বাকিদের পদত্যাগ কবে by কবিরুল ইসলাম

ফুটবল-ক্রিকেটের পর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জনপ্রিয় খেলা হকি। আশি থেকে নব্বই দশকের জনপ্রিয় এ খেলাটি আজ কালের স্রোতে বিলীন হতে চলেছে। ফেডারেশনের কিছু কর্মকর্তার কারণেই হকির আজ বেহাল দশা। মাঠে খেলা না থাকায় মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের টার্ফের ওপর জমাট বেঁধেছে শ্যাওলা। সাত বছর পর বর্তমান কমিটি যখন যুব হকি মাঠে গড়িয়েছে, তখন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের সামনে ২৪ অক্টোবর ঢাকা ও রাজশাহীর মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচের ৪৬ মিনিটের সময় আচমকা মাঠে প্রবেশ করে ম্যাচ বন্ধ করে দেন জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়রা।


‘হকি বাঁচাও’ স্লোগানে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জামিলের পদত্যাগের দাবিতে খেলোয়াড়রা মাঠে অবস্থান নেন। ফলে ম্যাচটি শেষ হতে না পারায় ঢাকা ও রাজশাহীকে যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। এরপর ফেডারেশনের তরফ থেকে মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামসুল বারীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ২৫ সাবেক ও বর্তমান জাতীয় দলের খেলোয়াড়কে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশ পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতেও বলা হয় খেলোয়াড়দের। পরে খেলোয়াড়রা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। ক্রীড়াঙ্গনের ঘোলাটে পরিস্থিতি স্বচ্ছ করতে এবং দেশের হকির হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে প্রতিমন্ত্রী তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বর্তমান কমিটির সবাইকে একযোগে পদত্যাগের অনুরোধ করেন। মূলত বর্তমান কমিটির ব্যর্থতার কারণেই প্রতিমন্ত্রীর এমন নির্দেশ ছিল। নির্দেশ পাওয়ার একদিন পরেই (৩ নভেম্বর) ৩১ সদস্যের কমিটির ১৬ কর্মকর্তা একযোগে পদত্যাগ করেন। যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রশীদ শিকদারের নেতৃত্বে ফেডারেশনের এ অংশটি পদত্যাগ করে। পদত্যাগকারীরা হলেন সহ-সভাপতি প্রতাপ শংকর হাজরা, আজিজুর রহমান রাজ, যুগ্ম সম্পাদক আবদুুর রশীদ শিকদার, মাশিরুল কবীর রিটু, সদস্য শামসুল বারী, ইউসুফ আলী, ইউসুফ, হাসান উদ্দিন আহমেদ শিমুল, আবদুল্লাহ পিরু, আনভীর আদিল খান, আ. ন. ম. মামুনউর রশিদ, জাফরুল আহসান বাবুল, জামিল এ. নাসের, শফিকুল ইসলাম লিটু, মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী পাপ্পু ও আনোয়ার হোসেন খান। ১৬ সদস্য পদত্যাগ করলেও বর্তমান কমিটির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জামিলসহ বাকী ১৭ সদস্য এখনও পদত্যাগ করেননি। তারা আদৌ পদত্যাগ করবেন কি-না সেটাও পরিষ্কার নয়। তবে খন্দকার জামিল বলেছেন, আমি দেড় বছর আগেই পদত্যাগ করেছি। নতুন করে পদত্যাগ করার কোনো যুক্তি নেই।
গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাধারণ সম্পাদক খন্দকার জামিল বলেন, বর্তমান কমিটি সাড়ে তিন বছর আগে দায়িত্ব নিয়েছে। দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন দেখলাম ক্লাবগুলো আমাকে সহযোগিতা করছে না, তখনই আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। যেখানে কাজ করতে পারব না, সেখানে সময় দিয়ে তো কোনো লাভ নেই। তাই দেড় বছর আগেই নিজের পদত্যাগপত্র সভাপতি বরাবর জমা দিয়ে রেখেছি। তিনি আমার পদত্যাগপত্র এখনও গ্রহণ করেননি। কবে করবেন সেটাও জানি না। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পর দ্বিতীয়বার আমার পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারি না। এতে কিছু সমস্যা আছে। তবে হ্যাঁ, সভাপতি যদি আমাকে দ্বিতীয়বার পদত্যাগপত্র জমা দিতে বলেন, সেক্ষেত্রে আমি রাজি আছি।
তিনি কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বলেন, আমার পদত্যাগপত্র সভাপতি কেন গ্রহণ করছেন না সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় বাইরে বলছেন, ‘খন্দকার জামিল কী এমন হয়েছে যে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা যাবে না’—এমনটা তার কাছে আমরা আশা করতে পারি না। তিনি ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক। আমাদের ব্যর্থতার জন্য তিনি পদত্যাগের কথা বলেছেন সেটা ঠিক আছে; কিন্তু যারা মাঠে গণ্ডগোল করল, তাদের তো তিনি কিছুই বললেন না। এতে কি ক্রীড়াঙ্গনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে? খন্দকার জামিল বর্তমান কমিটির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখন ফান্ড ছিল শূন্যের কোঠায়। এখন ফান্ড হয়েছে। অনেক টাকা আছে। মাঠে খেলা চালাতে এখন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ক্লাবগুলো আমাদের সহযোগিতা না করলে আমাদের কী করার আছে! এ পর্যন্ত ১৪বার সভা করেও প্রথম বিভাগ লিগ করতে পারিনি। তিনবার দলবদলের তারিখ দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই ক্লাবগুলো তারিখ পেছাতে বলেছে। এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী আছে?
হকির বর্তমান জৌলুসহীন অবস্থার জন্য শুধু বর্তমান কমিটিই নয়, দায়ী শামসুল বারী নেতৃত্বাধীন কমিটিও। প্রায় দু’দশক বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন শামসুল বারী। তখন অনেকেরই অভিযোগ ছিল, বারী হকিটাকে গতিশীল করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকার পর বারী পদত্যাগ করেন ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে। এরপর সাজেদ এ. এ. আদেল দায়িত্ব নেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে জাতীয় দলের কোচ নিয়োগে স্বজনপ্রীতিসহ আরও নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও স্বল্প সময়ের মেয়াদকালে তিনি হকিকে মাঠে রেখেছিলেন নিয়মিত। তারপরই হকির সাধারণ সম্পাদকের পদে আসেন খন্দকার জামিল উদ্দিন। এর আগে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা সফল সংগঠক জামিল উদ্দিনকে ঘিরে সবার প্রত্যাশা ছিল অনেক। সবাই আশা করছিলেন দেশের হকি গতি পাবে। কিন্তু কেউ হকিকে এগিয়ে নিতে পারেননি।

No comments

Powered by Blogger.