আলোচনা- ডিজিটাল-প্র্রযুক্তিই মানুষকে আরও বেশি মানবিক করে! by মুনির হাসান

ত ২৪ নভেম্বর প্র্রথম আলোর উপসম্পাদকীয় পাতায় ‘ডিজিটাল-প্র্রযুক্তি কি মানবতাবিরোধী প্র্রবণতা তৈরি করে?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন শিক্ষক, অধ্যাপক মোহীত উল আলম। লেখাটি ছাপা হওয়ার আগের দিন অর্থাৎ ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের সদর দপ্তরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। গুলশানের উপকণ্ঠে গ্রামীণফোনের সদর দপ্তর ভবনটিকে ঢাকার প্র্রথম সবুজ বিল্ডিং বলেছেন অনেকে।
বিশেষত, এর খোলামেলা পরিবেশ, নিজস্ব বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা আর এর শীতাতপব্যবস্থার জন্য বাড়তি পানি ব্যবহার না করার কারণে। ওই অনুষ্ঠানে দেশের প্র্রথম ‘মোবাইল ফোন লেডি’ লায়লা বেগম স্মৃতি রোমন্থন করেন এক যুগ আগের তাঁর কার্যক্রমের শুরুর দিনটি। নিজ গ্রাম থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তিনি আমাদের দেশের মানবিকতার সহজ প্র্রকাশ, নিজ বাড়িতে শাক-ভাতের আমন্ত্রণ জানাতে পেরেছিলেন প্র্রধানমন্ত্রীকে। অনুষ্ঠান শেষে আমাদের ওই ভবনের নানা অংশ ঘুরিয়ে দেখানো হয়। সেটা দেখতে গিয়ে আমরা দেখলাম সেখানকার কর্মীদের কাজের রুমগুলোতে কোনো পার্টিশন নেই, এমনকি কর্মীদের নিজস্ব বা নির্দিষ্ট কোনো বসার জায়গা নেই! ওই অফিসের সব কাজই হয় ডিজিটাল-প্র্রযুক্তিতে। কর্মীদের প্রত্যেকের ডেস্ক নেই, তবে ল্যাপটপ আছে। এটি নিয়ে সে বসে পড়তে পারে যেকোনো শূন্য আসনে। কাজ শেষে টেবিল ফাঁকা করে সে উঠে পড়ছে, সেখানে বসে পড়ছে অন্য কেউ। ডেস্কে বসে কাজ করতে না চাইলে সমস্যা নেই। কাজের চাপে মাথা ধরলে, এমনকি চলে যাওয়া যায় খোলা জায়গায় বা ক্যাফেটেরিয়ায়। সেখানে বসেও নিজের কাজ সেরে নেওয়া যায়। কেবল কর্মীদের জন্য নয়, এ ব্যবস্থা সব বড় কর্তার জন্যও প্রযোজ্য। বড় কর্তারাও ঘুরেফিরে নানা জায়গায় তাঁর সহকর্মীদের পাশে বসে কাজ করতে পারেন, কাজের ফাঁকে গল্প করতে পারেন সদ্য যোগ দেওয়া নবীনতম সহকর্মীর সঙ্গে। এতে অফিসের সবার মধ্যে মানবিক সম্পর্কগুলো অনেক বেশি অযান্ত্রিক হয়ে উঠবে, এতে সন্দেহ কি।
কাগজবিহীন অফিস উন্নত দেশগুলো শুরু করেছে আগেই। আমরাও শুরু করলাম। তবে অফিস বা ডেস্কবিহীন অফিস আমাদের দেশেও কয়েক বছর ধরে চালু আছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা, যেমন নেটওয়ার্ক সামগ্রী নির্মাণ সংস্থা সিসকো, কম্পিউটার নির্মাতা ডেল প্রভৃতি সংস্থার বাংলাদেশি কর্মীরা নিজেদের বাসায় বসে কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গে ই-মেইলে বা ফোনে যোগাযোগ করা যায়। প্রয়োজনে তাঁরা ছুটে যান গ্রাহকের আঙিনায়। ফলে পরিবারের প্রতি বাড়তি নজর তাঁরা দিতে পারেন, হয়ে উঠতে পারেন অনেক বেশি সামাজিক ও মানবিক। আর এসবই সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল-প্রযুক্তির সর্বশেষ উন্নতির জন্যই।
মোহীত উল আলম সাহেব কয়েকটি ঘটনার কথা লিখেছেন তাঁর নিবন্ধে। প্রথমটি আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে একজন বিজ্ঞানকর্মীর পড়ে যাওয়ার ঘটনা। এরপর শিক্ষার্থীরা তাঁর ছবি তুলেছেন, টুইটার, ফেসবুকের মাধ্যমে সে খবর ছড়িয়ে দিয়েছে (এটি ঘটেছে বলেই কিন্তু নিবন্ধ লেখক সেটি জানতে পেরেছেন। কারণ, ডিজিটাল-প্রযুক্তি না থাকলে প্রচলিত সংবাদকর্মীরা এই খবর মোহীত উল আলমের কাছ পৌঁছানোর জন্য সংগ্রহই করতে পারতেন না!)