শিল্প-অর্থনীতি 'বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি:দুর্ভাবনার বিষয়' by ড. আর. এম. দেবনাথ

ঈদের ছুটির আগে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিনিয়োগ সম্পর্কে কতগুলো ইতিবাচক তথ্য দিয়েছেন। ঐসব তথ্যের ওপর ভর করে তিনি বলেছেন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধীরে-ধীরে স্থবিরতা কেটে যাচ্ছে। তিনি বিদু্যৎ ও গ্যাসের সমস্যার কথা উলেস্নখ করে বলেছেন এতদসত্ত্বেও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে ব্যবসায়ীরা আস্থা ফিরে পাচ্ছেন। তা না হলে মূলধনী যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটেল মেশিনারি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেত না। অর্থমন্ত্রী এমন সময়ে তার আশাবাদ ব্যক্ত করলেন যখন ২০১০-১১ অর্থবছরের ছয়মাস প্রায় গত হতে চলল। ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে। ছুটির আমেজ কাটতে না কাটতেই নভেম্বর শেষ হয়ে যাবে। অর্থ বছরের ছয় মাস শেষ হতে বাকি থাকবে মাত্র এক মাস।
ডিসেম্বর শেষেই আবার সরকারের দু'বছর পূর্তি দিবস এসে যাবে। এই অর্থে সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের জন্য। একথা আমরা সবাই জানি সব কথার শেষ কথা বিনিয়োগ। বিনিয়োগ অর্থ সকল ধরনের বিনিয়োগ-সরকারি ও বেসরকারী বিনিয়োগ। বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির (জিডিপি) হার, দারিদ্র্য নিরসনের ভাগ্য বেকারত্ব হ্রাস, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি। অতএব বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে কোন কিছুতেই অগ্রগতি সম্ভব নয়। অথচ এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার কোন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
অর্থমন্ত্রী ক্যাপিটেল মেশিনারিজ বা মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি এলসির তথ্য দিয়ে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তা সমস্যার একটা দিক মাত্র। ভিন্ন দিকটির কথা অন্তত দুইজন ইতিমধ্যেই বলেছেন। এর মধ্যে একজন প্রাক্তন অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এবং অন্যজন হচ্ছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ড. ফরাশউদ্দিন। তারা দু'জনেই বলেছেন মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি বা ঋণপত্র খোলা হচ্ছে- একথা সত্য। কিন্তু প্রকৃত আমদানি হচ্ছে না। কারণ এলসি খোলা হচ্ছে, কিন্তু তা নিষ্পত্তি বা 'সেটল' হচ্ছে না। সেটল না হওয়া পর্যন্ত আমদানি হচ্ছে- দেশে মাল এসেছে একথা বলা যাবে না। তাদের দু'জনের বক্তব্য শুনে আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের 'ওয়েবসাইটে' যাই সর্বশেষ আমদানি তথ্য জানার জন্য। দেখলাম দু'জনের বক্তব্যেরই সত্যতা আছে। যে সর্বশেষ তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক দিচ্ছে তাতে আছে জুলাই-আগস্টের তথ্য। অর্থাৎ বর্তমান অর্থ বছরের প্রথম দুই মাসের খবর। যদিও তথ্য দুই মাসের তবু প্রবণতা বুঝতে এটাই আমাদের সাহায্য করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির 'এলসি' খোলা হয়েছে ৫৭৩ মিলিয়ন ডলারের। এই সময়ে 'এলসি' নিষ্পত্তি বা 'সেটল' হয়েছে মাত্র ২৮০ ডলারের। আগস্ট মাসান্তে বকেয়া 'এলসি' যা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১৫০৩ মিলিয়ন ডলারের। এখন এই তথ্যের বিপরীতে গেল বছরের অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তথ্য তুলনা করলে দেখা যাবে এবারে এলসি খোলার পরিমাণ বেশি, কিন্তু 'নিষ্পত্তির' পরিমাণ সেভাবে বাড়েনি। অপরদিকে 'আউটস্ট্যান্ডিং এলসি' অর্থাৎ অনিষ্পত্তিকৃত ঋণপত্রের পরিমাণও এবারে অনেক বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে 'এলসি' খোলার পরিমাণ ছিল ২৯০ মিলিয়ন ডলার। এই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২২৭ মিলিয়ন ডলারের এলসি এবং 'আউটস্ট্যান্ডিং এলসির' পরিমাণ ছিল ৯৩৭ মিলিয়ন ডলারের। এলসি 'নিষ্পত্তি' বা মাল প্রকৃত অর্থে দেশে না আসলে 'আউটস্ট্যান্ডিং এলসির' পরিমাণ বাড়ে। গেল বছরের আগস্ট মাসান্তে আউটস্ট্যান্ডিং এলসির পরিমাণ ছিল ৯৩৭ মিলিয়ন ডলারের। এবার একই সময়ান্তে 'আউটস্ট্যান্ডিং এলসির' পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৫০৩ মিলিয়ন ডলার। এর থেকেই বোঝা যায় যে হারে 'এলসি' খোলা হচ্ছে সেই হারে মূলধনী যন্ত্রপাতি দেশে প্রকৃত অর্থে আসছে না।
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানীর কথা হচ্ছে কেন? হচ্ছে কারণ দেশে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে কী না তা বোঝার জন্য এটি একটি অন্যতম সূচক। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানীর অর্থ- হয় নতুন প্রকল্প হচ্ছে নতুবা পুরনো প্রকল্পের সম্প্রসারণ/ ব্যালেন্সি/ আধুনিকীকরণ হচ্ছে। এ কারণেই মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানীর তথ্য নিয়ে এত কথা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী যতটুকু আশাবাদ ব্যক্ত করছেন বাস্তবের অবস্থা ততটা স্বস্তিদায়ক নয়। অথচ এটি যতদিন পর্যন্ত না স্বস্তিদায়ক হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের জন্য খারাপ খবর। বিনিয়োগের পরিবেশে যে সমস্যা রয়েছে তা অর্থমন্ত্রী নিজেই বলছেন। বলছেন বিদু্যতের সমস্যার কথা, গ্যাসের সমস্যার কথা। তবে এটাও দৃশ্যমান যে বিদু্যতের পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য সরকার আন্তরিক। যদি আগামী বছরের জুনের মধ্যে এ ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয় তখন বিনিয়োগে বাতাস লাগতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক একথা বলা যাচ্ছে না। এই কয়দিন আগেই দেখলাম সরকারি বিনিয়োগের ওপর কিছু তথ্য। সরকারি বিনিয়োগ বলতে বোঝায় 'বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি' (এডিপি)। জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর এই তিন মাসের 'এডিপি' বাস্তবায়নের হার ছিল হতাশাজনক। সরকারের শত চেষ্টার পরও দেখা যাচ্ছে গেল অর্থবছরের তুলনায় বর্তমান অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে 'এডিপি' বাস্তবায়নের হার ছিল কম। অথচ তা হওয়ার কথা ছিল বেশি। কারণ সরকার কতর্ৃক অনেক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল 'এডিপি' বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিতকরণের জন্য। 'এডিপি'র টাকা খরচের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যাতে দুর্নীতির মামলা না হয় তার ব্যবস্থা সরকার করেছে। এছাড়া অনেক পদক্ষেপের কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতি যেখানে ছিল সেখানেও নেই, তার চেয়ে অবনতি ঘটেছে। অর্থাৎ সরকারি বিনিয়োগে আশানুরূপ গতি আসেনি।
বিনিয়োগের মন্দা পরিস্থিতি সম্বন্ধে খবর দেয় ব্যাংকিং খাত। বিনিয়োগে ঊধর্্বগতি দেখা দিলে তার প্রথম খবর পায় ব্যাংকিং খাত। ঋণের চাহিদা বাড়ে। 'লিকু্যইডিটি' বা ফান্ডের সমস্যা হয়। ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের তাগিদ বাড়ে। এসবের কিছুই ব্যাংকিং খাতে এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রচুর 'লিকু্যইডিটি' ব্যাংকিং খাতে। অতিরিক্ত তারল্যে ব্যাংকিং খাত ভাসছে। ফান্ড আছে, বিনিয়োগযোগ্য ফান্ড আছে, কিন্তু গ্রাহক নেই। নতুন গ্রাহক নেই। এ সমস্যায় পড়ে ব্যাংকগুলো এখন শেয়ার বাজারের দিকে ঝুঁকছে। প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে সকল ব্যাংক প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা শেয়ার বাজারে এখন খাটাচ্ছে। নতুন কাস্টমার না পেয়ে পুরনো 'কাস্টমারদেরকে' কলাকৌশলে তারা অতিরিক্ত ঋণ মঞ্জুর করছে। এই ঋণের টাকাও যাচ্ছে শেয়ার বাজারে অথবা জমি-জমা ক্রয়ে। এদিকে ব্যাংকিং খাত নতুন আরেকটি ফিনান্সিং ক্ষেত্র তৈরি করেছে যা এখন অগ্রাধিকারখাতের মত। এটি হচ্ছে 'এসএমই'।
