সংসদ নির্বাচন-সীমানা বিন্যাস আইন পরিবর্তন জরুরি by কাজী শাহিনুল ইসলাম

যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা ১৯৭২ সালে প্রণীত ওই সীমানা নির্ধারণী জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের পরিবর্তন বর্তমান সময়ের অন্যতম দাবি। সে সময় যখন আইনটি প্রণয়ন করা হয় তখন এ দেশের মানুষ বর্তমান সময়ের মতো এতটা শহরমুখী ছিল না।


জীবিকার তাগিদে ও শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনে গ্রামের শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও ছাত্র থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষ আজ বড় বড় শহরমুখী

একটি দেশের সব ধরনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড অবশ্যই আইনের আওতাভুক্ত থেকে মানবসহায়ক হতে হয়। দেশ পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সর্বজনবিদিত পক্ষপাতশূন্য জাতীয় নির্বাচনের বিকল্প নেই। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব উপাদান আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে বিধায় সবার কাছে এ নির্বাচনে আইনের প্রয়োগ অতি বিশ্লেষিক। এ নির্বাচন নিয়ে মানুষের উৎকণ্ঠা যেমন রয়েছে, তেমনি উচ্ছলতাও বিরাজ করে প্রাণে প্রাণে। জনগণের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় দলীয় কর্মকাণ্ড অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ কথা সবারই জানা, এ দেশের প্রেক্ষাপটে একটি দল ক্ষমতায় আসে বিপরীত পক্ষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে জনসমর্থন হারানোর ফল হিসেবে।
২০০৮ সালের সেই বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন দেশের রাজনীতির ব্যাপক উন্নয়ন ও সংস্কারকল্পে নির্বাচনী সীমানা ঢেলে সাজিয়েছে। তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি এ জন্য যে, তারা ২৪ বছর পর হলেও দেশের ৮৮টি সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস করার মতো একটি কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমবিন্যাস না হলেও দায়সারা সীমানা নির্ধারণ যে করেছে এ কারণে। তবে ওই কমিশন এ মহৎ কাজটি সম্পন্ন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। ১৯৭২ সালের সেই পুরনো জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের বিধানে এ কার্য সিদ্ধিলাভ করেছে বলে তাদের দাবি। আইনের শাসন ও প্রয়োগ যে বাস্তবতার নিরিখে পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন তা বোধহয় ওই পুতুল নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিল। তার পরও প্রচলিত আইনানুসারে ওই কমিশন যা করেছে, তাতে দেশের অনেক সংসদীয় আসনেই দেখা দিয়েছে বৈষম্যমূলক ও অপরিণামদর্শী সীমাহীন দুর্ভোগ। অনেক আসনেই প্রার্থীসহ ভোটারদের পোহাতে হয়েছে ভোগান্তি; আবার কোথাও দেখা দিয়েছে এর বিপরীত চিত্র।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ ধারার ২ নম্বর অনুচ্ছেদে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি সবিশেষ উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের সংসদীয় আসন বিন্যাসের পূর্বশর্ত হিসেবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে মোট আসনসংখ্যা অনুসারে প্রশাসনিক বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসন বিন্যাস করা হয়। এ বিষয়ে পুরনো আমলের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের সময়োপযোগী সংশোধনের অতি প্রয়োজনটুকুর কথা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের একটিবারও মনে পড়ল না। