চারু শিল্প- ঐতিহ্যের মধ্যে সমকাল by নির্লিপ্ত নয়ন

শিল্পকলার আধুনিকায়নের কালে শিল্পকর্মের মধ্যে শিল্পীর চেতনাগত অবস্থান এবং বিবেচনার বিষয়টি বেশ পোক্ত। যতই দিন যাচ্ছে এটি আরও শক্তপোক্ত হচ্ছে। চিন্তার বহিরাবরণ নয়, শিল্পীরা এখন তাঁদের চিন্তার অন্তর্নিহিত তলানিটুকুও দর্শকের সামনে প্রকাশ করতে চান। আর এ ক্ষেত্রে শিল্পকর্মের পরিসরের মধ্যে তাঁরা স্বীকার করে নিয়েছেন স্পেসের বাস্তবতাকে।
এর সঙ্গে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, স্থাপত্য, অডিও-ভিডিও—সবটা মিলে তৈরি হচ্ছে শিল্পকর্মের নতুন জগৎ। স্পেস এখানে মুখ্য। এই ধারার শিল্পকর্ম অনেক আগ থেকেই ইনস্টলেশন আর্ট বা স্থাপনাশিল্প খেতাবে পরিচিত। সমপ্রতি বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের আয়োজনে আন্তর্জাতিক চারুশিল্পী কর্মশালায় বিভিন্ন ধরনের স্থাপনাশিল্পের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের ২০ জন শিল্পী এবার উন্মোচন করলেন তাঁদের চিন্তার মোড়ক। কর্মশালার স্থান হিসেবে বৃত্ত এ বছর বেছে নিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী পানাম নগরকে। পানামের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সমকালীন বাস্তবতার যোগসাজশে শিল্পীর চিন্তার ছাপ স্বভাবতই প্রকাশ পেয়েছে তাঁদের শিল্পকর্মে। সেকাল-একালের সুচারু মেলবন্ধন ঘটিয়ে ক্ষয়িষ্ণু সোনারগাঁ সভ্যতার ইট-পাথরের মধ্য থেকে এই কর্মশালায় শিল্পীরা বের করে এনেছেন শিল্পে অন্যতর ভাষাব্যঞ্জনা।
২৪ নভেম্বরে শুরু হয়ে কর্মশালাটি চলেছে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই সময়ে শিল্পীরা পানাম নগরে থেকেছেন, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মিশেছেন। স্থানীয় জনসংস্কৃতির খবরবার্তাও তাই ধরা পড়েছে শিল্পীদের চিন্তা ও শিল্পে। কর্মশালার শেষ দিনে পানাম নগরে ঢোকার মুখে ইতালিয়ান শিল্পী পাওলো টাম্বুরেলার ইনস্টলেশনে চোখ পড়তেই ভিরমি খেতে হয়—পুরোনো আমলের দোতলা বাড়ির সামনে কয়েকটি মুরগির খাঁচা ঝুলিয়ে রাখা, আর তার মধ্যে রয়েছে জ্যান্ত মুরগি। শিল্পকর্মটির নাম ‘মুরগি প্রাসাদ’। পুরোনো স্থাপত্য ধারণার অতলে পানামবাসীর জীবনের বর্তমান হালহকিকত ঠেসে দেওয়া হয়েছে। কেননা, এখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই এখন মুরগি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে অন্য দেশের একজন মানুষের চোখ দিয়ে পাওলো এখানে প্রাচীনত্বের ছাঁচের মধ্যে একেবারে গোড়াসুদ্ধ সামপ্রতিকতাকে তুলে এনেছেন। তাঁর এই চিন্তায় নতুনত্বের ছোঁয়া আছে এবং পুরো বিষয়টাতে লুকিয়ে আছে এক ধরনের মৃদু রসবোধও।
পর পর ইনস্টলেশনগুলো দেখতে দেখতে কিছু দূর এগোলেই ‘সিক্রেট অব সিল্করোড’ নামে শিল্পকর্মটিতে দেখা গেল, একটি ঘরের মেঝে মাছের আঁশ দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন বাংলাদেশি শিল্পী খন্দকার নাসির আহমেদ। ঘরটির দরজাসহ বিভিন্ন স্থানে ঝুলন্ত ফিনফিনে সাদা কাগজের ওপর চিকন রেখায় শোভা পাচ্ছে মাছ, ফুল, হাতি-ঘোড়া, লতা-পাতার নকশা—লৌকিক বাংলার মোটিফ। পানামের স্থানিক ঐতিহ্যের সমান্তরালে বাঙালি সভ্যতার নানা যুগপর্বের অন্বেষণ এই কাজটির উদ্দেশ্য। ছোট্ট একটি স্পেসকে অবলম্বন করে বাংলার শৌর্যবীর্যের প্রতিচ্ছবি থরেবিথরে অনেকটা যেন অ্যালবামের মতো ছড়িয়ে রাখা হয়েছে এখানে।
এভাবে শিল্পীদের সব কাজের মধ্যেই স্পেসের বহুমাত্রিক ব্যবহার লক্ষণীয়। ৫০০ বছর আগে গড়ে ওঠা পানামের স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের ওপর শিল্পীরা তাঁদের শিল্পচেতনার পরত বুলিয়েছেন এই সময়ে দাঁড়িয়ে। তাঁদের কাজগুলোতে পানামের স্থাপত্য নিদর্শন ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার পেইন্টিং, ফটোগ্রাফ, পোস্টার, ইট-পাথর, অডিও প্রভৃতি দৈনন্দিন জীবনের নানা উপাদানের সমন্বয় আছে। ফলে এসব শিল্পকর্মে স্পেস যেমন বড় ভূমিকায় খাড়া রয়েছে, এর চেয়েও বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে শিল্পীর অন্তর্গত চেতনালোক। সেই চিন্তার খোঁজ যদি কোনো শিল্পরসিক পেতে পারেন, তবেই ইনস্টলেশনগুলো তাঁর কাছে ভিন্ন ভাব ও ভাষায় ধরা দেবে।
