আলোচনা- 'নেত্রীর অশ্রুপাত, হরতাল এবং অ্যাকশনে বিএনপি' by সঞ্জীব রায়

৬ নম্বর মঈনুল রোডে অবস্থিত সেনানিবাসের বাড়িটি শেষ পর্যন্ত হারাতেই হলো বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। আইন-আদালত থেকে রাজপথ_কোনোটাতেই শেষরক্ষা হলো না। ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাসের কথা বলেও দয়ালু মনের পরিচয় পেলেন না বিরোধীদলীয় নেত্রী। ১২ নভেম্বর আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ায় ১৩ নভেম্বরই বাড়িটি ছাড়তে হলো খালেদা জিয়াকে। আর এই বেদনায় কেঁদে বুক ভাসালেন তিনবার দেশের নেতৃত্বদানকারী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই বলেছেন, এমন ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার বিষয় নিয়ে ভেঙে পড়লে কিভাবে গোটা জাতির নেতৃত্ব দেবেন তিনি! আবার অনেকেই নেত্রীর এমন অশ্রুপাতের অন্তস্থ বেদনা অনুধাবন করে রাষ্ট্রের অনমনীয়তাকে কঠোর সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখেছেন।
কার স্পর্ধা নেত্রীকে কোলে তোলে!
বাড়ি থেকে বের হয়ে সরাসরি গুলশানের নিজ কার্যালয়ে যান বেগম জিয়া। সেখানেই বেদনাসিক্ত সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সন্ধ্যাবেলা। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেন, টেনেহিঁচড়ে বের করে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। উত্তেজিত সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ নাকি বলেছেন প্রয়োজন হলে কোলে তুলে নিয়ে যেতে। খুবই আশ্চর্যজনক ঘটনা! এক-এগারোর অবৈধ সরকারের শাসনামলে দুই নেত্রীর গ্রেপ্তারকালেও তো তাঁদের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেনি। একজন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে জোরপূর্বক কিংবা কোলে তুলে নিয়ে আসার পর্যায়ে কেন যাবেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা? শয়নকক্ষ থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার অবস্থা পর্যন্ত যাওয়ার সময় কেনই বা দেবেন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী? যদি খালেদা জিয়ার কথা সত্য হয়, তাহলে তিনি এতটাই বিমূঢ় ও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন স্মৃতিময় বাড়িটির মমতায় যে, ছেড়ে আসার শক্তিটুকু ছিল না। কিন্তু তা হলেও কি এতটা স্পর্ধা দেখানো ঠিক হয়েছিল উপস্থিত কর্মকর্তাদের? আর যদি আইএসপিআরের বক্তব্য মানতে হয়, তাহলে টানাহেঁচড়া করার কোনো সুযোগই ছিল না; যেহেতু স্বেচ্ছায় বাড়ি ত্যাগ করেছেন বিএনপি প্রধান।
অতঃপর জাতীয় স্বার্থে হরতাল!
১৩ নভেম্বর বেগম জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়ার খবরে রাজধানীতে সকাল থেকেই বিক্ষুব্ধ বিএনপি নেতা-কর্মীরা রাজপথে অবস্থান নেন। জাহাঙ্গীর গেট এবং দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়া পল্টনে ব্যাপকতর উত্তেজনা সৃষ্টি করে দলীয় কর্মীবাহিনী।
দুপুরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে নেতারা হরতালের সিদ্ধান্ত নেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জাতীয় স্বার্থে ১৪ নভেম্বর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করছে বিএনপি। দলের মহাসচিবের এমন ভাষ্য শুনে অনেকেই বলতে ছাড়েননি, নেত্রী কাঁদলেন আপন দুঃখে, আর হরতাল হলো জাতীয় স্বার্থে!
এই পিকেটিংবিহীন হরতালের সফলতা নিয়ে দলের মধ্যেই রয়েছে শক্তিশালী মতবিরোধ। একটি পক্ষ নেত্রীর প্রিয়পাত্র হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হুটহাট প্রস্তুতিবিহীন বড় ধরনের কর্মসূচি দিয়ে দলেরই ক্ষতি করছেন বলে মনে করেন বিএনপির অনেক নেতা। দলটির এমন ভাবনার নেতাদের মতে, সাংগঠনিক বাস্তবতা অনুযায়ী গুছিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি দিলেই কেবল সাফল্যের দেখা মিলবে।
ভুল কার? দায় কার?
বেগম জিয়ার বাড়ি ছাড়ার পর বিভিন্ন পক্ষ এ নিয়ে চরম বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। তর্কবিতর্ক চলেছে আরো আগে থেকেই। কিন্তু ১৩ তারিখের ঘটনার পর এর আইনগত কৌশল-করণীয় নিয়ে তর্ক গড়িয়েছে বিস্তর। বেগম জিয়ার আইনজীবীদের এবং একই সঙ্গে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের দাবি, যেহেতু মামলার সুরাহা হয়নি, যেহেতু সর্বোচ্চ আদালত শুনানির দিন ধার্য করেছে, ফলে হাইকোর্টের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। অতএব ১২ তারিখের পর নয় বরং ২৯ নভেম্বর নির্ধারিত শুনানির পরই বাড়ি ছাড়ার বিষয়ে ভাববেন বেগম জিয়া। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সরকার পক্ষ বলছে, হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া ৩০ দিনের সময়সীমার পরই বাড়ি ছাড়া আইনসম্মত। সর্বোচ্চ আদালত শুনানির তারিখ দিলেও আগের আদেশ স্থগিত করে লিখিত কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ফলে হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী বাড়ি খালি করা হয়েছে বলে মত দেন তাঁরা।
