সন্ত্রাস ও দারিদ্র্য নির্মূলে একযোগে কাজ করুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ অঞ্চলের দুই সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট সন্ত্রাসবাদ ও দারিদ্র্য নির্মূলে একযোগে কাজ করতে সার্ক সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের সব সমস্যা সমাধানেও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মালদ্বীপের আড্ডু দ্বীপে সপ্তদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে সার্কের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জোরালো ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ২৫ বছর আগে জনগণকে দেওয়া রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ করতেও এ অঞ্চলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


সার্কের ৮টি সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে আমাদের দেওয়া রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ এবং জোরালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। জনগণের সামাজিক কল্যাণ ও সব ধরনের সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে গোটা অঞ্চলে জনগণের যাতায়াত, পণ্য ও সেবার আদান-প্রদানে সহযোগিতা দিতে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করতেও দক্ষিণ এশীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। বাসস, ইউএনবি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল আন্তঃসার্কের মধ্যে বাস্তবিক সংযোগই নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জনগণের অবাধ যাতায়াতের সংযোগ এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শ্রমিকদের যাতায়াতের সুযোগ প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে তিনি ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ সহজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অর্জন এবং গণতান্ত্রিক
মূল্যবোধের এক নতুন অধ্যায় বিবেচনা করে অবশ্যই ভ্রমণ বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে। আড্ডু শহরের হিথাধু ইকুয়াটরিয়াল কনভেনশন সেন্টারে 'সেতুবন্ধ' প্রতিপাদ্য নিয়ে এই সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সার্কের বিদায়ী সভাপতি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জিগমে ওয়াই থিনলে, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী ড. বাবুরাম ভট্টরাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আঞ্চলিক সংযোগের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ গত শীর্ষ সম্মেলনের পর থেকে সার্ক আঞ্চলিক রেলওয়ে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার প্রতীক্ষায় রয়েছে। দ্রুত রেলওয়ে চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সব সদস্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন,
আঞ্চলিক বাণিজ্যের সন্ধিক্ষণে সত্যিকার আঞ্চলিকতাবাদের মানসিকতা লালন এবং আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, সার্ক অঞ্চলে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। এর বিপরীতে নিকটবর্তী আঞ্চলিক ব্লকগুলোতে ওই বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
শেখ হাসিনা বলেন, সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন (সাফটা) এই অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে কাজ শুরু করে। তবে আমরা সবাই স্বীকার করব যে, বাণিজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমন্বয় দীর্ঘ মেয়াদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এ ক্ষেত্রে আরও কিছু করা দরকার। তিনি এ অঞ্চলের মানসম্মত শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের জন্য আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা কার্যক্রমের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানসম্মত শিক্ষাই প্রজন্মের মধ্যে আঞ্চলিক সম্পর্ক কার্যকরভাবে দৃঢ় করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জওয়াহেরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির মধ্যে যৌথ শিক্ষা কর্মসূচির ব্যাপারে সম্পাদিত চুক্তির উল্লেখ করে বলেন, সার্ক দেশগুলোর পারস্পরিক একাডেমিক ও প্রফেশনাল ডিগ্রির স্বীকৃতি দেওয়া এবং একাডেমিক মানের সমন্বয় করা উচিত। বাংলাদেশ বর্তমানে মালদ্বীপের সহযোগিতায় মালেতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
সার্কের তৃতীয় দশককে 'বাস্তবায়নের দশক' হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু আঞ্চলিক প্রকল্পের পাশাপাশি সার্ক উন্নয়ন তহবিলকে (এসডিএফ) আমাদের উৎসাহ জোগাতে এবং সার্কের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক বাতায়নের আওতায় প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
শেখ হাসিনা স্বতন্ত্র সদস্য দেশের প্রয়োজন মেটাতে অভিবাসীদের অধিকার ও শ্রমিকের যাতায়াত নিশ্চিত করতে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে আরও উত্তম সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তবে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে শ্রমিক শোষণ দূরীকরণ ও অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর তদারকি থাকতে হবে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে জলবায়ুর বৈরী আচরণের কারণে খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদেরকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন ধারণা, উদ্যোগ ও মডেল নিয়ে অধিকতর আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।'