বাংলাদেশি শিল্পী প্রমথেশ দাশ পুলক কাজের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন ভাঙা একটি বাড়ি। তার মধ্যে ঘরের ভাঙাচোরা দেয়ালে টাঙানো নিজের সাদাকালো ফটোগ্রাফে এনেছেন বিভিন্ন বয়সি মানুষের অবয়ব। যে কারণে নানা সময় ও বয়সী মানুষের অভিব্যক্তি, তাদের জীবনযাপন এবং ধর্মবোধ হাজির হয়েছে এই উপস্থাপনায়। এ রকমভাবে গোটা পানাম নগরের স্থানে স্থানে, পথ চলতেই দর্শকেরা সেদিন দেখে নিয়েছেন বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইতালি, জার্মানি, চীন, ইরান প্রভৃতি দেশ থেকে আসা বিভিন্ন শিল্পীর কাজ।
তবে ১০ দিনব্যাপী এই কর্মশালার বড় বৈশিষ্ট্য হলো—সবাই তাঁদের কাজের স্থানের স্থাপত্যসৌন্দর্য এবং প্রকৃতিবৈচিত্র্যকে মিলিয়ে মিশিয়ে ব্যবহার করেছেন। তেমনি এর ঐতিহাসিক মূল্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টিও শিল্পীদের কাজের মাধ্যমে প্রতিভাত হয়েছে।
৩ ডিসেম্বর কর্মশালার শেষ দিন পানাম নগরের তিনটি স্থানে এই প্রদর্শনীর ইনস্টলেশনগুলোর মধ্যে স্পেস আর শিল্পীর ভাবনার সঙ্গে একীভূত হয়ে দর্শকও যেন হয়ে উঠেছিল শিল্পকর্মের অংশ। পানাম-জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো ইনস্টলেশনগুলো প্রকৃতই যেন সেদিন হয়ে উঠেছিল ঐতিহ্যের মধ্যে সমকালের প্রতিস্থাপন।
========================
কেমন দেখতে চাইঃ ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা  দ্রীপ প্রতিভার দ্যুতিময় স্মারক  গল্প- বৃষ্টি  শহীদুল্লা কায়সারঃ রাজনৈতিক সৃষ্টিশীলতা  আনোয়ার পাশাঃ জাতিরাষ্ট্রের অংশ ও প্রেরণা  মুনীর চৌধুরীঃ তাঁর নাটক  জেগে ওঠার গল্প  এখন শুনবেন বিশ্ব-সংবাদ  বাঘ  বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১০  তাঁরা সমালোচিত, আমরা বিব্রত  মুজিবকে নিয়ে সিরাজের একমাত্র লেখা  ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্তির উদ্যোগ  মহাস্থানগড়ের ধ্বংস-পরিস্থিতিঃ পর্যবেক্ষণ  ওয়ান-ইলেভেনের চেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ আসছে!  ডিসেম্বরঃ গৌরব ও গর্বের মাস  উইকিলিকস বনাম যুক্তরাষ্ট্র  দুর্নীতি বেড়েছে দুনিয়াজুড়ে  উইকিলিকসঃ বাঘের ঘরে ঘোগ  আইন অপূর্ণাঙ্গঃ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার কঠিন  ১০০ কোটি ডলারে ঋণঃ ভারতের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত  ট্রেন দুর্ঘটনাঃ চালকের ভুল নাশকতারও গন্ধ!  ‘যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা উইকিলিকস সমর্থকদের  কানকুনঃ মুমূর্ষু পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষ  নারীর হার-নারীর জিত, বেগম রোকেয়া প্রাসঙ্গিক  সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতির বীজ লুক্কায়িত  বরুণ রায়—কিংবদন্তিতুল্য এক ব্যক্তিত্ব  মুক্তির গান  এক-এগারোর জুজুটাকে হিমাগারে পাঠান  জব্দকৃত অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে জাগরণ সৃষ্টি করুন  সংসদীয় গণতন্ত্রের গল্পসল্প  রাষ্ট্রীয় সমাজে চিন্তা করার স্বাধীনতার প্রয়োজন  বাঙালের জলবায়ু দর্শন: ইঁদুরই কি শ্রেষ্ঠ জীব  প্রকৃতি- পাহাড়টির সঙ্গে ধ্বংস হবে ঐতিহ্যও  স্মরণ- আজও প্রাসঙ্গিক বেগম রোকেয়া


দৈনিক প্রথম আলো এর সৌজন্যে
লেখকঃ নির্লিপ্ত নয়ন


এই চারুলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.