেই পাওয়া যাবে সুফি স্থাপত্যের নজির- 'হিজরো-কা-খানকাহ'। লোদি সম্রাটের হারেমের হিজরা রক্ষীদের জন্যই এ স্মৃতিসৌধ এবং প্রার্থনা কক্ষ। খানকাহ শব্দটি পারসি। অর্থ হিজরাদের সুফি প্রার্থনাস্থল। শ্বেতপাথরের তৈরি সোপান বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। মেহরলি রোডের সঙ্গে যুক্ত সংকীর্ণ ছাতাওয়ালি গলি দিয়ে এই সমাধিস্থলে পেঁৗছতে হয়।
দিলি্লর বসন্ত বিহারে খুঁজলেই সন্ধান মিলবে 'বড়ে-লাও-কা-গুম্বার'। লোদি সাম্রাজ্যের শিল্পকলার পুরা নিদর্শন। এরকম আরও অনেক নিদর্শন রয়েছে। সন্ত তুর্কমানের নামাঙ্কিত তুর্কমান গেট এখন দীর্ণ। সেই ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে যমুনা নদীর তীরে আজকের দিলি্ল নগরের গোড়াপত্তন। তারপর ১২টি রাজবংশের ৮৮-এর বেশি সম্রাট রাজত্ব করেছেন। নয়টি উপনগরী নিয়ে দিলি্ল, যাতে ১৩০০ সমাধি ও সৌধ রয়েছে। যার প্রত্যেকের সঙ্গে ইতিহাস জড়িত। এদের মধ্যে কিছু আইন দ্বারা সংরক্ষিত। কিন্তু অধিকাংশ নয়। এখন কার্যত এক আন্দোলন শুরু হয়েছে ইতিহাসিক নিদর্শনগুলোর সংরক্ষণের। এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বলেছিলেন, যে জাতি ইতিহাস রক্ষা করে না তাদের বিলুপ্তি ঘটে। ইতিমধ্যে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ একটি ভবন রক্ষা নিয়ামবলি তৈরি করছে। তবে তাতে অনেক ঢিলেমি দেখা গেছে। এ নিয়ম কার্যকর করার অর্থ ওইসব ইতিহাসিক ভবনের তিনশ' মিটারের মধ্যে কোনো নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু এসব স্থানে এত বেআইনি নিবাস গড়ে উঠেছে যে, এদের হঠাতে গেলে রাজনৈতিক চাপান-উতোর শুরু হবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের স্বার্থে ইতিহাসকে জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করছে না_ এটাই দুঃখের।

গৌতম লাহিড়ী :সমকাল
প্রতিনিধি, নয়াদিল্লী

No comments

Powered by Blogger.