ছুটিতে পর্যটন বিনোদন কেন্দ্রে প্রচণ্ড ভিড়

দের ছুটিতে রূপসী বাংলাদেশের রূপময় সব প্রান্তে বিনোদন কেন্দ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে নেমেছিল হাজারও পর্যটকের ঢল। সুন্দরের পিপাসায় মানুষ ছুটে গেছেন সাগর সৈকতে, পাহাড়ে, বন ভ্রমণে। সাগর কুমারী কুয়াকাটা, সুন্দরবন সংলগ্ন সাগর বেলায় রাসমেলায় অংশ নেন কয়েক লাখ মানুষ। কক্সবাজারে ঠাঁই নেই অবস্থা। সকাল-সন্ধ্যা সৈকত যেন জনসমুদ্র। বান্দরবান, নীলসাগর, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িতে প্রচণ্ড ভিড়। সিলেটের জাফলং-শ্রীমঙ্গলসহ অন্যান্য স্পট এখন লোকে লোকারণ্য। সুন্দরপিয়াসী মানুষ ছুটে গেছেন পর্যটন-বিনোদন স্পটগুলোতে।


অনেকে দলবেঁধে লঞ্চে, নৌকায়, ট্রলারে অংশ নিচ্ছেন নৌভ্রমণে। সব মিলিয়ে পর্যটন ব্যবসা এখন জমজমাট। চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ ট্যুর অপারেটররা। তারা বলছেন, ঈদ মৌসুমে ভ্রমণ এখন জনসংস্কৃতির অংশ হতে চলেছে। সে তুলনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই বলে তারা স্বীকার করেন।
নুরুল আলম (মিরসরাই) জানান, মিরসরাইয়ের পর্যটন এলাকা মহামায়া সৌন্দর্যপিয়াসীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। ঈদের দিন থেকে শুরু হয়েছে পর্যটকদের আগমন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ডিসেম্বরে উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসছেন পর্যটকরা। মহামায়া এলাকায় প্রতিদিন শত শত পর্যটক ছুটে এলেও এখানে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। পর্যটকদের জন্য স্থায়ীভাবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেই। এরই মধ্যে মহামায়া সেচ প্রকল্প এলাকার কৃত্রিম লেকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানি বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত ৩ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের লং ডি ট্রেডিং এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেম লিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মহামায়া লেক পরিদর্শন করে।
গত বুধবার সরেজমিনে মহামায়ায় গিয়ে দেখা গেছে লেকের নীলাভ জলরাশিতে ডিঙি ও ইঞ্জিনচালিত বোটে উল্লসিত দর্শনার্থীদের নির্মল আনন্দ উপভোগ করতে। লেকের নৈসর্গিক দৃশ্য দর্শন, হৈচৈ আর ছুটোছুটিতে লেক এলাকা উত্সবমুখর হয়ে ওঠে। বিগত দিনের ক্লান্তি আর অবসাদ বিলীন হয়েছে লেকের অপার সৌন্দর্যের কাছে। এবার পর্যটকদের ভিড় গত ঈদুল ফিতরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ঈদের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে আসা প্রতিটি মানুষই আসছেন প্রকৃতিকন্যা মহামায়ার অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র তানভীর জানান, পত্রিকায় মহামায়ার কথা অনেক পড়েছি। মহামায়া সত্যি বাংলাদেশের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। সরেজমিনে না এলে কখনও বোঝা যাবে না মহামায়ার রূপ। এলাকাটিকে পর্যটন এলাকা ঘোষণা এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সীতাকুণ্ড থেকে ঘুরতে আসা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, মহামায়া খুবই সুন্দর একটি এলাকা। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদে ঘুরতে এসেছি। পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত লিংক রোডটি যদি কার্পেটিং করা হয় তাহলে পর্যটকদের আরও সুবিধা হবে বলে জানান তিনি। বোট ড্রাইভার জসিম উদ্দিন জানান, সারা বছরই এখানে পর্যটকদের ভিড় থাকে। তবে ঈদ মৌসুমে এখানে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। তাই লেকে অতিরিক্ত বোট আনতে হয়। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা বাড়ানো হলে পর্যটকরা আরও নির্বিঘ্নে আসতে পারবেন।