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা ১৯৭২ সালে প্রণীত ওই সীমানা নির্ধারণী জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের পরিবর্তন বর্তমান সময়ের অন্যতম দাবি। সে সময় যখন আইনটি প্রণয়ন করা হয় তখন এ দেশের মানুষ বর্তমান সময়ের মতো এতটা শহরমুখী ছিল না। জীবিকার তাগিদে ও শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনে গ্রামের শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও ছাত্র থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষ আজ বড় বড় শহরমুখী। এ শহরমুখী প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বর্তমান সময়ে গড়ে ২২ শতাংশ গ্রামবাসী বিভিন্ন শহরে অবস্থান করে, অথচ তারা ভোট প্রদান করে তাদের নিজ জন্মস্থানে। এ জাতীয় লোকজন অস্থায়ীভাবে শহরে অবস্থান করলেও সব ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে অংশ নিতে ছুটে যায় গ্রামে স্বজনদের পাশে। তখন দেখা যায় শহরের তুলনায় গ্রামে লোকসংখ্যা বেশি। অথচ নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণী আইনানুসারে আসন বিন্যাস করতে সর্বশেষ জনসংখ্যার ভিত্তি অনুসরণ করা হচ্ছে, যা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। লোকসংখ্যা অনুসারে আসন বণ্টন আগের দিনগুলোতে ঠিক থাকলেও যুগের পরিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে তা এখন শুধুই ভ্রম নীতিতে পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যা গণনা করার সময় যে যেখানে থাকে, তার নাম সে অঞ্চলেই লিপিবদ্ধ হয়। সঙ্গত কারণেই ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যার অনুপাতের সঙ্গে ভোটের অনুপাতে ব্যাপক ফারাক পরিলক্ষিত হয়। সমসাময়িক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মফস্বলের জনসংখ্যার সঙ্গে ভোটারের অনুপাত ১.৫ থেকে ২ গুণ কম, পক্ষান্তরে বড় শহরের অনুপাত প্রায় ৩ গুণ কম। এর একমাত্র কারণ ২২ শতাংশ মানুষ যারা শুমারিকালে বড় শহরে অবস্থান করেছিল, বাস্তবে তারা মফস্বলের বাসিন্দা। পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে আসন বণ্টনের ফলে নানা রকম বৈষম্যও দেখা দেয়, যার খেসারত দিতে হয় মফস্বলবাসীকে। দেশে এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রতিবছর শহরমুখী মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়বে, আর আসন হারাবে মফস্বল, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে কি একটি ভুল সমীকরণের কারণে মফস্বলের আসন এভাবে কমতেই থাকবে?
নির্বাচনী আইনানুসারে প্রত্যেক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা সংক্রান্ত অভিযোগের শুনানি বাধ্যতামূলক এবং সে অনুসারে রায় প্রদান সাপেক্ষে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা-উত্তর বরিশাল বিভাগে জাতীয় সংসদের আসন ছিল ২৩টি। পরবর্তী সময়ে ২টি অবলুপ্ত হয়ে ২১টি হয়, আর গত নির্বাচনে করা হয় ১৯টি আসন। বরিশাল বিভাগসহ দেশের মফস্বল অঞ্চলের আসন ক্রমাগত অবলুপ্ত হয়ে সেগুলো যোগ হচ্ছে বড় শহরে। শোনা যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন নতুন করে এ অঞ্চলের অবশিষ্ট আসন থেকে পুনঃঅবলুপ্ত করার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। প্রচলিত সনাতনী সীমানা নির্ধারণী আইন প্রয়োগ করলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চল থেকে আরও আসন লোপ পেয়ে বড় শহরে সনি্নবেশিত হবে। অথচ নির্বাচনকালে বড় শহরের অগণ্য লোকজন অবলীলায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়।