। তাঁর আপত্তি হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা কেন এমনটি করলেন। কেন তাঁরা সবাই ওই লোকটিকে ধরাধরি করে হাপাতালে নিয়ে গেলেন না। তাঁর ধারণা হলো, শিক্ষার্থীদের হাতে যদি ডিজিটাল-প্রযুক্তি না থাকত, তাহলে তাঁরা এমনটি করতেন না! কিন্তু আসলে কি তা-ই হতো? যদি সেখানে কারও হাতে মোবাইল বা ক্যামেরা না থাকত, তাহলেও কিছুসংখ্যক উপস্থিতি কেবল তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করত, কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করত আর বাকিরা দূরে থাকত। প্রযুক্তি হাতে থাকায় খবরটি সবাই পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করতে পেরেছে। আগে যেমন সবাই ঝাঁপিয়ে না পড়লে আমরা শিক্ষার্থীদের যাঁরা মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ব, নৈতিকতা শিক্ষা দেন, সে শিক্ষক আর শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করতাম, এখনো আমাদের তাই-ই করতে হবে। ডিজিটাল-প্রযুক্তির ঘাড়ে সে দায় চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তি বরং তাকে অনেক বেশি মানবিক হতে শেখায়।
মোহীত সাহেব এরপর সম্প্র্রতি আমাদের দেশে হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া ইভ টিজিং, ডিজিটাল-প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারণা, মেয়েদের একান্ত আপন কিছু সময়কে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মকে দায়ী করেছেন, তাঁদের ডিজিটাল-প্রযুক্তিবান্ধবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, ‘যে হারে যৌন সংস্কৃতির আন্তর্জাতিকতা হয়, সে হারে হয় না সাহিত্য, অর্থনীতি বা বিজ্ঞানের।’ এবং সমাধান দিয়েছেন প্রযুক্তিপণ্যের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে।
২৪ নভেম্বর বুধবার যেদিন মোহীত উল আলমের নিবন্ধটি ছাপা হয়েছে, ঠিক সেদিনই প্রথম আলোর ‘নারীমঞ্চ’ পাতায় ছাপা হয়েছে ঢাকার গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থী শ্রাবণী সমাদ্দারের অসুস্থতার খবর। পত্রিকায় পড়ার আগেই আমাকে খবরটি জানায় আমার ফেসবুক বন্ধু! ফেসবুকেই আমি বিস্তারিত জানতে পারি আর রাতে বাসায় ফিরে প্রথম আলোয় শ্রাবণীর মায়ের আবেদনটি পড়ি। শ্রাবণীর জন্য ৪০ লাখ টাকার সহায়তা প্রয়োজন। গত দুই দিন আমি আশ্চর্য হয়ে দেখেছি, আমাদের নতুন প্রজন্ম কেমন করে শ্রাবণী আর তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে, ওই ডিজিটাল-প্রযুক্তির সহায়তায়। ফেসবুক, টুইটার তো আছে। ব্লগে ব্লগে তারা আহ্বান জানাচ্ছে শ্রাবণীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য। শুধু আহ্বান নয়, নিজেদের সাধ্যমতো তারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে শ্রাবণীর পাশে। এক স্কুলছাত্র লিখেছে, তার কাছে ৮০ টাকা জমেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সেটি ১৫০ টাকা হবে এবং সেটি সে শ্রাবণীর জন্য দেবে! এমটিবি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা, যে আমাকে খবরটি দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের ভিসা আনার জন্য দিল্লি গিয়েছেন, সেখানে বসে তিনি চেষ্টা করছেন খবরটি সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শ্রাবণীকে তিনি কেমন করে চেনেন? আমাকে বিস্মিত না করেই তিনি জবাব দিয়েছেন, ‘সরাসরি চিনি না। কখনো দেখিনি বা কথা হয়নি। তবে শ্রাবণী আমাদের আত্মার আত্মীয়।’ প্রথম দুই দিনে এই প্রজন্ম তিন লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে শ্রাবণীকে। দেশের বাইরে থেকেও সাড়া পড়তে শুরু করেছে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, বুয়েটের শিক্ষার্থী হূদয়ের চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহের সময় আমরা নতুন প্রজন্মের ঔদার্য আর ভালোবাসার বড় হূদয় দেখেছি। এবারও দেখছি। সেবার তাদের জন্য কেবল পত্রিকা আর ই-মেইল ছিল ভরসা।