পরিবেশগত সহযোগিতার বিষয়ে সার্ক কনভেনশন কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলের অভিন্ন নদীগুলোর পানি সম্পদের ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।'
তিনি আরও বলেন, 'দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার যৌথ মালিকানার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার প্রস্তাব করব। 'আমরা মনে করি এটি নিজ নিজ নদী অববাহিকার পানিসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সুবিধা বাড়াবে। যার ফলে কৃষি সমৃদ্ধ হবে এবং একই সঙ্গে এ অঞ্চলের একশ' কোটির বেশি লোক উপকৃত হবে।'
সার্ক সিড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক দশক আগের সার্ক ফুড ব্যাংককে পুরোপুরি কার্যকর করারও আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, 'এ অঞ্চলের নদীগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদেরকে এর পরিচালনাগত দুর্বলতা মোকাবেলা করতে হবে। এ লক্ষ্যে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল থাকা প্রয়োজন।'
শেখ হাসিনা দারিদ্র্য ও সন্ত্রাসবাদকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সামাজিক কাঠামো, বিকাশ ও উন্নয়ন বজায় রাখতে এ মাটি থেকে উভয় সমস্যা নির্মূলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি সার্ক নেতৃবৃন্দের প্রতি দারিদ্র্যের বাই প্রোডাক্ট বিশেষ করে মাদক চোরাচালান, জাল মুদ্রা এবং নারী ও শিশু পাচার কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান ইস্যুকে ব্যাপক করতে ২০০২ সালে স্বাক্ষরিত প্রিভেন্টিং অ্যান্ড কমবেটিং ট্রাফিকিং ইন উইম্যান অ্যান্ড চিলড্রেন বিষয়ক সার্ক কনভেনশনের আওতা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।
তিনি সার্ক পর্যবেক্ষকদের আরও বেশি সংশ্লিষ্ট করার সম্ভাবনার বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ারও প্রস্তাব করেন, যাতে তারা দ্রুত এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সার্ককে সহায়তা করতে পারে।
চমৎকারভাবে ১৭তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনের জন্য তিনি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামেদ নাশিদকে ধন্যবাদ জানান এবং আশা প্রকাশ করেন, তিনি তার দক্ষতা ও জ্ঞানের মাধ্যমে সার্ক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।
সাফটায় বাণিজ্য সম্ভাবনার চেয়ে কম
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাফটার আওতায় পণ্যবাণিজ্য শতকোটি ডলার অতিক্রম করলেও এ পরিমাণ বাণিজ্য সম্ভাবনার তুলনায় বেশ কম। তিনি বলেন, সার্কের দিকনির্দেশনায় আঞ্চলিক লক্ষ্য পূরণে সাফটা (সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন-এসএএফটিএ) যাত্রা শুরু করলেও অর্থনৈতিক অর্জনের ক্ষেত্রে আরও বেশি কিছু করা প্রয়োজন।
তিনি পারস্পরিক সুবিধা ও উন্নতি বিষয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর বিশ্বাসের ভিত্তিতে সিকি শতাব্দী আগে সার্কের যাত্রা শুরু হওয়ার কথাও ভাষণের শুরুতে মনে করিয়ে দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, সমমূল্যবোধ, লক্ষ্য ও উদ্যোগ ভাগাভাগির পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অর্জনের একটি সম্ভাবনা হিসেবেও এখন সার্ককে দেখি আমরা। তাই এবারের শীর্ষ সম্মেলনের থিম 'সেতুবন্ধ রচনা' যথোপযুক্ত। 'সার্কের নির্দেশনায় সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন (এসএএফটিএ) ওইসব লক্ষ্য অর্জনে বিনম্র যাত্রা শুরু করে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কিন্তু আমরা সবাই একমত যে, দীর্ঘ মেয়াদের বিবেচনায় বাণিজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এক্ষেত্রে আরও বেশি কিছু করা প্রয়োজন।' 'সাফটার আওতায় পণ্যবাণিজ্য শতকোটি ডলার অতিক্রম করলেও এ পরিমাণ বাণিজ্য সম্ভাবনার তুলনায় বেশ কম।'
মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দীপু মনির বৈঠক
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বুধবার আড্ডুসিটিতে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ নাসিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এ সময় তারা বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক দিক নিয়ে আলোচনা এবং দু'দেশের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে বাংলাদেশের একটি পণ্য প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন। যাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রফতানিপণ্য প্রদর্শিত হবে। মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য ও হস্তশিল্প সরবরাহের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। মালদ্বীপের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশি পণ্য সরবরাহের ব্যাপারেও আলোচনা হয়।
আহমেদ নাসিম কৃষিভিত্তিক গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে মালদ্বীপের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠানোর আগ্রহ দেখান।
মালদ্বীপের মন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আওতায় ২০১১-১৫ মেয়াদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেন।
বৈঠক শেষে দীপু মনি সাংবাদিকদের জানান, উভয় দেশ শিগগিরই সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির ওপর আলোকপাত করতে যাচ্ছে।

No comments

Powered by Blogger.