কাবিখার তথ্য পেতে দ্বারে দ্বারে ধরনা, পেয়ে আক্কেলগুড়ুম- প্রকল্প কর্মকর্তার দপ্তরেই গেল সাড়ে ২৬ টন! by অরূপ রায় ও আব্দুল মোমিন

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের শৌচাগার নির্মাণ ও মেরামতে সাত টন, তাঁর দপ্তরের একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোকপি মেশিন মেরামতে সাড়ে তিন টন, প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয় মেরামতে চার টন, উপজেলা পরিষদের গাড়ির গ্যারেজ মেরামত এবং উপজেলা কার্যালয়ের সংলগ্ন ঘাস পরিষ্কারের জন্য ১২ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা হয়েছে।


মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় এই বরাদ্দ এসেছিল গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির খাদ্যশস্যের বড় একটা অংশ বরাদ্দে এভাবে অনিয়ম করা হয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প তৈরি করে তছরুপের অভিযোগও আছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য উপজেলার সদ্য সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবদুল বাছেদের কাছে দাপ্তরিকভাবে তথ্য চাইলে তিনি দিতে রাজি হননি। পরে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় এই প্রতিবেদক তথ্য কমিশনে আবেদন করেন। কমিশনের নির্দেশে গত ২৪ জুন প্রকল্প কর্মকর্তা ২০০৯-১০, ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরের কাবিখা, কাবিটা ও টিআর কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর তথ্য সরবরাহ করেন। তা থেকেই জানা গেল, শুধু ওই কর্মকর্তার কার্যালয়েই প্রকল্পের সাড়ে ২৬ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ ও খরচ দেখানো হয়েছে। খাদ্যশস্য বলতে গম ও চাল বোঝালেও সরবরাহ করা কাগজপত্রে কোথায় গম, কোথায় চাল দেওয়া হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। তবে গম বরাদ্দ হলে প্রতি টন ২৫ হাজার টাকা করে এর দাম ছয় লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। আর চাল বরাদ্দ হলে প্রতি টন ৩১ হাজার টাকা করে এর দাম দাঁড়ায় আট লাখ ২১ হাজার ৫০০ টাকা।
আবদুল বাছেদ তিন বছরের বেশি সময় সাটুরিয়া উপজেলার পিআইও পদে থেকে সম্প্রতি বদলি হয়ে যান।
যেভাবে প্রকল্প পাস হয়: গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ইউএনওর কাছে প্রকল্পের প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। ইউএনও তা পিআইওকে দিয়ে যাচাই-বাছাই করান। তাঁর প্রতিবেদন পাঠানো হয় জেলা প্রশাসকের কাছে। জেলা প্রশাসকের অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুকূলে খাদ্যশস্য বা টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই বরাদ্দের পর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন পিআইও।
শৌচাগারে সাত টন: সাবেক পিআইও আবদুল বাছেদের সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে টিআর প্রকল্প থেকে তাঁর কার্যালয়ের শৌচাগার নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে পাঁচ টন খাদ্যশস্য। পরের বছর ওই শৌচাগারে টাইলস লাগানোর জন্য ব্যয় দেখানো হয় দুই টন খাদ্যশস্য। গম বরাদ্দ করা হয়েছে ধরলে এই সাত টনের দাম দাঁড়ায় এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
কম্পিউটারে সাড়ে তিন টন: ২০০৯-১০ অর্থবছরে টিআর প্রকল্প থেকে পিআইও কার্যালয়ের একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোকপি মেশিন মেরামতের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে এক টন খাদ্যশস্য। ২০১১-১২ অর্থবছরে আবার ওই কম্পিউটার মেরামতের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় আড়াই টন খাদ্যশস্য। সাড়ে তিন টন গমের দাম ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা।
২০১০-১১ অর্থবছর পিআইওর কার্যালয় মেরামতের জন্য ব্যয় দেখানো হয় প্রায় চার টন খাদ্যশস্য। ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে পরিষদের গাড়ির গ্যারেজ মেরামত এবং উপজেলা প্রাঙ্গণের ঘাস পরিষ্কারের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২ টন খাদ্যশস্য। সরেজমিনে দেখা গেছে, গাড়ির গ্যারেজ বলতে ছোট একটি টিনের ছাপরা। এখানে মেরামতের নামে যে চাল বা গমের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে মেরামতের কোনো চিহ্ন নেই। তবে পিআইও আবদুল বাছেদের দাবি, ‘বরাদ্দ অনুযায়ী খরচ করা হয়েছে। অনিয়ম করা হয়নি।’
সাটুরিয়ার বালিয়াটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান বলেন, ‘ঘাস পরিষ্কারের জন্য সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত মালী আছেন। গ্যারেজ নির্মাণের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ আছে। এর পরও এসব খাতে ব্যয় দেখিয়ে গ্রামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নকাজ করা হয়নি।’
উপজেলাটির সদ্য বদলি হওয়া নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুল কাশেম বলেন, এসব কাজের জন্য সরকারের অন্য খাত থেকে অর্থ ব্যয় করার সুযোগ থাকার পরও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের কর্মসূচির খাদ্যশস্য ও অর্থ ব্যয় করা অনিয়ম।
কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্পের অনুমোদনপত্রে ইউএনওরও স্বাক্ষর থাকে—এই তথ্য মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ গত এক বছরে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা সঠিকভাবেই খরচ করা হয়েছে। আগে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।’