গত এক বছর চার মাসে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক লাখ থেকে প্রায় ১১ লাখে পৌঁছেছে। আর মোবাইল ব্যবহারকারী সাড়ে ছয় কোটি। তার সহজ মানে দাঁড়ায়, ইন্টারনেট ব্যবহার করার মতো ডিজিটাল-প্রযুক্তি তাদের আছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। এ সংখ্যার বিপরীতে যে কয়টি মোবাইল, ক্যামেরা নানা অপকর্মে ব্যবহূত হয়, তার সংখ্যা কত? শতকরা হিসাবে সেটি কোনোভাবেই ১ শতাংশও হবে না। আমরা কি ১ শতাংশের গুরুত্ব বেশি দেব, না ৯৯ শতাংশের? নতুন প্রজন্মকে মানবিকতা, নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা, তার একটি অমানবিক বিষয় ২৬ নভেম্বর জাফর স্যার (মুহম্মদ জাফর ইকবাল) এই প্রথম আলোতেই লিখেছেন। মাত্র কয়েকজন শিক্ষক চাইলেই শিক্ষার্থীদের এই অমানবিক, মানবেতর যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিয়ে নিজেদের মানবিক প্রমাণ করতে পারেন এবং সেটি পারবেন কারণ, ডিজিটাল-প্রযুক্তি এখন সে সুযোগ তাঁদের করে দিয়েছে।
=========================
খবর- সংরক্ষিত বনে শুঁটকিপল্লি  ট্রেনের ওপর ট্রেন  সংকেত অমান্য, দুই ট্রেনের সংঘর্ষ  আলোচনা- রবীন্দ্রনাথের কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন ভাবনা  আলোচনা- 'ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ঠাঁয় নেই দরিদ্রর উচ্চ শিক্ষা  বিশেষ আলোচনা- ফিরে দেখা গঙ্গা চুক্তি  আলোচনা- 'সংসদ বর্জনের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক'  আলোচনা- 'উইকিলিকসে বাংলাদেশ, তারপর?  আলোচনা- 'ওয়াংগালাঃ গারোদের জাতীয় উৎসব'  স্মরণ- 'বাঘা যতীনঃ অগ্নিযুগের মহানায়ক'  খবর, কালের কণ্ঠের- আগেই ধ্বংস মহাস্থানগঃ হাইকোর্টের নির্দেশে কাজ বন্ধ  কেয়ার্নের সঙ্গে স্বার্থবিরোধী চুক্তির পেছনেও জ্বালানি উপদেষ্টা  উইকিলিকস জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের আত্মসমর্পণ  সবুজ মাঠ পেরিয়ে  আলোচনা- 'আরো অনুদানের টাকা সরিয়েছিলেন ইউনূস'  আলোচনা- 'একটি 'উজ্জ্বল ভাবমূর্তির' এভারেস্ট থেকে পতন  গল্পালোচনা- 'আসি আসি করে আশিতে আসবে!'  রাষ্ট্র ও রাজনীতিঃ সবুজ মাঠ পেরিয়ে  স্মরণ- 'রবীন্দ্রনাথ—সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে'  স্মরণ- 'জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী'  আলোচনা- 'প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন পর্যায়'  আলোচনা- 'কর্মপরিবেশঃ স্বর্গে তৈরি'  গল্পালোচনা- ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...’  আন্তর্জাতিক- উইকিলিকসঃ হাটে হাঁড়ি ভাঙা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ  গল্পসল্প- ওরা ধান কুড়ানির দল  শিক্ষা- আদিবাসী পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় চাই  জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অর্থের মূল উৎস সৌদি আরব  রাজনৈতিক আলোচনা- এমন বন্ধু থাকলে...  শিল্প-অর্থনীতি শেয়ারবাজারের সুন্দরী প্রতিযোগিতা-তত্ত্ব  সাক্ষাৎকার- খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতা হবে  খবর, প্রথম আলোর-  দলীয় স্বার্থ বড় করে দেখবেন না  মার্কিন কূটনীতিকদের গোপন তারবার্তাঃ পাকিস্তানে জঙ্গি নির্মূলে ১০-১৫ বছর লাগবে  অধ্যাপক ইউনূসের অর্থ স্থানান্তর : গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাখ্যা  শিল্প-অর্থনীতি 'সময় এসেছে মাথা তুলে দাঁড়াবার'


দৈনিক প্রথম আলো এর সৌজন্যে
লেখকঃ মুনির হাসান
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.