বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের গুপ্তচরবৃত্তি! by মিজানুর রহমান খান

নিউজিল্যান্ড বিশ্বরাজনীতিতে শান্তিপ্রিয় নিরীহ চরিত্রের দেশ, সেই দেশটিই কিনা বাংলাদেশের এক বা একাধিক স্থানে আড়ি পেতে আমাদের সবকিছুর ওপর নজরদারি করছে। অথচ আমাদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সম্পর্ক ক্রিকেট সূত্রে অতি মনোরম। দুঁদে ক্রীড়া লিখিয়ে উৎপল শুভ্রর কাছ থেকেই জানতে পেলাম, ক্রিকেট অঙ্গনের নক্ষত্রসম দেশটিকে গত তিন বছরের ব্যবধানে আমরা ঢাকার মাটিতে দুবার হোয়াইটওয়াশ করেছি। আমরা এর স্থানীয় নামকরণ করেছি বাংলাওয়াশ। তাদের মাটিতে টাইগাররা কখনো জয় পায়নি। তাই বলে তাদের মিডিয়া হয়তো বাংলাদেশকে ব্ল্যাকওয়াশ বলেনি। ব্ল্যাকওয়াশ কথাটা বলা এ কারণে যে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় টিম ‘ব্ল্যাক ক্যাপস’ (কালো টুপি) হিসেবে পরিচিত।
তবে আমাদের র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যা ব) এই ব্ল্যাক ক্যাপসের দেশটি কূটনৈতিকভাবে এক দশকের বেশি সময় ধরে কার্যত ‘ব্ল্যাকওয়াশ’ করে চলেছে। নিউজিল্যান্ডের সাংবাদিক নিকি হ্যাগার ও রেন গালাঘার ১৬ এপ্রিল ‘জিসিএসবি’স সিক্রেট বাংলাদেশ স্পাই মিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর চার দিন কেটে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কোনো প্রতিবাদ করেনি। কারণ, সম্ভবত রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে এটা কোনো গোপনীয় বিষয় নয়। কিউই (নিউজিল্যান্ড) গুপ্তচররা র্যা বকেই কেবল তথ্য দিচ্ছে না, গোপনে র্যা ব কী করছে, তা-ও জেনে নিচ্ছে। ২০০৯ সালের জিসিএসবি (গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস সিকিউরিটি ব্যুরো) প্রতিবেদন বলছে যে ‘র্যা বের সদর দপ্তর ও র্যা ব ইউনিটগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের তথ্যও তারা সংগ্রহ করছে।’ ১৬ এপ্রিলই এই খবর প্রথম বেরোল, তা কিন্তু নয়।
তবে বর্তমানে রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) হুইসেল ব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেন এর নেপথ্যের নায়ক। ইলেকট্রনিক সার্ভিলেন্সের কারণে তিনি যত নথিপত্র ফাঁস করতে পেরেছেন, তার ভিত্তিতে একটা বিশ্লেষণধর্মী নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছে দৈনিক নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড ও মার্কিন সংবাদ ওয়েবসাইট দি ইন্টারসেপ্ট। ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি স্নোডেনের যে দুটি নথির ভিত্তিতে করা হয়েছে, সে দুটি পরীক্ষা করে দেখলাম, বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র যে কথা প্রকাশ করতে চায়নি, তাই ফাঁস করা সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যা জানাতে চায়নি, তা-ই প্রকাশ করেছিলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, মার্কিন হুলিয়া মাথায় নিয়ে যিনি এখনো লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছেন।
আমরা তাই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের গোপন তারবার্তাগুলো পড়তে পেরেছিলাম। আর এবারে স্নোডেন নথির ভিত্তিতে আমরা যা জানলাম, তা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে বিশ্বকে জানাতে চেয়েছে। এটা নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কোনো একান্ত গোপন চুক্তির ফল নয় বলে প্রতীয়মান হয়। এর মূলে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে করা পাঁচ দেশীয় একটি গোয়েন্দা চুক্তি, সংক্ষেপে একে বলে ফাইভ আইজ, আবার এই পাঁচটি দেশ ফাইভ আইজ কথাটিরও একটি সাংকেতিক রূপ বের করেছে। সেটি হলো চার অক্ষরের: এফভিইওয়াই। বাংলাদেশ-সংক্রান্ত মার্কিন নথির গায়ে এই চার অক্ষর খোদাই করা আছে। এই সংকেত দিয়ে যে পাঁচ দেশকে বোঝানো হয় তারা হলো, মান্যবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড। তার মানে কি এটা দাঁড়ায় না যে, গুপ্তচরবৃত্তি নিউজিল্যান্ড করলেও তার দায় এড়াতে পারে না অপর চারটি দেশও? অবমুক্ত করা বা প্রকাশিত এই নথিটিই সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাঁচটি দেশই জনসাধারণের কাছে তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের করা পাপপুণ্য (দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশি রাষ্ট্রে) গোপন রাখার নীতি অনুসরণ
