মীরাক্কেলের মঞ্চে ওঁরা চার বাঙাল by মেহেদী মাসুদ

ভারতের জি বাংলার মীরাক্কেল রিয়েলিটি শো দারুণ জনপ্রিয়। এবার ভারতীয়দের পাশাপাশি বাংলাদেশের চার তরুণও মাতিয়ে দিচ্ছেন আসরটি। সম্প্রতি এই চারজন অবকাশযাপনের জন্য এসেছিলেন বাংলাদেশে। তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতা নিয়েই এই আয়োজন মাত্র সাত মাসেই পাল্টে গেল সব। যেখানেই যাচ্ছেন, তাঁদের ঘিরে মানুষের ভিড় জমে যাচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। কথা বলছেন।


গত বছরের জুন মাসে তাঁরা যখন বাংলাদেশ থেকে যান, তখন চিত্রটা ছিল একেবারেই উল্টো। মো. জামিল হোসেন, ইশতিয়াক নাসির, আনোয়ারুল আলম (সজল) ও আবু হেনা (রনি)—‘মীরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জার-৬’ পাল্টে দিয়েছে এই চারজনের জীবন। ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি বাংলার এই রিয়েলিটি শোর চূড়ান্ত পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশের এই চার প্রতিযোগী। তাঁদের সঙ্গে আছেন পশ্চিমবঙ্গের পাঁচজন।
পরিবার থেকে এর আগে কখনোই জামিল, ইশতিয়াক, সজল কিংবা রনিকে এতটা সময় দূরে থাকতে হয়নি। তাই তো ‘মীরাক্কেল’ থেকে সপ্তাহ খানেকের ছুটি পেয়ে সোজা চলে এলেন দেশে পরিবার আর পরিচিতজনদের কাছে।
জামিল ঢাকায় একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের বিপণন ব্যবস্থাপক, ইশতিয়াক স্নাতক করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। মাত্র দেড় মাস কাজ করেছেন সেখানে। এর পরই সুযোগ পান ‘মীরাক্কেল’-এ। সজল এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ করছেন আর রনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র।
গত শনিবার সকালে প্রথম আলোর কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয় জামিল, ইশতিয়াক আর সজলকে। রনি তখন ছিলেন নাটোরে, নিজের বাড়িতে মায়ের কাছে।
‘মীরাক্কেল’-এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পর্বে জোকস বলতে হবে ১০টা আর যদি স্ক্রিপ্ট হয়, তাহলে সময় পাঁচ মিনিট। এই রিয়েলিটি শোর পেছনের মূল ব্যক্তিটি শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। তাঁরই পরামর্শে কয়েকটি চরিত্র বেছে নেন প্রতিযোগীরা। আর জোকস কিংবা স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন সেই চরিত্র ঘিরেই। কিন্তু একসময় সেই চরিত্রের জনপ্রিয়তার কারণে নিজের নামটি ঢাকা পড়ে যায়। ঠিক তেমনটিই হয়েছে জামিল, ইশতিয়াক ও সজলের। এখন তাঁরা পরিচিত চাচা (জামিল), মাগার মাছ (ইশতিয়াক) আর নলাদা (সজল) নামে।
সবাইকে যাঁরা আনন্দ দিচ্ছেন, ওখানে তাঁদের দিনগুলো কেমন কেটেছে? সজল বললেন, ‘জানতামই না, আমাদেরই জোকস খুঁজে বের করতে হবে। ভেবেছিলাম, ওনারা দেবেন আর আমরা শুধু বলব। শুরুতেই ধাক্কা। ঢাকা থেকে জোকসের বই পাঠাতে বললাম। এরই মধ্যে চলে গেল ১৫ দিন।’ ইশতিয়াক বললেন, ‘প্রথম এক মাস তো শুধু কান্নাকাটি করতাম। হাতে জোকসের বই দেখলে তাঁরা এসে তা ছুড়ে ফেলে দেন। কড়া নির্দেশ—নতুন জোকস বলতে হবে।’ আর জামিল বললেন, ‘.চূড়ান্ত বাছাইয়ের সেই দিনটির কথা কখনোই ভুলতে পারব না। সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।’
