ডব্ল্যু বি ইয়েট্স্-এর কবিতা : ‘তিন ঝাড়’

তিন ঝাড়

বলল রমণী একদা প্রিয়েরে তার,
‘হায়, সেই প্রেমে আস্থা রাখে না কেউ
যে-প্রেমে সঠিক খাদ্য অপ্রতুল;
আর, যদি তুমি হারাও সে-প্রেমকেই
গাইবে কীভাবে আর ও-প্রেমের গান?
ত্রুটি যে আমার সত্যিই অতিকায়।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘কক্ষে তোমার প্রদীপ রেখো না জ্বেলে,’
বলে রমণীয়া রমণী সে পুনরায়,
‘গোপনে, যখন রাত্রি দ্বিপ্রহর,
আসব তোমার অপেক্ষ শয্যায়,
নিজেকেই নিজে যদি তা করতে দেখি,
মনে হয়, আমি ম’রে যাব লজ্জায়।’
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘গোপনে গোপনে ভালবাসি আমি তাকে,
দাসী রে আমার, বলি তোকে, বলল সে,
‘আমি জানি, আমি ম’রে যাব বুক ফেটে
যদি সে তিলেক আমাকে ভালো না বাসে,
কিন্তু আমার শুচিতা নিছনি দিলে
তখনই-বা প্রাণ ধরব কীভাবে, কীসে?
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘কাজেই, তোকেই শুতে হবে তার পাশে,
ও যেন ভাবতে পারে যে আমিই সেটা।
আর, মনে হয়, আমরা সবাই একই
জ্বলে না যখন কোনোই প্রদীপ সেথা,
আর, মনে হয়, আমরা সবাই একই
যখন শরীর- ঢাকা নয় পোশাকে তা।’
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

না-ডাকতে কোনো কুকুর, ঘণ্টা-ধ্বনি
মধ্যরাতের- শুনে সে বলত নিজে,
‘ভাগ্যে মাথায় এসেছিল চিন্তাটা,
কী-সুখী আমার প্রিয়েরে দেখাচ্ছে যে’;
অথচ যখন দাসীটিকে সারাদিন
ঝিমাতে দেখত- ব্যথা কি উঠত বেজে?
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘না, আর কোনোও গান নয়,’ বলল সে,
‘কেননা প্রেয়সী এসেছিল চুপিসারে
এক-সাল আগে পয়লাবারের মতো
দুপুর-রাতের প্রহরে আমার ঘরে,
এবং ঘড়ির ঘণ্টাটি বাজলেই
শুতে যে হবেই আমাকে চাদর মুড়ে।’
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

‘হাসি-কান্নার গান, পবিত্র গান,
কামনার গান’- বলেছিল লোকগুলো।
কেউ কি কখনও শুনেছে অমোন গান?
না- কেবল তারা সেইদিনই শুনেছিল।
কেউ কি অমোন হাঁকিয়েছে ঘোড়া আর?
না- শুধু সেদিন সে-ই তা হাঁকিয়েছিল।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

কিন্তু যেমনি ঘোড়াটির এক খুর
ইঁদুর-গর্তে গেল বিলকুল ঢুকে,
মাথা নীচে দিয়ে প’ড়েই সে ম’রে গেল
তার প্রেয়সীর চ’ক্ষের সম্মুখে-
হায় সে-ও ম’রে গেল যে তৎক্ষণাৎ,
এমনই আঘাত বেজেছিল তার বুকে।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

দাসীটি কেবল বহুদিন বেঁচে তার
কবর-দু’টির তদারকি করে, আর
দু’-কবরে দু’টি বুনেছিল সে যে ঝাড়;
যখন সেগুলি বড় হ’ল, তো সবার
মনে হ’ত, একই শিকড়ে তাদের বাড়,
গোলাপও তাদের মিলেমিশে একাকার।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

যখন দাসীর মরণের এল কাল,
পুরুত এসেছে তার পাপ-নিরাময়ে,
গোপন যা-কিছু ক’য়ে দিল বুড়ি তায়।
তাকিয়ে থাকল মুখে তার মূক হ’য়ে
পুরোহিত, আর সে ছিল সমঝদার,
বুড়িটার কথা শুনেছিল সে হৃদয়ে।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

কবর দিতে সে বলল সে-দাসীটার
তার কর্ত্রীর প্রিয়ের অপর পাশে,
তার কবরেও লাগাল গোলাপঝাড়,
আর তারপর যে-কেউ সেখানে আসে
গোলাপ তুলতে ঝাড়গুলি থেকে, কার
শিকড় কোথায়, জানতেই পারে না সে।
ও প্রিয় আমার, ও প্রিয় আমার।

