চরাচর-খড়মের ইতিকথা by ফাহমিদা আক্তার রিম্পি

হবু রাজার হঠাৎ ভাবনা হলো, পায়ের মধ্যে কেন ধুলা লাগবে? তাঁর রাজ্যের ধুলা, অথচ কত বড় সাহস রাজ্যে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরই পায়ে এসে লাগে! মন্ত্রী গোবুরায়কে বলা হলো রাজার পায়ে যেন ধুলা না লাগে সে ব্যবস্থা করতে। হাজার হাজার ঝাড়ু দিয়ে রাজ্য ঝাঁটানো হলো- আরো ধুলাময় হলো রাজ্য, ধুলাশূন্য হলো না।


পানি দিয়ে রাজ্য ধুয়ে কর্দমাক্ত হলো, পা ফেলা গেল না। মুচিকে ডেকে সব রাজ্য চামড়ায় মুড়ে দিতে বলা হলো, এত চামড়া পাওয়া গেল না। অবশেষে একজন বৃদ্ধ বুদ্ধি দিলেন, গোটা রাজ্য চামড়ায় না ঢেকে নিজের পা দুখানি চামড়া দিয়ে ঢেকে পথে নামলেই হলো! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে, হয়ে গেল জুতা আবিষ্কার। রাজা চামড়ার জুতা পায়ে দেবেন, অন্যরা? বুদ্ধি বের হয়ে গেল। পায়ের সমান মাপ দিয়ে পাতলা করে কাঠ কেটে নিলেই হলো। আর কাঠের সামনের দিকে একটা ছোট্ট লম্বা কাঠি লাগিয়ে দিতে হবে। বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পাশের আঙুলটি দিয়ে এই কাঠিটি চেপে রেখে পথ চলতে হবে। ব্যস, সহজ সমাধান। হিন্দিতে এর নাম হলো খড়ৌঙ। বাংলায় হলো খড়ম। সংস্কৃতে এর নাম হলো পাদুকা। হিন্দু ধর্মে এই খড়ম অতি শ্রদ্ধার বস্তু। কারণ খড়ম মানে হচ্ছে দেবতা ও সাধুসন্তদের পায়ের ছাপ। জৈন ধর্মে খড়ম ব্যবহার করতেন সন্ন্যাসী ও সাধুসন্তরা। মহাকাব্য রামায়ণেও খড়মের বিশেষ ভূমিকা আছে। সাধারণ মানুষের পা পরিষ্কার রাখার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ সারা দিন কেটে যেত জমিতে চাষাবাদ করে। আর ঘর বলতে তো সেই ছোট্ট ছাউনি। বিছানাও বা কয়টি ঘরে ছিল। বিছানা যা-ও বা থাকতো, সে-ও তো একটুখানি চাটাইয়ের ব্যবস্থা। দেবতা বলতে যতটা বোঝাত মাটির মূর্তিকে। এর চেয়ে হয়তো বেশিই বোঝাত খড়ম পায়ে দিয়ে থাকা মনিবদের। তাই দেবতাদের তুষ্ট রাখার জন্য খড়ম পূজারও চল ছিল। খড়ম যেহেতু তৈরি হয় কাঠ দিয়ে, তাই এর ওজন জুতার চেয়ে বহুগুণে বেশি। তাই খড়ম পায়ে দিয়ে হাঁটা বেশ কঠিন কাজ। গ্রামবাংলার লোকজ ছড়াটি পড়লেই টের পাওয়া যায়, খড়ম পায়ে দিয়ে হাঁটা কতটা কষ্টের ছিল। ছড়াটা অনেকটা এমন- হরম বিবি খড়ম পায়/খটখটাইয়া হাঁইটা যায়/হাঁটতে গিয়া হরম বিবি/ধুম্মুর কইরা আছাড় খায়/আছাড় খাইয়া হরম বিবি/ফিরা ফিরা পিছন চায়। হজরত শাহজালাল (রহ.) ১৪০০ শতকে সিলেটে এসে বসতি স্থাপন করেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। তখন সমাজের দেবতুল্য মানুষরাই খড়ম পরতেন। হজরত শাহজালাল (রহ.) ছিলেন ঠিক সেই রকম মানুষ। তিনিও প্রথামতো খড়ম পরতেন। তাঁর সেই খড়ম এখনো রক্ষিত আছে সিলেটে তাঁর মাজারে। ধীরে ধীরে রাজা-প্রজার সম্পর্কের দূরত্ব কমতে থাকল। সাধারণ মানুষও পড়াশোনা করে নিজের অধিকার বুঝতে শিখল। খড়ম তখন কেবল দেবতাতুল্য পায়েই নয়, বরং কিছুটা স্বাবলম্বী ঘরের মানুষের পায়েও চলে আসে। পরে ধীরে ধীরে রাবার ও চামড়ার জুতার প্রচলন হয়। এখন পাদুকা দিয়ে রাজা-প্রজার পার্থক্য হয় না। খড়ম আজ হারিয়ে গেছে এই আধুনিক যুগে। কিন্তু খড়ম তার কৌলীন্যের কাহিনী রেখে গেছে। খড়ম পূজা করার মতো এত দূরত্ব এখন মানুষে মানুষে নেই।
ফাহমিদা আক্তার রিম্পি

No comments

Powered by Blogger.