সাবেক পিআইও আবদুল বাছেদ দাবি করেন, ‘সরকারিভাবে কোনো অর্থ বরাদ্দ না থাকায় টিআর কর্মসূচির চাল-গম দিয়েই শৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি কার্যালয় ও কম্পিউটার মেরামত করা হয়েছে।’
ভুয়া প্রকল্প: সাটুরিয়া ক্রীড়া সংস্থার উন্নয়নের জন্য ২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত টিআর প্রকল্প থেকে ব্যয় দেখানো হয়েছে পাঁচ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। নথিতে এর কোনো ঠিকানা দেওয়া নেই। এই প্রতিবেদকও উপজেলায় প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো অবকাঠামো খুঁজে পাননি। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ইউএনও মো. আবুল কাশেম পদাধিকারবলে সংস্থার সভাপতি ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাস্তবে ক্রীড়া সংস্থার অস্তিত্ব না থাকলেও কাগজেকলমে আছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে যে চাল ও গমের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা বিক্রি করে কিছু টাকা খেলাধুলার জন্য ব্যয় করা হয়েছে।’ বাকি টাকার কী হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু এই সংস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারাও জড়িত, তাই কী হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০০৯-১০ অর্থবছরে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার রাধানগর পাকা রাস্তা থেকে হরিপদ সূত্রধরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণের জন্য ছয় টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেখানো হয়। জানতে চাইলে হরিপদ বলেন, ‘এ রকম একটি প্রকল্পের কথা শুনেছিলাম। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি।’
একই অর্থবছরে যৌথ বাহিনী কল্যাণ সমিতির নামে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে দুই টন খাদ্যশস্য। এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। নথিপত্রেও এর কোনো ঠিকানা লেখা নেই। কে বা কারা এই বরাদ্দ তুলেছেন তারও কোনো তথ্য নথিতে নেই। জানতে চাইলে সাটুরিয়া উপজেলার সদ্য বদলি হয়ে যাওয়া নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘সাটুরিয়াতে এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান আছে কি না, তা আমার জানা নেই।’
অফিসার্স ও কর্মচারী ক্লাবের জন্য ১২ টন খাদ্যশস্য: ২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরে টিআর ও কাবিটার প্রকল্প থেকে সাটুরিয়া উপজেলা অফিসার্স ক্লাবের উন্নয়নের জন্য তোলা হয়েছে আট টন খাদ্যশস্য ও ৫০ হাজার টাকা। সরেজমিনে দেখা যায়, অফিসার্স ক্লাবের অবস্থান উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত সংস্কারবিহীন একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে। ওই কক্ষের বাইরে একটি সাইনবোর্ড, ভেতরে একটি টেলিভিশন ও কয়েকটি চেয়ার দেখা গেছে।
পদাধিকারবলে অফিসার্স ক্লাবের সভাপতি ছিলেন ইউএনও আবুল কাশেম। তিনি বলেন, ‘আমাদের যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা খরচ করা হয়েছে।’ একটি কক্ষ আর কিছু চেয়ারটেবিল ছাড়া যেখানে কিছুই নেই, সেখানে এই টাকা কীভাবে খরচ হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব খরচেরই হিসাব আছে।’
কর্মচারী ক্লাবের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেখিয়ে তোলা হয়েছে চার টন খাদ্যশস্য। কর্মচারী ক্লাব হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আধা পাকা ভবনের একটি কক্ষ। ওই কক্ষেও একটি টেলিভিশন, কয়েকটি চেয়ার আর একটি ডাইনিং টেবিল ছাড়া কিছু নেই।
কর্মচারী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক বলেন, ‘আমার জানামতে, আমাদের এক টন চাল দেওয়া হয়েছিল, তা দিয়ে ক্লাবের শৌচাগার মেরামত করা হয়েছে।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মচারী ক্লাবের এক সদস্য প্রথম আলোকে জানান, চাল-গম তোলার পর তাঁরা পিকনিক করেছিলেন।
সাটুরিয়ার বর্তমান ইউএনও শাহীন আখতার বলেন, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে শিগগিরই মাঠে নামছে জেলা প্রশাসন। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তথ্য দিতে রাজি না হওয়ার কারণ দুর্নীতি?: ২০০৯-১০, ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে সাটুরিয়া উপজেলায় কাবিখা, কাবিটা ও টিআর কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর নাম ও বরাদ্দের পরিমাণ জানতে চেয়ে প্রথম আলোর মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি তথ্য অধিকার আইনে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পিআইও কার্যালয়ের তথ্য প্রদান কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। ওই কর্মকর্তা ২০ কর্মদিবসের মধ্যে তথ্য না দেওয়ায় জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কাছে আপিল করা হয় ২০ মার্চ। সেখানেও তথ্য না পেয়ে ২৫ এপ্রিল তথ্য কমিশনে অভিযোগ করা হয়। কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ২০ জুন তলব করেন। সেখানে শুনানি শেষে তথ্য কমিশন পিআইও আবদুল বাছেদকে ৫০০ টাকা জরিমানা করে চাহিদামতো তথ্য প্রদানের আদেশ দেন। ওই আদেশের পর ২৪ জুন তথ্য সরবরাহ করা হয়। তথ্যানুযায়ী, গত তিন বছরে এই উপজেলায় কাবিখা, কাবিট ও টিআর প্রকল্পে দুই হাজার ১৫১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য এবং এক কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এক হাজার ৭৫টি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ঠিকানা উল্লেখ না থাকায় পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি।

No comments

Powered by Blogger.