গোড়াতেই এই প্রতিযোগীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সৌরভ পালভি, ডা. কৃষ্ণেন্দু, রাজীব ব্যানার্জি, অর্ণব আর শুভদীপ। জামিলের ভাষায়, ‘তাঁরা মেন্টর। প্রতিযোগীদের তাঁরাই সাহস জোগান। প্রয়োজনীয় সব পরামর্শ দেন।’
আড্ডায় তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া গেল একটি মজার তথ্য। সজল বললেন, ‘আমরা থাকি লেক ল্যান্ডে একটা রিসোর্টে। সেখানে আছে বড় পুকুর। আর পুকুর ঘিরে অনেকগুলো নারকেলগাছ। আমাদের প্রত্যেকেরই বসার জায়গা ওই নারকেলগাছের নিচে। প্রত্যেকের জন্য আলাদা গাছ।’
জামিল বললেন, ‘আমরা ঘুমের জন্য সময় পাই রাতে মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা। পুরো সময়টাই আড্ডার মধ্যে থাকি। এর মধ্য দিয়েই নতুন নতুন ভাবনা আর জোকস তৈরি হয়।’
ইশতিয়াক বললেন, ‘আমি সামনে যা দেখি, তাই নিয়ে জোকস তৈরি করি। এই যেমন এবার যখন সড়কপথে দেশে ফিরছি, তখন ভারতীয় সীমান্তে আমাদের দেখে সে কী খাতির! কর্মকর্তারা নানাভাবে সহযোগিতা করলেন। চলে এলাম বাংলাদেশের সীমান্তে। বাংলাদেশের কাস্টমস কর্মকর্তারাও খাতির করলেন। কয়েকজন লোক এসে আমাদের ব্যাগ ধরে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ৫০ টাকা দিন। বুঝতে পারলাম, বাংলাদেশে এসেছি। সাভার থেকে কল্যাণপুরে আসতে সময় লেগেছে চার ঘণ্টা। বুঝলাম ঢাকায় এসেছি।’
নলাদার ব্যাপারে সজল বললেন, ‘একসঙ্গে দুই পর্বের শুটিং হতো। আমি ২০টা জোকস তৈরি করেছি। শুভঙ্করদা শুনে বললেন, তুমি একটা চরিত্র ভাবো, তাহলে জোকসগুলো আরও আকর্ষণীয় হবে। তখন হঠাৎ নলাদা নামটি মাথায় এল।’
ইশতিয়াক বললেন, ‘আমার তো ন্যাড়া মাথা। প্রথম পর্বে তেমন কোনো ভালো জোকস ছিল না। টাক মাথা নিয়ে একটা জোকস বলেছিলাম। সেই থেকে মীরদা আমাকে মাগার মাছ (কুমির) ডাকতে শুরু করলেন।’
‘মীরাক্কেল’ অনুষ্ঠানটির অন্যতম আকর্ষণ উপস্থাপক মীর। এই মীরকে নাকি গোড়াতে সবাই ভয় পেতেন। টিভিতে যে মানুষটিকে এত হাশিখুশি আর প্রাণবন্ত দেখা যায়, ক্যামেরার পেছনে নাকি তিনি একেবারে উল্টোটি। তবে মীরাক্কেলের সব প্রতিযোগীকে মুহূর্তেই আপন করে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। আর ক্যামেরার সামনে যা যা করেন, তার কোনোটাই নাকি আগে থেকে লেখা থাকে না।
‘মীরাক্কেল’-এর তিন বিচারক রজতাভ দত্ত, শ্রীলেখা মিত্র ও পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাপারে সবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।
আড্ডা শেষ হচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যেই ‘মীরাক্কেল’-এ ফিরতে হবে এই চার প্রতিযোগীকে। থামিয়ে রেখেছে ভিসা জটিলতা। জানালেন, এখন চলছে এসএমএস রাউন্ড। বাংলাদেশ থেকে যেকোনো মুঠোফোন থেকে ২২৩৩ নম্বরে যে কেউ ভোট দিতে পারবেন। নিয়মটা প্রতিটি পর্বেই অনেকবার দেখানো হচ্ছে। হয়তো সবার এই ভোটই বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ভাগ্য।

No comments

Powered by Blogger.