দলীয় বিবেচনায় মেডিকেল শিক্ষকদের পদোন্নতি by বদরুদ্দোজা সুমন

বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) মাধ্যমে মেডিকেল শিক্ষকদের পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে হঠাৎ এ তালিকা প্রকাশ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এরপরই বঞ্চিতদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মারাত্মক অসন্তোষ। দলীয় বিবেচনায় পক্ষপাতমূলকভাবে পদোন্নতির অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তদের অগ্রাহ্য করে নন-ক্যাডারদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনেকে হতাশায় নিত্যদিনের কাজকর্ম ছেড়ে দেন। গতকাল স্বাস্থ্য খাতে এ নিয়ে দিনভর আলোচনা-সমালোচনা হয়।


বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারদের মধ্যে যারা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন তাদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। ক্যাডারদের অনেকেই চাকরি ছাড়ার চিন্তাভাবনা করছেন।
বঞ্চিতদের অভিযোগ, সরকার সমর্থক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতাদের সুনজরে থাকা ব্যক্তিরাই পদোন্নতি পেয়েছেন। ক্যাডার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সমকালকে বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত, নন-ক্যাডার এমনকি ডিপ্লোমাধারীদের অনেকে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ আমরা এমডি/এমএস ডিগ্রিধারী হয়ে এবং মাঠপর্যায়ে তিন বছর কাজ করেও পদোন্নতি পাইনি। সূত্র জানায়, অষ্টম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের এক রেসপিরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পদোন্নতি না পেলেও প্রকল্পভুক্তরা প্রভাব খাটিয়ে ঠিকই পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন।
চিকিৎসকদের বৃহত্তম সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) সূত্র জানায়, সহকারী অধ্যাপক পদে
এক হাজার ২৫০ জন, সহযোগী অধ্যাপক পদে ৬৫০ জন এবং সহকারী পরিচালক পদে ১০৮ জন পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ সংখ্যাটি নিশ্চিত করা যায়নি। মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারাও ঠিক কতজনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। পদোন্নতিপ্রাপ্ত ১২১ সহযোগী অধ্যাপককে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করার তথ্য জানা গেছে।
বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের কো-অর্ডিনেটর ডা. সেলিম রেজা সমকালকে বলেন, পদোন্নতির বেলায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বেশ কিছু দৃষ্টান্ত সুনির্দিষ্টভাবে দেখাতে পারব। আগামী দু'এক দিনের মধ্যে ডিপিসি কমিটি ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করব। সুরাহা না হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ও প্রকল্পভুক্ত পদে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার এবং ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী শিক্ষক রয়েছেন। ১৯৮২ সালের আগ পর্যন্ত ইন সার্ভিস ট্রেইনি (আইএসটি) হিসেবে চিকিৎসকরা সরকারি চাকরি পেতেন। পরে ইন্টার্নি পদ্ধতি চালু করে তা রহিত করা হয়। আইএসটি চিকিৎসকদের অনেকে বিসিএস দিয়ে ক্যাডার পদে নিয়োগ পান। এক হাজার ৩৬২ জন বিসিএস না দিয়ে নন-ক্যাডার পদে চাকরি করে আসছেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ দেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসক নেতাদের দাপটের কাছে অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়তে হয়। তবে তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও স্নাতকোত্তর প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। পিএসসি না ডিপিসি_ এই রশি টানাটানিতে দীর্ঘদিন পদোন্নতি আটকে থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল।
পদোন্নতি তালিকা সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) এসএম আশরাফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, পদোন্নতির বেলায় জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি যোগ্যতা, দক্ষতা ও মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন যাচাই করেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি।
পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও দলীয়করণের কারণে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ড্যাবের সভাপতি ডা. একেএম আজিজুল হক সমকালকে বলেন, প্রাথমিক তথ্যে আমরা জেনেছি, অনেক সিনিয়র লোক পদোন্নতি পাননি। নন-ক্যাডারদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রত্যাশিত ছিল না। এর অবশ্যই সুরাহা হওয়া উচিত। নইলে স্বাস্থ্যখাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।
মন্ত্রণালয়ের অন্য একটি সূত্র জানায়, ডিপিসি বৈঠকের বেলায় চিকিৎসক নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ না থাকলেও তালিকা প্রকাশের আগে তারা সেটি দেখে 'গ্রিন সিগন্যাল' দিয়েছেন। চিকিৎসক নেতাদের অনুকম্পাপ্রাপ্তদের সবাই পদোন্নতি পেয়েছেন বলে স্বাস্থ্য ক্যাডারদের অভিযোগ। কয়েকদিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে তার বাসায় স্বাচিপ মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান, বিএমএ মহাসচিব ডা. শারফুদ্দিন আহমেদসহ পদস্থ কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার আগে তালিকা প্রকাশ নয়, তবে সোমবার রাতে হঠাৎ তা প্রকাশ করা হয়। জানা গেছে, মন্ত্রী যাওয়ার আগে তালিকা অনুমোদন দিয়ে গেছেন।
ডিপিসি কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য সচিব মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির গত রাতে সমকালকে বলেন, চাকরির মেয়াদকালের শেষপর্যায়ে থাকা নন-ক্যাডার চিকিৎসকদের কেউ কেউ যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রকাশনা ইত্যাদি যাচাইয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছেন। এ ছাড়া পদোন্নতির বেলায় ক্যাডার, নন-ক্যাডার ও আইএসটি সবাইকেই আমরা সমান চোখে দেখেছি।
এদিকে বঞ্চিতদের দ্রুত আরেকটি ডিপিসি করে পদোন্নতি প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। সংগঠনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে পদোন্নতি তালিকা প্রকাশে বিএমএ সন্তুষ্ট। তবে বঞ্চিতদের দ্রুত ডিপিসি করে পদোন্নতি দিতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.