সনাতনী সীমানা নির্ধারণী আইন অনুসরণ করার পরও অনেক স্থানে দেখা গিয়েছিল আসন বিন্যাসে ব্যাপক বৈষম্য। উপেক্ষিত হয়েছিল অভিন্ন জেলায় আসন বণ্টন প্রক্রিয়ার প্রচলিত আইনের প্রয়োগ। ২০০৭ সালের আদমশুমারি অনুসারে পিরোজপুর জেলায় জনসংখ্যা ছিল ১১ লাখ। জেলায় ৩টি নির্ধারিত সংসদীয় আসন হিসেবে প্রতিটি আসনে জনসংখ্যার গড় দাঁড়ায় ৩.৬৬ লাখ। নির্বাচন কমিশনের অভিন্ন জেলাভিত্তিক আসন বণ্টনের নিয়মানুসারে ৩টি সংসদীয় আসনে জনসংখ্যার গড় থেকে ২৫ শতাংশ জনসংখ্যা বাড়ানো বা কমানোর নীতি মেনে আসন বিন্যাস করার বিধান রয়েছে। এ বিধান মানা হয়েছিল পিরোজপুর-১ আসনে এবং বেশি পক্ষপাতমূলক সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের ক্ষেত্রে। পক্ষান্তরে নদীসর্বস্ব এবং যোগাযোগবিচ্ছিন্ন প্রায় ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পিরোজপুর-২ (নেছারাবাদ-কাউখালী-ভাণ্ডারিয়া থানা) আসনটি হলো তুলনামূলক ব্যাপক বৈষম্যের শিকার। এ আসনের লোকসংখ্যা ৪.৫০ লাখ, যা পিরোজপুর-৩ আসনের চেয়ে প্রায় ১.৫১ লাখ বেশি। বর্তমান সংকট উত্তরণে পিরোজপুর জেলার সুসম আঞ্চলিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে এবং নির্বাচন কমিশনের সুবিধার্থে নিম্নলিখিতভাবে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস করার সপক্ষে তথ্য তুলে ধরা হলো :
পিরোজপুর-১ : পিরোজপুর, নাজিরপুর, জিয়ানগর থানা, জনসংখ্যা ৪,২১,০৯৫ এবং ভোটার ২,৫১,৫৪১ জন।
পিরোজপুর-২ : নেছারাবাদ, কাউখালী ও ভাণ্ডারিয়া থানার ৩টি ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৩,৪৪,৬৫৯ এবং ভোটার ২,০৯,৩২৪ জন।
পিরোজপুর-৩ : মঠবাড়িয়া ও ভাণ্ডারিয়া থানার অবশিষ্ট ৪টি ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৩,৪৭,৫০৩ এবং ভোটার ২,০৭,৪৫০ জন।
এ ক্ষেত্রে লোকস্বল্পতা দেখা দিলে পিরোজপুর-২ আসনকে আগের মতো অর্থাৎ পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ এবং বরিশাল জেলার বানারীপাড়া থানা নিয়ে গঠন করা শ্রেয়। কারণ স্বাধীনতা-উত্তর এ অঞ্চলের লোকজন নেছারাবাদ ও বানারীপাড়া নিয়ে একটি আসন দেখে আসছে। এখানে রয়েছে উন্নত ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ এবং এখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় অভিন্ন। সে ক্ষেত্রে পিরোজপুর-৩ আসনটি মঠবাড়িয়া, ভাণ্ডারিয়া ও কাউখালী থানার সমন্বয়ে গঠন করা যেতে পারে; কারণ উলি্লখিত স্থানের সর্বশেষ জনসংখ্যা ৪,৮১,১৩০ এবং ভোটার ২,৮৬,৪৮৮ জন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের সরকার ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। সরকারগুলোর শাসনামল ছিল ভিন্নতায় ভরা। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও দুর্নীতিতে সব সরকার যে নিবিষ্ট, এ কথা সর্বজনবিদিত। দেশের সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের কত ভাগ কাজ হচ্ছে একবার ভেবেছেন কি? কোথায় আমাদের ভবিষ্যৎ! ধিক, লজ্জা হয় যখন দুর্নীতিবাজ হিসেবে আমাদের শনাক্ত করা হয় বিশ্ব দরবারে। আবার প্রায়ই দেখি চোরের মায়ের বড় গলা। আমরা কুৎসা ও মিথ্যার পাহাড় গড়ছি এবং তা নিয়ে গর্ববোধও করছি। দেশের সাধারণ মানুষ চায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সততা, নিষ্ঠা, উন্নয়ন, যুগোপযোগী আইনের প্রয়োগ_ সর্বোপরি একটি সুন্দর দুর্নীতিমুক্ত, চাটুকারমুক্ত, উন্নত ও শান্তিময় বাংলাদেশ।

কাজী শাহিনুল ইসলাম :সমাজকর্মী
ssnr777@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.