(W B Yeats-এর কবিতা The Three Bushes-এর অনুবাদ)
=========================
উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্স্ (১৮৬৫-১৯৩৯)
বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, আইরিশ পুনর্জাগরণের পুরোধা-পুরুষ উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্স্ (১৮৬৫-১৯৩৯)-এর জন্ম ডাবলিনে ১৮৬৫ সালে। বাবা জন ইয়েট্স্ ছিলেন শিল্পী এবং কবিতা-চর্চায় উইলিয়ামের আবাল্য অনুপ্রেরণা। ইয়েট্স্-এর প্রথম জীবনের কবিতায় ইংলিশ রোমান্টিক রিভাইভালের এবং ভিক্টরিয় ও প্রি-র‌্যাফেলাইট কবিতার ছায়া ছিল বেশ, কিন্তু সেসময়ই, সেসব-সত্ত্বেও, তাঁর নিজস্ব বলিষ্ঠ কবিভাষাও দেখা দিতে শুরু করে, যা আরও পাকাপোক্ত হয় তাঁর, বিশেষতঃ দ্বীপান্তর-প্রত্যাবর্তী জননেতা ও’লিয়রির প্রভাবে, আইরিশ লোকপুরাণে বুঁদ হ’য়ে যাবার পরে থেকে। লেডি গ্রেগরি আর এডওয়ার্ড মার্টিনের সঙ্গে জন্ম দেন অ্যাবি থিয়েটারের, যাতে ইয়েট্স্-এর নিজের ছাড়াও বিকশিত হয়েছিল জন মিলিংটন সিঙ্-এর নাট্যপ্রতিভা। আয়ার্ল্যান্ডের মুক্তি-আন্দোলনের প্রধান নেত্রী মড গনের আজীবন (প্রত্যাখ্যাত) পুজারি ইয়েট্স্ নিজেও পরোক্ষে ঐ আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন, আর আইরিশ ফ্রি-স্টেটের জন্মের পর উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েছিলেন ইয়েট্স্। নানা অকাল্ট সঙ্গঠনের (যথা থিয়সফিস্ট সোসাইটির) সদস্য, ভারতীয় দর্শন-পুরাণের অনুরাগী ইয়েট্স্ পশ্চিমে আবিষ্কার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে, এবং সেই সুবাদে আমাদের তরফে একটু বিশেষ ধন্যবাদের পাত্র তিনি। ১৯২৩ সালে নোবেল পান, আর ১৯৩৯-এ, ফ্রান্সে মারা যান। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁর মাতৃভূমি, আয়াল্যান্ডের স্লাইগো কাউন্টির ড্রামক্লিফে তাঁর কবর হয়।
ছবি : ডব্ল্যু বি ইয়েট্স্-এর মূর্তি, সূত্র: ফ্লিকার ও ইন্টারনেট।
তিন ঝাড় (দ্য থ্রি বুশেজ ) কবিতাটা লেখা হয়েছিল একটা সাহিত্যিক খেলা হিসাবে। ইয়েট্স্-এর পরিণত বয়সের বান্ধবী, (কথিত লেজবিয়ান) কবি ডরথি ওয়েলেজ্লি কাহিনিটি প্রথমে আবিষ্কার করেন, অ্যাবে মিশেল দ্য বুর্দেয়্-এর হিস্তরিয়া মেয়ি তেম্পরিস নামক বইতে। ডরথি প্রথমে কাহিনিটি নিয়ে কয়েকটি ব্যালাড লেখেন যার কিছু পরিমার্জনা করেন ইয়েট্স্ এবং পাল্টা তিনিও কয়েকটি ব্যালাড লেখেন, যেগুলি তাঁর নিউ পোয়েম্জ্ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইয়েট্স্-এর কবিতাগুলির মধ্যে এটিই দীর্ঘ- ও পূর্ণাঙ্গতম।

============================
মাহমুদ দারবিশের কবিতা ‘অবরোধের কালে’   মাহ্‌মুদ দারবিশের কবিতা 'আমি গণহত্যা দেখেছি'  তাদেউজ রজেভিচ ও তার কয়েকটি কবিতা  স্টিফেন ডান-এর দুটি কবিতা  ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার কবিতা ও প্রিয় বন্ধুর জন্য বিলাপ   ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি ও আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কির দুটি কবিতা   মাহমুদ দারবিশের তিনটি কবিতা (পরিচয়পত্র,ও আমার পিতা...   মাহমুদ দারবিশের চারটি কবিতা ‘বিস্মৃতির স্মৃতি,নির্...  জাপানি কবিত  সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ অনুদিত আরবি কবিতা   আমেরিকানদের প্রিয় কবিতা   উইলিয়াম ব্লেইক-এর কবিতা   ৪৫টি চর্যাপদের কাবিতা অনুবাদ করেছেন সুব্রত অগাস্টি...   টম গান্-এর কবিতা : ‌’যিশু ও তার মা’    ইয়োলান্ডা কর্নেলিয়া জিভানির দুটি কবিতা   ল্যুইস ক্যারল-এর ‘হন্তদন্তের গান’   ঈশ উপনিষদ্ কবিতা -- অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ   দুটি প্রাচীন ইংরেজি গাথা -- অনুবাদ সুব্রত অগাস্টি...  ব্যানজো প্যাটারসন-এর ওয়াল্টসিং মাটিল্ডা -- অনুবাদ ...




bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.