ব্যাংকগুলো 'এসএমই' ফিনান্সিং-এ ততটা দক্ষ নয়। এ ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতাও কম। কিন্তু তাহলে কী হবে, ফান্ড আছে প্রচুর, তাগিদ আছে সরকারের। অতএব যেনতেন প্রকারে এ ক্ষেত্রে ঋণ দাও। এতে ঋণের অপব্যবহার বাড়ছে। এ ঋণের একাংশও যাচ্ছে শেয়ার এবং অন্যান্য অনুৎপাদনশীল খাতে। প্রয়োজনের তুলনায় ঋণ বেশ কিছুটা বেশি বলে অনেকের ধারণা। মূল্যস্ফীতির এটি একটি কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দামে ঊধর্্বগতি এটা প্রয়োজনাতিরিক্ত ঋণ, অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি, সিন্ডিকেটীয় ব্যবসার উত্থান, সরকারি নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের অনুপস্থিতি, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা ইত্যাদি কারণে অর্থনীতি আরেকটি মারাত্মক রোগের শিকার হয়ে পড়ছে। এই রোগটি হচ্ছে গরীবের শত্রু, মধ্যবিত্তের শত্রু, উন্নয়নের শত্রু ও স্থিতিশীলতার শত্রু মূল্যস্ফীতি। সাথে বিনিয়োগের গভীর সম্পর্ক। এই সম্পর্কটি বজায় না থাকায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তো বাড়ছেই। ২০১০ সালের জুলাই মাসে বারো মাসের গড়ের ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল সাত দশমিক ৬৩। আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে সাত দশমিক ৮৭। এমতাবস্থায় বলা যায় বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতিই এই মুহূর্তে অর্থমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় উৎকণ্ঠার বিষয়।
=========================
গল্পসল্প- 'হায়রে নাড়ি ছেঁড়াধন' by শিখা ব্যানার্জী  গল্পসল্প- 'জননী ও জন্মভূমি' by শুভ রহমান  গল্পালোচনা- ''বিভীষণ' বিদায় ও হরতাল সমাচার' by শুভ রহমান  খবর- হরতালের বিরুদ্ধে একজোট, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা  আলোচনা- 'হজ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে কিছু কথা' by এয়ার কমোডর (অব.) মুহম্মদ জাকীউল ইসলাম  শিল্প-অর্থনীতি 'কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেতন-কাঠামো' by খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ  স্মরণ- 'মীর শওকত আলী বীর উত্তম : একজন বীরের প্রতিকৃতি' by ড. আশকার ইবনে শাইখ  আন্তর্জাতিক- 'মিয়ানমারে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ' by আহসান হাবীব  রাজনৈতিক আলোচনা- 'বিচিত্র সংকটের আবর্তে একটি বাড়ি' by এবিএম মূসা  ইতিহাস- 'হাজংমাতা শহীদ রাশিমনির স্মৃতিসৌধে' by দীপংকর চন্দ  গল্প- 'ঈর্ষার রং ও রূপ' by আতাউর রহমান  ডিজিটাল-প্রযুক্তি কি মানবতাবিরোধী প্রবণতা তৈরি করে? by মোহীত উল আলম  খবর- এক দশক পর ছেলের সঙ্গে দেখা হলো সু চির  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'ট্রানজিটঃ অর্থের বাইরে বাইরে প্রাপ্তিযোগও ভাবতে হবে' by কে এ এস মুরশিদ  খবর- আমনের বাম্পার ফলনেও বাড়ছে চালের দাম by ইফতেখার মাহমুদ  রাজনৈতিক আলোচনা- 'বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি' by ফজলুল বারী


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্যে
লেখকঃ ড. আর. এম. দেবনাথ
অর্থনীতিবিদ


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.