এই মতবিরোধের মধ্যেই আবার বিএনপির হাইপ্রোফাইল নেতা ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা দোষারোপের আঙুল তুললেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দিকে। তিনি স্পষ্ট জানালেন, আইনজীবীদের ভুলেই বেগম জিয়াকে অসময়ে বাড়িটি ছেড়ে দিতে হলো। তাঁর মতেও, হাইকোর্টের রায়ের ওপর আলাদা স্থগিতাদেশ নিয়ে রাখলে কিংবা সেটা আদালত না দিলেও আলাদাভাবে আবেদন করলে ফল ইতিবাচক হতো। শেষ পর্যন্ত আইনগত ফাঁক-ফোকর যা-ই থাকুক, ভুল-ঠিক যা-ই হোক, ঈদের আগে বেগম জিয়ার বাড়িছাড়া হওয়াটা কি বিশেষ ক্ষমতাবলে দেশের মহানুভব প্রধানমন্ত্রী ঠেকাতে পারতেন না? এমন কথাও তুলেছেন অনেকে।
অ্যাকশনে যাচ্ছে বিএনপি
ধীরে-সুস্থে সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার টার্গেট ছিল বিএনপির। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তা ত্বরিতগতিতে মাঠে নামতে হচ্ছে দলটিকে। বসে থাকার সময় নেই মোটেই। ইতিমধ্যেই লাগাতার লংমার্চ, রোডমার্চ, অবরোধ এবং হরতাল নিয়ে চিন্তাভাবনার কথা জানিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, এমন উত্তপ্ত সময়ে বিরোধী দল ভেবেচিন্তে কর্মসূচি দিতে পারবে কি না। যদিও অনেক নেতাই বলছেন, জাতীয় ইস্যু এবং সরকারের ব্যর্থতাগুলোকে আন্দোলনের বিষয় হিসেবে ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে। কিন্তু পরিস্থিতি আভাস দিচ্ছে, আদতেই বাড়ির বিষয়টি নিয়ে রাজপথ দখলে রাখতেই অ্যাকশনে যাচ্ছে বিএনপি। এমনকি ঈদের দিনও বেগম জিয়া বলেছেন, তিনি এখন বাস্তুহারা। যদিও বলে রাখা ভালো গুলশানে এখনো একটি নিজস্ব বাড়ি রয়েছে বিরোধীদলীয় নেত্রীর, মিন্টো রোডে তৈরি আছে সরকারি বাসভবন। এ ছাড়া বেগম জিয়া নিজের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন আর দেশ বাঁচাতে আহ্বান জানিয়েছেন রাজপথে আন্দোলনের। কিন্তু বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে এল বাড়ি বাঁচানোর। তবে সব মিলিয়ে ওয়ান-ইলেভেনে বিপর্যস্ত বিএনপির জন্য খালেদার এভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসাটা টনিকের কাজ করেছে দলের অভ্যন্তরে বলে মনে করছেন অনেকে। খালেদা জিয়া এখনো বিএনপিতে ঐক্যের প্রতীক। বিএনপির অভ্যন্তরের অনৈক্য এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলকে খালেদা ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সে ক্ষেত্রে বাড়ি হারানোর ইস্যুটাকে খালেদা জিয়া কতটুক দল গোছাতে কাজে লাগাতে পারেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
========================
আলোচনা- 'আরো আলোকিত হোক জনশক্তি রপ্তানি খাত'  আলোচনা- 'কানকুন সম্মেলনে আমাদের প্রত্যাশা' by শিরীন আখতার  আলোচনা- 'জনসংখ্যার বিপদ ও পরিত্রাণের পথ'  শিল্প-অর্থনীতি 'বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি:দুর্ভাবনার বিষয়' by ড. আর. এম. দেবনাথ  গল্পসল্প- 'হায়রে নাড়ি ছেঁড়াধন' by শিখা ব্যানার্জী  গল্পসল্প- 'জননী ও জন্মভূমি' by শুভ রহমান  গল্পালোচনা- ''বিভীষণ' বিদায় ও হরতাল সমাচার' by শুভ রহমান  খবর- হরতালের বিরুদ্ধে একজোট, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা  আলোচনা- 'হজ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে কিছু কথা' by এয়ার কমোডর (অব.) মুহম্মদ জাকীউল ইসলাম  শিল্প-অর্থনীতি 'কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেতন-কাঠামো' by খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ  স্মরণ- 'মীর শওকত আলী বীর উত্তম : একজন বীরের প্রতিকৃতি' by ড. আশকার ইবনে শাইখ  আন্তর্জাতিক- 'মিয়ানমারে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ' by আহসান হাবীব  রাজনৈতিক আলোচনা- 'বিচিত্র সংকটের আবর্তে একটি বাড়ি' by এবিএম মূসা  ইতিহাস- 'হাজংমাতা শহীদ রাশিমনির স্মৃতিসৌধে' by দীপংকর চন্দ  গল্প- 'ঈর্ষার রং ও রূপ' by আতাউর রহমান  ডিজিটাল-প্রযুক্তি কি মানবতাবিরোধী প্রবণতা তৈরি করে? by মোহীত উল আলম  খবর- এক দশক পর ছেলের সঙ্গে দেখা হলো সু চির  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'ট্রানজিটঃ অর্থের বাইরে বাইরে প্রাপ্তিযোগও ভাবতে হবে' by কে এ এস মুরশিদ  খবর- আমনের বাম্পার ফলনেও বাড়ছে চালের দাম by ইফতেখার মাহমুদ  রাজনৈতিক আলোচনা- 'বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি' by ফজলুল বারী


দৈনিক কালের কণ্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ সঞ্জীব রায়


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.