করছে। আমরা এখানে মনে রাখব, অনেক পাপের নিয়ামক ও ভাগীদার হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব যে আজও মার্কিনদের সমীহ করে, তার মূলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি বিষয় রয়েছে। তাই তারা সময়ে সময়ে সরকারিভাবে গোপন নথি অবমুক্ত করে। আবার এ-ও ঠিক, এ কাজেও তাদের সব সময় শ্বেতশুভ্র ভাবার কারণ নেই। ২০১৩ সালের নথির কিছু অংশ কালিঝুলি মেখে কী দরকার পড়েছিল অবমুক্ত করার লেবেল আঁটার, তা আমাদের জানার বাইরে। র্যা ববিষয়ক প্রকাশিত দুটি নথির আরেকটি হচ্ছে জিসিএসবির।
২০০৯ সালের জুলাই মাসের তৈরি করা জিসিএসবির প্রতিবেদনটি বেশ স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে যে বাংলাদেশের ওপর কিউই গোয়েন্দাগিরি এতটাই ‘স্বচ্ছ’ যে তারা বিষয়টি তাদের সরকারি ওয়েবসাইট জিসিএসবি.গভট.এনজেড-এ প্রকাশ করেছে বলেও উল্লেখ করেছে। করবে নাই বা কেন? মার্কিন নথিতেই আছে জিসিএসবি হলো এসএসপিএসি নামের ১০ দশীয় একটি জোটের চার্টার সদস্য, যেখানে ভারতও আছে। একটি লিংকের কথা সেখানে বলা আছে, যেটির আবার আধখানা অংশ কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেখানে প্রবেশ না করা যায়। মনে হচ্ছে ২০১৩ সালের নথিটি মার্কিনরা নিজ দায়িত্ব স্বীকার করে অবমুক্ত করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে কিউইদের তৈরি করা আট পৃষ্ঠার নথিটির গায়ে অবমুক্ত করার কোনো চিহ্ন নেই, এটা স্নোডেনের সংগ্রহ হয়ে থাকলে এটিও মার্কিন সরকার প্রকাশ করেছে বলে ধারণা করি। তবে এরও কয়েকটি স্থানে কালো কালিতে মুছে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আমাদের জন্য যেটা বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ২০১৩ সালের নথিতে ফাইভ আইজ মানে পাঁচটি দেশই বিশ্বকে বলছে, আমরা চীন ও ভারতের মতো দেশের ওপরও গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে থাকি। ওই দুই সাংবাদিক গত মাসের গোড়ায় প্রথম প্রকাশ করে যে নিউজিল্যান্ড তার প্রতিবেশী প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, যাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও শাসনগতভাবে খুবই ভঙ্গুর, তাদের ওপর গোপনে নজরদারি চালাচ্ছে আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাচার করছে। এ নিয়ে ঝড় যেটুকু উঠল, তা নিউজিল্যান্ডের বিরোধী শিবির থেকে। আর গুপ্তচরবৃত্তির শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে সামোয়ার প্রধানমন্ত্রী অকপটে বললেন, ‘আমাদের কিছুই লুকানোর নেই!’ ফিজির একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বললেন, ‘আমরা আগেই জানি।’
হিন্দুস্তান টাইমস-এর একজন সাংবাদিক যখন জানলেন যে নিউজিল্যান্ড ভারতের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে, তখন তার মনের অবস্থাটা সম্ভবত আমার মতোই হলো। তিনি মোদির সঙ্গে গত মাসে বিদেশ সফররত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মন্তব্য চাইলেন, কিন্তু পেলেন না। ভারত ও চীনের কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নজরে এল না। তাহলে সবকিছুই কি ‘স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক’? আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া বা সতর্ক হওয়ার কিছুই কি নেই? অবশ্যই আছে।