নগরের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে এখনও ভিড় : ঈদের ছুটি শেষ। তবুও পার্কের নানা রাইডে চড়ে বেড়ানো, উন্মুক্ত উদ্যানে নির্মল সময় কাটিয়ে দেয়া, শিশুপার্ক চিড়িয়াখানায় ঘোরাঘুরি আর সিনেমা হলে গিয়ে ছবি উপভোগ করে বিনোদন কুড়িয়ে নেয়ার ছুটি যেন শেষ হচ্ছে না। রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে এখনও তাই বিরাজ করছে উত্সবের আমেজ। শাহবাগের শিশুপার্ক, জাতীয় জাদুঘর, মিরপুরের চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, শ্যামলীর শিশুমেলা, বিজয় সরণির বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার আর গুলশানের ওয়ান্ডারল্যান্ডসহ সব বিনোদন কেন্দ্রে গতকালও ছিল উপচেপড়া ভিড়। এসব বিনোদনকেন্দ্রের পাশাপাশি সংসদ ভবন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেকসহ উন্মুক্ত উদ্যানগুলোতেও ছিল যথারীতি জনস্রোত। ঐতিহাসিক স্থাপনা লালবাগ কেল্লাতেও ছিল জনসমাগম। ঈদের আনন্দ আরও উপভোগ্য করতে অনেকে গতকালও ছুটে যান পুরনো ঢাকার বলধা গার্ডেন, আহসান মঞ্জিলসহ ঢাকার দর্শনীয় স্থানে। আনন্দ সন্ধানী এসব মানুষের সেসব স্থানে উপস্থিতি ছিল গতকাল সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত।
ঈদে শিশু-কিশোরদের বিনোদন সবার আগে। তবে বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে সব বয়সী মানুষের ভিড় জমলেও প্রতিবারের মতো এবারও সিংহভাগ দখল করে রাখে শিশুরা। তাদের জন্যই বাবা-মা আসেন শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা ও শিশু-কিশোরদের বিনোদন উপযোগী কেন্দ্রগুলোতে। তবে বরাবরের মতো ভিড়টা বেশি ছিল শিশুপার্কে। গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিশুর দখলে ছিল পার্কের পুরো এলাকা। ফলে চরকি, যুদ্ধবিমান, ট্রেন সবই চড়তে হচ্ছিল দীর্ঘ লাইন দিয়ে। ধানমন্ডির শঙ্কর থেকে আসা আট বছর বয়সী ইফতি জানায়, সে ট্রেনে ওঠার জন্য আধাঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তাতেও ওর কষ্ট নেই। ঈদের দিন থেকেই শিশুপার্ক জমজমাট বলে জানান পার্কের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান। ঈদ উপলক্ষে এ বিনোদন কেন্দ্র খোলা ছিল প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। তবে আজ থেকে শুরু হচ্ছে শীতকালীন সময়সূচি অনুযায়ী দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকবে এ পার্ক। অন্যদিকে শ্যামলীর শিশুমেলায়ও গতকাল ছিল নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা শিশু-কিশোরদের আনন্দ আর উল্লাস। তারা হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দঘন পরিবেশে দোলনা, ব্যাটারি কারসহ বিভিন্ন রাইডে চড়ে। বাসাবো থেকে আসা সাত বছরের রুহান জানায়, এখানে ওয়ান্ডার হুইলে চড়ে তার খুব ভালো লেগেছে।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন উদ্যানও ছিল লোকে লোকারণ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান নগরীর অন্য বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মতো গুলশানের ওয়ান্ডারল্যান্ডও সরগরম ছিল সব বয়সী মানুষের ভিড়ে। এসব এলাকায় অনেকে ফাঁকা ঢাকায় রিকশায় ঘুরে বেড়ান। বিনোদনের নানারকম আয়োজন থাকলেও রুপালি পর্দার আকর্ষণে সিনেমাপ্রেমীরা ঠিকই হাজির হচ্ছেন সিনেমা হলে। বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সসহ মধুমিতা, অভিসার, বলাকা, রাজমণি, পূর্ণিমা সিনেমা হলেও ছিল দর্শকদের সরব উপস্থিতি। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার অনেকেই হাজির হন পরিবার-পরিজন নিয়ে।

No comments

Powered by Blogger.