ওই দুই সাংবাদিক যে কারণে রিপোর্ট করেছেন, তার মূল কথা হলো নিউজিল্যান্ড আইন বলছে, তাদের গোয়েন্দা সংস্থা বিদেশে গোয়েন্দাবৃত্তি করবে, কিন্তু তা ভালো মানুষদের রক্ষার জন্য। কিন্তু র্যা ব যেহেতু মানবাধিকারের লঙ্ঘন করছে, তাই তাকে সহায়তা দেওয়ায় আইনের লঙ্ঘন ঘটছে। এ ধরনের বিভাজন মেনে চলা বাস্তবে দুরূহ। মার্কিন সিনেটর লেহি আইনের কথা হলো, যে বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তাকে কোনো সাহায্য করা যাবে না। অপারেশন ক্লিন হার্টের পরে গঠিত র্যা বকে তারা এবং তাদের জানিমিত্র ব্রিটেন প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান র্যা বের কথিত নির্যাতনের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন ছেপে হইচই ফেলল। ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত কমিশনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু তার অগ্রগতি জানি না। সুতরাং গলদ সারিয়ে বিদেশিরা আমাদের রাষ্ট্রকে, আমাদের র্যা বকে জাতে তুলবে, তেমন ভাবনা বাতুলতা।
বাস্তবতা হলো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে আড়ি পেতে পাওয়া মালমসলার আদান-প্রদান করবেই। যার যত হিম্মত, সে তত সুবিধা পাবে। সুতরাং কেবল উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে রাষ্ট্রের হিম্মত মাপা ঠিক হবে না। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটি নিয়েই বেড়ে উঠতে পারলে তার হিম্মত বাড়বে, অন্যের খাবারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
ফাইভ আইজ ও তার মিত্র দেশগুলো দেখাচ্ছে, পাইকারি ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তির যুগে তাদের কাছে ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কতটা খেলনা ও ফেলনা হতে পারে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা, বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার ধারণাগুলো এখন কত বেশি, কতটা গভীর ও ব্যাপকতায় আড়িপাতা যন্ত্র দিয়ে মাপা হচ্ছে ও হবে।
আমাদের জন্য এর প্রতিকার অধিকতর স্বচ্ছতা, সামাজিক সুবিচার ও গণতান্ত্রিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাই আমরা গণতন্ত্রের ওপরে, শক্তিশালী সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরে চোখধাঁধানো উন্নয়ন ও জিডিপির গল্পকে জায়গা দেওয়ার যেকোনো প্রবণতাকে নাকচ করে দিই। আমরা বেশ বুঝতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র নয়, ফাইভ আইজ নয়, সারাক্ষণ গোটা বিশ্বব্যবস্থার, বিশ্ব মুরব্বিদের রাডারে রয়েছি আমরা। আমাদের বন্ধুরা, উন্নয়ন অংশীদারেরা আমাদের রাষ্ট্রকে কমবেশি সন্দেহের চোখে দেখছে এবং তাদের উদ্বেগের সবটুকুই বৈধতার সংকটে ভুগছে না। ফাইভ আইজ জোটের বেশির ভাগেরই নিজস্ব আইনে নিজেদের নাগরিকদের ওপর আড়ি পাতা বারণ। তাই এই ঘাটতি মেটাতে পরস্পরের গোয়েন্দা সংস্থাকে তারা ব্যবহার বা অপব্যবহার করে থাকে। একমাত্র কানাডা বাদে আর চার দেশেরই নির্দিষ্টভাবে গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আড়ি পাতা কার্যক্রমের তদারকির জন্য খুবই শক্তিশালী ও গতিশীল সংসদীয় কমিটি রয়েছে। বাংলাদেশেরও তেমন কমিটি থাকা দরকার, যারা যেকোনো অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হবে।
সলোমান দ্বীপ, ফিজি, সামোয়া কি কোনো রাষ্ট্র হলো? এগুলো শুধু ভঙ্গুর বললে কম বলা হবে। ফাইভ আইজ নথিতে উল্লেখ করা ভঙ্গুর দেশগুলোর মধ্যে কেবল বাংলাদেশ ও র্যা বের গতিবিধি কীভাবে তারা তদারক করছে, সে বিষয়টিই বিস্তারিত ও সচিত্র প্রকাশ করেছে। ইদানীং ক্রিকেটে আমরা খুব নাম করছি। এ রকম বহু উৎসবের আড়ালে গণতন্ত্রের সংকট ও স্বচ্ছতার দুর্ভিক্ষ আড়ালে চলে যাচ্ছে। অথচ এটা কিউইদের ঢাকার মাঠে শুভ্র ধোলাই করার আনন্দেই মশগুল থাকার সময় নয়। নিউজিল্যান্ডের ডেইলি পোস্ট-এর সম্পাদক কিম গিলেসপি ১৭ জুলাই লিখেছেন, ‘কিউই গুপ্তচরদের বাংলাদেশ মিশন সত্য নয়, সেটা সরকারের বলা দরকার।’ আমরা বলি, নীরবতা ভেঙে এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের তরফে কিছু একটা বিবৃতি আসা দরকার। এটা সংসদে আলোচনা করারও বিষয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.